সরকারের ঘুরে দাঁড়ানোর ৬ মাস: স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টাঃ সামনে কী পরিকল্পনা

25

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের প্রথম ছয় মাস দেখতে দেখতে পার হতে চলেছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে অর্থনীতি ছিল চরম অস্থিতিশীল ও ভঙ্গুর। পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়েই গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল দেশের মানুষ। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণআন্দোলন ও অন্তর্বর্তী সময় পেরিয়ে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়। নির্বাচনের ছয় মাসে প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব, সামনে কী কী পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের?

ঘুরে দাঁড়ানোর ৬ মাস: স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
ঢাকাঃ  বর্তমান সরকারের সফল ও ঘটনাবহুল ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হলো।গত ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিপুল জনসমর্থন ও ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার সমমনা জোট।
 
বিগত স্বৈরাচারী শাসন এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের পর একটি বিধ্বস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে কক্ষপথে ফেরানোই ছিল নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। গত ছয় মাসে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে নানামুখী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সরকারের ১৮০ দিনের শাসনকাল মূল্যায়ন করে নীতি-নির্ধারক ও অংশীজনেরা জানিয়েছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত স্বল্পমেয়াদি অঙ্গীকারগুলোর প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ছয় মাসকে মূলত প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার, দুর্নীতিবাজদের ছাঁটাই এবং রাষ্ট্রযন্ত্র গুছিয়ে নেওয়ার সময় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এ স্বল্প সময়ের মধ্যেই খাতওয়ারি বহু দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি লাভ করেছে।

সামষ্টিক অর্থনীতি ও ভঙ্গুর আর্থিক খাত সংস্কার: বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের অর্থনীতি এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছিল। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং রিজার্ভের ক্রমাবনতি ছিল নিত্যদিনের চিত্র। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে সামান্য স্থিতিশীলতা ফিরেছিল সেটিকে পুঁজি করে বাজার চাঙ্গা করতে প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু করে অর্থ মন্ত্রণালয়।রপ্তানি ও শিল্পায়নে গতি: দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ স্বাভাবিক করতে এবং কলকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রমে বড় ধরনের আধুনিকায়ন আনা হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পদ্ধতিগত বাধা দূর করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা যাতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কোনো অন্যায্য বাধার মুখে না পড়েন এবং চাঁদাবাজির শিকার না হন তা নিশ্চিত করতে কঠোর আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বৈদেশিক বিনিয়োগে উল্লম্ফন: সরকারের নেওয়া বহুমুখী ব্যবসাবান্ধব নীতি, বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে গত ছয় মাসে দেশে নেট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১.৭৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এটি সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের আস্থার একটি বড় প্রমাণ।

বন্ধ কলকারখানা চালু ও কর্মসংস্থান: বিগত সরকারের আমলে লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা ১৪টি পাটকলকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর করা হয়েছে। আনন্দের বিষয় হলো, এর মধ্যে নয়টি পাটকল সফলভাবে পুনঃউৎপাদন শুরু করেছে, ফলে হাজার হাজার শ্রমিকের নতুন করে কর্মসংস্থান হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা: অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গত ছয় মাসে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। চীন, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমবাজারের সহজ প্রবেশাধিকার এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে বড় ধরনের কৌশলগত চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

কৃষি খাত ও কৃষকবান্ধব নীতি: বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষকের মুখে হাসি না ফুটলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়-এ নীতিতে বিশ্বাসী বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১০ দিনের মাথায় দেশের প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করতে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়।

কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ: দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের দুঃখ লাঘবে সরকার এক অভাবনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষকদের কাঁধ থেকে ঋণের বোঝা নামাতে প্রায় ১৫.৫ বিলিয়ন (১ হাজার ৫৫০ কোটি) টাকা সমমূল্যের কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। এর ফলে লক্ষাধিক প্রান্তিক কৃষক নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন এবং কৃষিকাজে মনোযোগ দিতে পারছেন।
ডিজিটাল ‘কৃষক কার্ড’ ও সরাসরি ভর্তুকি: কৃষকদের কাছে সরাসরি সার, বীজ ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি পৌঁছে দিতে ডিজিটাল ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রুখতে এ কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে ভর্তুকির টাকা পৌঁছে যাচ্ছে। এ কৃষক কার্ডের বিস্তারিত পরিসংখ্যান সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ বুকলেট সরকার খুব শিগগিরই প্রকাশ করতে যাচ্ছে।

