টাকার বিনিময়ে এমভি আব্দুল্লাহ জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পেল যেভাবে

168

সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাতে জিম্মি বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ এবং জাহাজের ২৩ নাবিক মুক্তি পেয়েছেন। রবিবার (১৪ এপ্রিল) ভোর পৌনে ৪টায় তথ্য নিশ্চিত করেছেন জাহাজের মালিকপক্ষ কেএসআরএম এর মিডিয়া অ্যাডভাইজর মিজানুল ইসলাম। ২৩ নাবিকসহ আমাদের জাহাজটি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সকল নাবিক অক্ষত এবং সুস্থ আছেন, তাদের অক্ষত অবস্থায় আমরা ফেরত পাচ্ছি।” জলদস্যুদের সঙ্গে সমঝোতার মুক্তিপণের টাকা দেয়া হয়েছে। তবে তাদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জাহাজ ও নাবিকদের আমরা ফিরিয়ে আনতে পারছি।” তবে, সোমালিয়ার একটি সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, ৫০ লাখ ডলার দিয়ে ছাড়া পেয়েছে এমভি আব্দুল্লাহ।জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে রওনা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেএসআরএম গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত রবিবার ভোরে গণমাধ্যমকে জানান, “জিম্মিরা মুক্ত হওয়ার পর জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।”

জিম্মি বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ এবং জাহাজের ২৩ নাবিক মুক্তি পেয়েছেন।

অনলাইন ডেস্কঃ ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়া বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ মুক্তিপণের অর্থ পাওয়ার পর ছেড়ে দিয়েছে জলদস্যুরা।

স্থানীয় সময় শনিবার রাত বারটার দিকে দস্যুরা নেমে যাওয়ার পর ২৩ ক্রুসহ জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে রওনা হয়েছে জানিয়েছেন জাহাজটি মালিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজার মিজানুল ইসলাম।

জাহাজ ও ক্রুদের মুক্তি নিশ্চিত করতে কত টাকা দিতে হয়েছে তা জানা যায়নি। যদিও এ বিষয়ে রবিবার দুপুরে চট্টগ্রামে কেএসআরএম গ্রুপের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ সরকারের নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মুক্তিপণ দিয়ে নাবিকদের ছাড়িয়ে আনার কোন তথ্য তাদের জানা নেই।

ওদিকে জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তির পর ক্রুরা তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন। জাহাজের চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খানের মা শাহানুর আক্তার বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. খানের সঙ্গে তার কথা হয়েছে।

গত বারই মার্চ কয়লা নিয়ে আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে দুবাইয়ের দিকে যাওয়ার সময় জলদস্যুদের কবলে পড়ে এমভি আব্দুল্লাহ।

জলদস্যুরা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর জাহাজটি আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকের কাছাকাছি অবস্থান করছিলো।

‘গোল্ডেন হক’ নামের জাহাজটি কেএসআরএম গ্রুপের বহরে যুক্ত হওয়ার পরে এর নাম দেওয়া হয় ‘এমভি আবদুল্লাহ’। গত বছর এটি সংগ্রহ করে সাধারণ পণ্য পরিবহন করতে থাকে কেএসআরএম গ্রুপ।

সোমালিয়ার উপকূলে সশস্ত্র এক জলদস্যু
সোমালিয়ার উপকূলে সশস্ত্র এক জলদস্যু

কীভাবে মুক্তি পেলো

জলদস্যুদের কবলে পড়ার পর আলোচনার মাধ্যমে জাহাজ ও নাবিকদের মুক্ত করার চেষ্টার কথা জানিয়েছিলো জাহাজটির মালিক কর্তৃপক্ষ। পরে বিভিন্ন সময় আলোচনায় অগ্রগতির কথাও জানানো হয়েছিলো।

শেষ পর্যন্ত আলোচনায় মুক্তিপণের পরিমাণ চূড়ান্ত হওয়ার পর শনিবার রাতে মুক্তি পেলো জাহাজ ও এর ক্রুরা।

মিজানুল ইসলাম বলছেন, রাত বারটায় জাহাজটি মুক্ত হওয়ার পর দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। ৫/৬ দিন পর এটি দুবাইয়ের বন্দরে পৌঁছাবে। সেখান থেকে নাবিকরা কিভাবে আসবে সেটা এখনো সিদ্ধান্ত হয় নি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

উড়োজাহাজ থেকে ডলার ফেলার বর্ণনা পরিবারের স্বজনদের জানিয়েছেন জাহাজে জলদস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা বাংলাদেশি নাবিকরা।

জানা গেছে মালিক পক্ষের সাথে আলোচনার পর মুক্তিপণের জন্য নির্ধারিত ডলার ভর্তি ব্যাগ ছোট উড়োজাহাজ থেকে দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এমভি আব্দুল্লাহ জাহাজটির আশেপাশে স্পিডবোটে অপেক্ষারত দস্যুদের লক্ষ্য করে ছোড়া হয়।

