সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলো বিএনপি সরকার *গ্রেডভেদে ১০০-১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি * বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা * তিন ধাপে মূল বেতন, ভাতা কার্যকর * নিজ জেলায় পদায়ন পারেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ।
ঢাকাঃ এবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোতে ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। আর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়বে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ধরনের ভাতাও বাড়বে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, বর্তমান সরকার এক গ্রেড এক পেনশন বা এক র্যাঙ্ক এক পেনশন পদ্ধতি প্রবর্তনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এ পদ্ধতি সামরিক ও অসামরিক সকল ক্ষেত্রে একই সাথে বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন মনে করে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অধিকতর যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সরকার জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় মন্ত্রিসভার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পর চলতি সপ্তাহেই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।প্রজ্ঞাপন একটি নয়, এ-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রজ্ঞাপন জারি হবে। পাশাপাশি আইনগত ভেটিং শেষে কয়েকটি বিষয় এসআরও আকারেও জারি করা হবে। তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল দেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রায় ১২ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল হয়নি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সময়োপযোগী করতে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ গঠন করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে আটটি বৈঠক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ১২ বছর ধরে বেতন বৃদ্ধি ঘটেনি। ৫ বছর অন্তর যেখানে পে স্কেল চেঞ্জ হয়, সেখানে এটা ১২ বছরে হয়নি। তো তাদের জন্যও এটা খুব কষ্টকর এবং জীবনযাত্রার মানও কমে গেছে অনেক। সেটিকে বিবেচনায় রেখে একটা ব্যালান্স করে, এই উভয় দিকে ব্যালান্স করে যেটুকু করা যায় সেটাই করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ এবং উক্ত বেতনস্কেলের সাথে সাযুজ্য রেখে সশস্ত্রবাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে যা ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ হতে কার্যকর হবে। জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫ এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সেগুলোর ভিত্তিতে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সচিব কমিটি গঠন করেছিল। উক্ত সচিব কমিটির দাখিলকৃত প্রতিবেদন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। বিস্তারিত পর্যালোচনার পর সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভা নতুন বেতনস্কেল অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে। নতুন বেতনস্কেলে সর্বনি¤œ প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০তম গ্রেডের জন্য ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ১ম গ্রেডের জন্য ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ন্যায্যতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সর্বনি¤œ ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। ফলে, সর্বনি¤œ গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, বর্তমান সরকার এক গ্রেড এক পেনশন বা এক র্যাঙ্ক এক পেনশন পদ্ধতি প্রবর্তনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ পদ্ধতি সামরিক ও অসামরিক সকল ক্ষেত্রে একইসাথে বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন।
এক পদ এক পেনশন পদ্ধতি এই মুহূর্তে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ থাকায় এবং অসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের পূর্বের অবসরগ্রহণকারীদের কোন তথ্য না থাকায় সরকার ওআরওপি পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তবে, এ মুহূর্তে বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের জীবনযাত্রার মান ও বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসিক ৯,০০০ টাকা বা তদনি¤œ নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯,০০১ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৭৫ শতাংশ, ২০,০০১ টাকা থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৬৫ শতাংশ, ৩০,০০১ টাকা থেকে ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৬০ শতাংশ এবং ৪০,০০১ টাকা বা তদূর্ধ্ব নিট পেনশন আহরণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে যেসকল পেনশনভোগী দীর্ঘদিন পূর্বে অবসরে গমন করেছেন এবং যারা তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ অনেক বেশি হবে। সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মত প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসিক ৩০০০ টাকা ভাতা প্রাপ্য হবেন। তাছাড়া, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতদিন শুধুমাত্র ৫ম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতা প্রযোজ্য ছিল। জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সকল গ্রেডের কর্মচারীগণ মোবাইল ভাতা পাবেন। ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ সকল কর্চারীর জন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। বেতনস্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সংশ্লেষ ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির উপর প্রভাব বিবেচনায় সরকার সম্পূর্ণ বেতনস্কেল একযোগে বাস্তবায়ন না করে চলতি ২০২৬-২৭ ও আগামী ২০২৭-২৮ এই দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বল্প আয় বিবেচনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ এর আওতায় ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭ এ মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং ভাতাসমূহ ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ধাপভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধি কার্যকর হবে। উল্লেখ্য, জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনস্কেল অনমোদন করা হবে যা ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এর ন্যায় একইভাবে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমণ করা সম্ভব হবে।
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি যার সংস্থান মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামো অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরসমূহের বাজেটে রাখা হয়েছে। সরকার মনে করে, নতুন বেতনস্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে যেখানে বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিধান বর্ণিত থাকবে। সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাকে অনুমোদিত বেতনস্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হবে।
নিজ জেলায় পদায়ন হবেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা॥
এছাড়া কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের (ব্লক সুপারভাইজার) নিজ জেলায় পদায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে যথাসম্ভব তাদের নিজ বাড়ির একেবারে কাছাকাছি পদায়ন না করে জেলার অন্য এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া হবে। মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে তথ্য অধিদফতরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের এতথ্য জানান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আমাদের যারা কৃষিতে কাজ করেন একদম ফিল্ড লেভেলে, যাদের আমরা ব্লক সুপারভাইজার বা মোটামুটি সহকারী কৃষি কর্মকর্তা যারা আছেন, তাদের আগের যে সিস্টেম ছিল তাতে তারা নিজ জেলায় কাজ করতে পারতেন না। তিনি বলেন, এটা ২০২০ সাল থেকে চালু ছিল। কিন্তু এখন সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা নিজ জেলায় পদায়ন হবেন। যথাসম্ভব একদম ঠিক বাড়িতে হবেন না, কাছাকাছি জায়গায় থাকবেন, যেন তারা বেশি আউটপুট দিতে পারেন, বেশি সময় দিতে পারেন এবং দায়বদ্ধতা বাড়ে। এই উদ্দেশে গভর্নমেন্ট এই কাজটা করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট কৃষি ব্লকে দায়িত্ব পালন করেন। কৃষকদের কৃষি প্রযুক্তি ও পরামর্শ দেওয়া, ফসল উৎপাদনের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানে সহায়তা করা এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে তারা সরাসরি কাজ করেন। এর আগে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নিজ জেলার বাইরে পদায়নের নির্দেশনা ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে মাঠপর্যায়ের এসব কর্মকর্তা নিজ জেলার মধ্যে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন।