সেচ ও খাল খনন কর্মসূচি: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’কে আধুনিক রূপে পুনরুজ্জীবিত করেছে বর্তমান সরকার। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় এ খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এটি শুধু সেচ সুবিধাই বাড়াচ্ছে না, গ্রামীণ কৃষিজীবী অর্থনীতিতে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের অভূতপূর্ব রূপান্তর ও জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের পুনর্বাসন: বর্তমান সরকারের একটি বড় ম্যান্ডেট হলো চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করা। স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনা। জুলাই বিপ্লবে আহত ও নিহতদের কল্যাণে সরকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দাঁড় করিয়েছে।

শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় দেখভাল: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং প্রতি মাসে ২০,০০০ টাকা করে মাসিক ভাতা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিগত ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। এছাড়া গেজেটভুক্ত ১৪,৩৬৮ জন জুলাই যোদ্ধার (আহত) মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১৩,৪৭৯ জনকে সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নিয়মিত মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে।

উন্নত চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন: দেশে চিকিৎসায় যাদের নিরাময় সম্ভব হচ্ছিল না, এমন ১৫৪ জন গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে (সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, তুরস্ক ইত্যাদি দেশে) পাঠানো হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার সরকার বহন করছে, যার পেছনে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩.৬৩ বিলিয়ন (৩৬৩ কোটি) টাকা। পাশাপাশি প্রায় ৩,০০০ আহত যোদ্ধার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ কল্যাণ ব্যবস্থাকে একটি স্থায়ী রূপ দিতে সরকার বিশেষ আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করছে, যাতে সরকার পরিবর্তন হলেও তাদের এ সুবিধা বন্ধ না হয়।

কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ: দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে দিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১,০০,০০০ (এক লাখ) ‘হেলথ কেয়ারার’ বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার মধ্যে ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে অন্তত ৮০ শতাংশই নারী কর্মী নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া চিকিৎসক সংকট কাটাতে নতুন করে ৫,০০০ চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান।

উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার: কিডনি রোগীদের চরম দুর্দশার কথা বিবেচনা করে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন এবং জেলা হাসপাতালগুলোর শয্যা ও সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। স্বাস্থ্য খাতের এ বিশাল মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকার বিশাল অংক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সংসদীয় গণতন্ত্র ও আইন প্রণয়ন: বিগত বছরগুলোতে জাতীয় সংসদ পরিণত হয়েছিল একটি একদলীয় রাবার স্ট্যাম্পে। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসের সংক্ষিপ্ত কার্যদিবসের মধ্যেই আইনসভা বা জাতীয় সংসদকে ফের প্রাণবন্ত, তর্ক-বিতর্কমুখর ও কার্যকর করে তুলেছে।

রেকর্ড সংখ্যক বিল পাস: মাত্র ৫২টি সংসদীয় কার্যদিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদে ১০৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এক অনন্য নজির। বিরোধী দলের মতামত গ্রহণ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এ বিলগুলো আইনে পরিণত হয়েছে।

সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ: জুলাই বিপ্লবের ছাত্র-জনতার সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন- নির্বাচন কমিশন, দুদক, বিচার বিভাগ) নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সংবিধান সংশোধন করার বৃহৎ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সংস্কার কার্যক্রমে শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, ছাত্র প্রতিনিধি ও সকল অংশীজনের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা, অপরাধ দমন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ: বিগত ১৫ বছরের দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনামলের পুঞ্জীভূত অপরাধ, গুম, খুন এবং চাঞ্চল্যকর অপরাধগুলোর বিচার সম্পন্ন করতে সরকার বিচার বিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে।

দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর: দেশের নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে সরকার। বেশ কয়েকটি বহুল আলোচিত ও স্পর্শকাতর ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম দ্রুততম সময়ে (ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনালে) সম্পন্ন করে আদালতের মাধ্যমে রায় ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে।

দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: দেশের বড় বড় হত্যাকাণ্ড, ব্যাংক লুট ও অর্থ পাচারের মূল হোতাদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। বিদেশে পালিয়ে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া, মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ একাধিক উচ্চপদস্থ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা রয়েছেন।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার: দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম এক আসামিকে সম্প্রতি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এটিকে সরকারের এ মেয়াদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার ক্ষেত্রে একটি বড় আইনি সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও নাগরিক সুবিধা: মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট তৃণমূল ও মধ্যবিত্ত মানুষের নিত্যদিনের কষ্ট লাঘব করতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে ডিজিটালাইজড, দুর্নীতিমুক্ত ও আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড ও রেশন সুবিধা: নিম্নআয়ের সাধারণ মানুষ যেন বাজারের সিন্ডিকেটের শিকার না হন এবং ন্যায্যমূল্যে চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহজে ক্রয় করতে পারেন, সেজন্য দেশব্যাপী আধুনিক কিউআর কোড সম্বলিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠদের সম্মাননা বৃদ্ধি: দেশের সূর্যসন্তান খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের মাসিক সম্মানী ভাতা বর্তমান সরকার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। এটি দেশের স্বাধীনতায় তাদের অসামান্য অবদানের প্রতি রাষ্ট্রীয় কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ ও সরকারের মূল্যায়ন: সরকারের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে শুধু উদযাপন নয়, বরং আত্ম-মূল্যায়নের পথও বেছে নিয়েছে বিএনপি জোট সরকার। রাজনৈতিক দল ও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সার্বিক কর্মকাণ্ডের একটি নিবিড় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বাংলানিউজকে বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাস ছিল মূলত পূর্ববর্তী স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুনর্গঠন ও প্রস্তুত করার একটি ‘প্রাথমিক পর্যায়’ বা ভিত্তিভূমি। এ মজবুত ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আগামী ছয় মাসে সরকারের উন্নয়ন কাজের গতি বহুগুণ বাড়বে।

রাজনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর গোলাম হাফিজ বলেন, সরকারের সামনে আগামী দিনগুলোতে বেশ কয়েকটি কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজারমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পুরোপুরি নামিয়ে আনা এবং দেশের বিশাল বেকার যুবসমাজের জন্য দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। দেশের সাধারণ মানুষ আশা করছে, গত ১৮০ দিনে সরকার যেভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করেছে, আগামী দিনগুলোতেও জনবান্ধব পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সক্ষম হবে।

 

 

নির্বাচনের ছয় মাসে প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব, সরকারের সামনে কী পরিকল্পনা

নির্বাচনের ছয় মাসে প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব, সরকারের সামনে কী পরিকল্পনা
এআই দ্বারা তৈরি ছবি
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় ছয় মাস। এখন সামনে বড় প্রশ্ন-নির্বাচনের আগে মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছিল, তার কতটা পূরণ হয়েছে? কী পেল মানুষ, আর কোন প্রত্যাশাগুলো এখনো অধরা? একই সঙ্গে সামনে সরকারের পরিকল্পনাই বা কী?নির্বাচনের আগে মানুষের প্রত্যাশার তালিকায় ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ বাড়ানো, সরকারি সেবায় হয়রানি কমানো এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয়ে একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম ছয় মাসকে অঙ্গীকার বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমে বলেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের অধিকাংশ নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। কোথাও ১০০ শতাংশ, আবার কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
রিজভী বলেন, প্রথম ছয় মাসের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সে অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। কোথাও ১০০ শতাংশ না হলেও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শতভাগ কাজ হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে কিছুটা সময় লেগেছে। সরকারের ছয় মাসের অর্জনের বিস্তারিত পরিসংখ্যানও খুব শিগগির দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তার আলোচিত কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রথম ছয় মাসে ৬৭ হাজারের বেশি কার্ড বিতরণ হয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে অন্তত ৪১ লাখ নারীকে এ কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৪৩ লাখ কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তায় জুনের শেষ দিকে সরকারি গুদামে ২২ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত ছিল। পরিবেশ ও জলবায়ু মোকাবিলায় ২০২৬ সালে প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, প্রথম ১৮০ দিনেই ২ কোটির বেশি চারা রোপণ করা হয়েছে।