ডলার ভর্তি ব্যাগ পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর জাহাজে অবস্থানরত দস্যুরা জাহাজ ছেড়ে চলে যায়। এরপর জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

তবে বাংলাদেশ সরকারের নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী রোববার একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, জিম্মি নাবিকদের মুক্ত করতে মুক্তিপণ দেয়ার কোন তথ্য সরকারের কাছে নেই।

”প্রথম থেকেই আমরা মুক্তিপণের কথা শুনছি, কিন্তু এটার সঙ্গে আমাদের কোন ইনভলভমেন্ট নেই। এই ধরনের তথ্য আমাদের কাছে নেই যে, টাকা দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনা হয়েছে।”

বহুদিন ধরে আলাপ-আলোচনা ও বিভিন্ন ধরনের চাপের মাধ্যমে তাদের মুক্ত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

জলদস্যুদের কবলে কীভাবে পড়েছিলো জাহাজটি

 

কয়লাবাহী এম ভি আবদুল্লাহ আফ্রিকার মোজাম্বিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাচ্ছিল।

ভারত মহাসাগর দিয়ে যাওয়ার সময় বারই মার্চ দুপুরের দিকে হঠাৎই ছোট ছোট বোট নিয়ে জাহাজের দিকে চলে আসে সোমালিয়ান জলদস্যুরা।

ঐ জাহাজে থাকা একজন ক্রু ঘটনার সময় একটি ভিডিও ধারণ করেন। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার অ্যাসোসিয়েশন সেই ভিডিও দিয়েছিলো বিবিসি বাংলার কাছে।

ওই ভিডিওতে দেখা যায় ছোট ছোট নৌকায় করে জাহাজটিতে ওঠার চেষ্টা করে জলদস্যুরা এবং এ সময় তাদের হাতে বন্দুক ছিলো।

জাহাজে ওঠার পরই সবাইকে জিম্মি করে ফেলে জলদস্যুরা।

জলদস্যুরা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরই হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজের মাধ্যমে মালিক প্রতিষ্ঠানকে একটি বার্তা পাঠায় জাহাজের একজন নাবিক।

যাতে বলা হয়, “জলদস্যুরা জাহাজ দখল করে নিয়েছে। আমাদের নাবিকেরা আটকা পড়েছেন। আমরা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি।”

সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যুরা
সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যুরা 

যেভাবে জাহাজগুলো জলদস্যুর কবলে পড়ে

গভীর সমুদ্রে পণ্যবাহী জাহাজগুলো কিভাবে জলদস্যুদের কবলে পড়ে তা নিয়ে বিবিসি কথা বলেছে বিশেষজ্ঞ ও জাহাজের দুজন সাবেক ক্যাপ্টেনের সাথে।

তারা বলছেন, পণ্য বোঝাই থাকায় জাহাজগুলো সাধারণত ধীরে চলে আন্তর্জাতিক নৌ রুটে। এমভি আব্দুল্লাহর মতো আকারের জাহাজগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ টন পণ্য বোঝাই থাকে। বেশি পণ্য বোঝাই থাকায় বেশির ভাগ জাহাজের গতি থাকে ১৮ থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল।

এ কারণেই গতি থাকে কম। জলদস্যুরা যখন কোন জাহাজকে টার্গেট করে তখন তারা ছোট ছোট বোটে অস্ত্র নিয়ে তিন থেকে চারদিক থেকে আক্রমণ করে।

তিন চারদিক থেকে যখন আক্রমণ করে তখন সামাল দেয়া কঠিন হয়ে যায়।

সোমালিয়ান জলদস্যুর হাতে মঙ্গলবার জিম্মি হওয়া জাহাজটির বেলায়ও তাই দেখা গেছে।

সাধারণত জলদস্যুরা জাহাজটিতে ওঠার পরই কমিউনিকেশনের সব পথগুলো তারা বন্ধ করে দেয়। এরপর ডাকাতি শুরু করে।

যাদের কাছে টাকা পয়সা আছে, অন্য দামি জিনিসপত্র যা আছে সেগুলো নিয়ে নেয়। মোবাইল নিয়ে নেয়। টোটাল কমিউনিকেশন অফ করে দেয় বহির্বিশ্বের সাথে।

জাহাজের সাবেক ক্যাপ্টেন ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন জাহাজে থাকা ক্রুদের সাহায্যে এই জলদস্যুরা তাদের নিয়ন্ত্রিত এরিয়ার কাছাকাছি যে কোন একটি পোর্টে নিয়ে যায়।

“সেখানে নোঙ্গর করে দুয়েকদিন পর গিয়ে তারা মুক্তিপণ দাবি করে। এই মুক্তিপণ দাবি করা হয় মালিক কোম্পানির কাছে”, জানান ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী।

পূর্বের খবরগ্রামীণফোনের রিচার্জের নামে গ্রাহকদের হয়রানি করে চলছে!
পরবর্তি খবরইরান ও ইসরায়েল সংঘাতের পরিণতি কি হতে পারে, আর সামরিক শক্তিতে কে এগিয়ে?