প্রশাসনে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিকতা প্রতিষ্ঠা, সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা, ভিআইপি সংস্কৃতি কমানো, আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থায় দ্রুততা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকেও সরকারের অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিও সরকারের অন্যতম কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী প্রচার দলের সভাপতি ও জাসাসের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাহফুজ কবির মুক্তা। তিনি বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি অর্জন হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা সরকারের বড় সাফল্য।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পর নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাহফুজ কবির মুক্তা বলেন, অযোগ্য ও অনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের সরিয়ে যোগ্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিকর ও অনৈতিক প্রকল্প পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীরা নিয়মিত মাঠে কাজ করছেন, ফলে প্রশাসনে নতুন গতি এসেছে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও এগিয়েছে। তার দৃষ্টিতে, সরকারের প্রথম ছয় মাসের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সরকার তার চেয়েও বেশি অর্জন করেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাবে।

তবে সরকারের হিসাবের সঙ্গে সাধারণ মানুষের হিসাব পুরোপুরি মেলে না। মানুষের কাছে সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি এখনো বাজার, আয়, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সানাউল মুন্সি বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আগের তুলনায় স্বস্তি থাকলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখনো সীমিত। তিনি জানান, মানুষ বাজারে আসে, কিন্তু আগের মতো কিনতে পারে না। দাম কিছুটা কমলেও মানুষের আয় তো বাড়েনি। সংসার চালাতে সবাই এখন হিসাব করে বাজার করছে।

মতিঝিলের বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছে সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো বাজার। বেতন পাওয়ার পর বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা আর বাজার খরচ দিয়ে হাতে তেমন কিছু থাকে না। সরকার যদি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারে, সেটাই হবে বড় সাফল্য।’

কৃষকের প্রত্যাশাও সরাসরি। বিক্রমপুর কুকুটিয়া গ্রামের কৃষক শহীদ মাঝি বলেন, ‘সার-বীজের দাম কমানো দরকার, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য। মাঠে আমরা যে দামে বিক্রি করি, বাজারে সেই পণ্য অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়। এতে কৃষক আর ভোক্তা—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত।’

তিনি বলেন, কৃষকের জন্য শুধু ভর্তুকি বা কার্ডভিত্তিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। উৎপাদন খরচ কমানো, সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ানো এবং কৃষককে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

তরুণদের কাছেও বড় প্রত্যাশা কর্মসংস্থান। রাজধানীর আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিবুল বলেন, ‘শিক্ষা শেষ করে চাকরি পাওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা চাই নতুন নতুন শিল্পকারখানা ও বিনিয়োগ বাড়ুক। শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করে এত তরুণের কর্মসংস্থান সম্ভব নয়।’

তরুণ উদ্যোক্তা রুকাইয়া নাজনীন তাহরা বলেন, ‘সরকারের ছয় মাসকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি। এই সময়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ও আস্থা তৈরির চেষ্টা দেখা গেছে।’

বিশেষ করে পরিবেশ অ্যাওয়ার্ড, শিক্ষকদের সম্মাননা এবং শিশুদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করার মতো উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয়। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে সরকারকে আরও সজাগ হতে হবে। দুর্নীতি, লুটপাট ও নারীদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীরা নিরাপদে কাজ করতে না পারলে উদ্যোক্তা ও অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধান প্রত্যাশা হলো দেশে আরও উদ্যোক্তা তৈরি করা। জেলা পর্যায়ে তরুণদের প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেওয়ার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে কাস্টমসসহ বিভিন্ন দপ্তরের জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের হয়রানি কমাতে হবে।’

আইনশৃঙ্খলা নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা ব্যাপক। শ্যামপুর বাউইতলার রিকশাচালক হারুন জমাদার বলেন, ‘নতুন সরকার এসেছে। ভেবেছিলাম রাত-বিরাতে আমরা রিকশা চালাব। কিন্তু রাতে রাস্তায় চলাচল করতে এখনো ভয় লাগে। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন শুনলাম। এখন পুলিশ যদি আরও সক্রিয় হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ বেশি নিরাপদ বোধ করবে।’

অন্যদিকে নারী চাকরিজীবী মাছুমা শিল্পী বলেন, ‘শুধু রাজনৈতিক কোন্দল ও সহিংসতা বন্ধ হলেই হবে না। রাস্তায় ছিনতাই, গণপরিবহনে হয়রানি, নারীর নিরাপত্তা-এসব বিষয়েও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক পরিবারে নারীরা সংসার চালান। তাদের নিরাপত্তা দরকার।’

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা (এসপি) জহিরুল হক পাঠান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রাতারাতি পুরোপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। জনগণের চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বিচার ব্যবস্থায় দ্রুততা আনাও জরুরি।

বিশ্লেষকদের মতে, কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব ঘাটতি ও বিনিয়োগের স্থবিরতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যা ছয় মাসে সমাধান সম্ভব নয়। তবে সরকারের দিকনির্দেশনা ও সংস্কারের গতি এরই মধ্যে মূল্যায়ন করা যায়।

তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণ মানুষ অর্থনীতির সূচক নয়, মাস শেষে সংসার কতটা স্বস্তিতে চলছে-সেটিই হিসাব করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, সরকারের প্রথম ছয় মাসকে এককথায় সফল বা ব্যর্থ বলা কঠিন। দীর্ঘ অস্থিরতার পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সংসদকে কার্যকর করা, বিরোধী দলের মতপ্রকাশের সুযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার ওপর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে। মানুষ এখন অতীতের রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তিত। তাদের জীবন সহজ করতে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ফলাফল তৈরি করাই সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান মানুষের মধ্যে অনেক বড় প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে এই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ফলে যেকোনো সরকারের জন্য এত বড় প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন।

তিনি বলেন, সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দল, জনগণ এবং অন্যান্য অংশীজনেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে, তবে কিছু ঘাটতি রয়েছে-রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় এটি স্বাভাবিক। জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার মানুষের প্রত্যাশার অনেকটাই পূরণ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে সরকারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি গঠনমূলক সমালোচনাও করতে হবে।

সরকারের প্রথম ছয় মাসের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, খুন-গুম বন্ধ হয়েছে, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিশ্চিত হয়েছে, ভোটাধিকার ফিরে এসেছে এবং পুলিশি নির্যাতন বন্ধ হয়েছে। ব্যক্তি পূজা বা পার্সোনালিটি কাল্টের রাজনীতি বন্ধ হয়েছে, ছবির রাজনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। সংসদে গঠনমূলক আলোচনা হচ্ছে—এসবকে তিনি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।

তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তার মতে, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, সিন্ডিকেটের প্রভাব রোধ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের পুনর্গঠন, সুশাসন এবং শিক্ষা খাতের সংস্কারে এখনো অনেক কাজ বাকি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গঠনমূলক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে এসব সমস্যা ধীরে ধীরে সমাধান করা সম্ভব।

আরেক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বাংলানিউজকে বলেন, সরকারের কাছে জনগণের মূল প্রত্যাশা থাকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। আর সরকার জনগণের কাছে সুশাসন পৌঁছাতে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ব্যবহার করে, যা দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট রেজিম ইতোমধ্যেই তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে প্রশ্নবিদ্ধ করে গিয়েছে।

এমতাবস্থায়, প্রতিষ্ঠানসমূহকে পুনর্গঠন করে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে সরকারের নানা উদ্যোগ থাকলেও এর গতি শ্লথ হওয়ায় সরকারকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট আমলে কৃতকর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হলেও আমলাতন্ত্রের মধ্যে আস্থার সংকটে ভোগার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। মন্ত্রীদের জন্য ১৮০ দিনের কর্মসূচি মূল্যায়নের নতুন উদ্যোগটি তাদের কার্যক্রমের সচেতনতা ও স্পর্শকাতরতা যেমন বৃদ্ধি করেছে, তেমনি তাদের আত্মবিশ্বাসের ওপরও প্রভাব ফেলেছে এবং অধস্তন আমলাদের ওপর তাদের কর্তৃত্বের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করেছে।

টুটুল বলেন, বিগত ছয় মাসে সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি যেমন সরকারের সুনাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে বড় ধরনের নাশকতা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা ঠেকানো গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে সরকারকে পূর্ণ সহায়তা করার জন্য মানসিক প্রস্তুতির ঘাটতি রয়ে গেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন না করায় সরকার এ বিষয়ে উদাসীন কি না, সেই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। পূর্ববর্তী সরকারের ঋণ নিয়ে সমালোচনা করলেও এই সরকার বড় ধরনের ঋণ এবং প্রায় অর্জন-অসম্ভব উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাজেট প্রণয়ন করেছে। যদিও সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য নানা জটিলতা নিরসনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রীর অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলেও প্রধানমন্ত্রীসহ অধিকাংশ নীতিনির্ধারকের মধ্যে দাম্ভিকতার প্রকাশ তো দূরের কথা, বরং অনেক বেশি সদাচার পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা জনমনে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করেছে।

সর্বোপরি, সরকারের ১৮০ দিনের ‘হানিমুন’ শেষে সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা-দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এমন অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাজে লাগিয়ে বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এবং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তুতি নেওয়া। জনগণ শুধু প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য নয়, গোটা মন্ত্রিসভার সাফল্যের মাধ্যমেই সরকারের সাফল্য বিবেচনা করে—বিষয়টি লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আরও গতি বাড়ানো হবে। অর্থনীতিতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সংস্কার অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের আওতা বাড়ানো, শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ তৈরি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে। কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কৃষককে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও জোর দেওয়া হবে।

এ ছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, সরকারি সেবা ডিজিটাল করা, প্রশাসনে জবাবদিহি বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

কদমতলী থানার মুরাদপুর হাইস্কুলের প্রবীণ শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ছয় মাসেই সব পরিবর্তন হবে-এমনটা আমরা আশা করি না। কিন্তু ছয় মাস পর অন্তত বুঝতে চাই সরকার কোন দিকে যাচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে, তরুণদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, দুর্নীতি কমছে এবং মানুষ নিরাপদে আছে-এগুলো দেখতে পারলে মানুষ অবশ্যই সরকারকে সমর্থন করবে। তাই সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষণাকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করা।’

হোটেল ইম্পিরিয়াল ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যবসায়ী মশিউর রহমান সুমন বলেন, ‘একটি সরকারের ছয় মাসের বয়স আসলে কিছুই নয়। তাই এখনই হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। সরকারের এই যাত্রা দীর্ঘ পথের। তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পর মানুষ একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব সরকার চায়। জনগণ শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়নি, তারা জীবনে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, সরকারি সেবায় হয়রানি বন্ধ এবং দুর্নীতি কমানো-এসবই এখন মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।

সব মিলিয়ে ছয় মাসের ব্যবধানে মানুষকে এক কথায় হতাশ বা সন্তুষ্ট-কোনোটিই বলা যাচ্ছে না। বরং মানুষের প্রত্যাশা এখন শর্তসাপেক্ষ। কথার চেয়ে কাজ, ঘোষণার চেয়ে বাস্তব ফল এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন দেখতে চায় তারা।

সরকারের জন্য তাই আগামী ছয় মাস হবে আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ছয় মাসে মানুষ দেখেছে সরকার কী করতে চায়; পরের ছয় মাসে মানুষ দেখতে চাইবে-সরকার আসলে কী করতে পারে।

পূর্বের খবরবিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান দুদকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত