মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতাঃ মীর আব্দুল আলীম

43

 

ঢাকাঃ আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের একদিন পর আমরা এখানে সমবেত হয়েছি এক গভীর আত্মোপলব্ধির তাগিদে। এই তাগিদ থেকেই এই মূল প্রবন্ধ পাঠ করছি। আজকের এই আলোচনা সভায় ২০২৬ সালের বিশ্ব গণমাধ্যম দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় “শান্তিময় ভবিষ্যৎ গড়া: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা” বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম এক অপরিহার্য পূর্বশর্ত; কারণ তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেখানে রুদ্ধ হয়, সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মুখ থুবড়ে পড়ে। তবে এই শান্তিময় ভবিষ্যৎ গড়ার পথে বড় বাধা হলো ‘হলুদ সাংবাদিকতা’, যা বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ বা গুজবকে উসকে দিয়ে সাংবাদিকতার মহান পেশাকে কলঙ্কিত করে। তাই পেশাদারিত্বের নৈতিক সঙ্গতি বজায় রেখে এবং হলুদ সাংবাদিকতার বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে সত্যনিষ্ঠ কলম সৈনিক হিসেবে কাজ করাই হোক আজকের অঙ্গীকার, যাতে গণমাধ্যম প্রকৃতপক্ষেই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ সমাজের দর্পণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রকৃত সাংবাদিকদের শব্দের মিছিলে সত্যের অনুসন্ধান করতেই হবে। শব্দই যখন আমাদের প্রধান অস্ত্র, তখন সেই শব্দের পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। সাংবাদিকতা কোনো নিছক পেশা নয়, এটি একটি দ্রোহ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে। যখন চারদিকে মিথ্যার কুয়াশা ঘনীভূত হয়, তখন একজন সাংবাদিকের কলমই হয়ে ওঠে সেই উজ্জ্বল বাতিঘর যা সাধারণ মানুষকে পথ দেখায়। আমাদের শব্দগুলো যেন কেবল তথ্যের স্তূপ না হয়, বরং তা যেন হয় শোষিতের কণ্ঠস্বর।

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যখন তথ্যের জোয়ারে আমরা ভাসছি, কিন্তু সত্যের জন্য আমাদের তৃষ্ণা মেটেনি। তথাকথিত ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশা কিংবা করপোরেট স্বার্থের বেড়াজালে পড়ে সাংবাদিকতার মৌলিক চরিত্র আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। বস্তুনিষ্ঠতার জায়গায় অনেক সময় স্থান করে নিচ্ছে পক্ষপাতিত্ব। কিন্তু মনে রাখতে হবে, গণমাধ্যম যদি তার নিরপেক্ষতা হারায়, তবে সমাজ তার ভারসাম্য হারাবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং প্রলোভনের চেয়ে নীতিকে আঁকড়ে ধরা।

আধুনিক এ যুগে অনলাইন গণমাধ্যম নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়। সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত অনলাইন সাংবাদিকতা আমাদের সংবাদের সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছে। এখন খবর আর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করে না। উত্তরা মিডিয়া ক্লাব ও অনলাইন মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে তথ্যের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করছে। তবে এই ডিজিটাল যুগে আমাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে, যেন আমাদের প্লাটফর্মগুলো কোনোভাবেই গুজবের কারখানায় পরিণত না হয়। আমাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি শেয়ার যেন মানুষের অধিকার আদায়ের পক্ষে হয় সেদিকে আমাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। অনলাইন পোর্টাল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আমাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। প্রযুক্তির এই বিশাল প্লাবনে যেন আমরা আমাদের নৈতিকতা ভাসিয়ে না দিই। আমাদের ভাষা হবে শাণিত কিন্তু মার্জিত, আমাদের যুক্তি হবে অকাট্য কিন্তু বিদ্বেষহীন। যুক্তির পিঠে যুক্তি সাজিয়ে সমাজকে পথ দেখান, আমাদেরও সেই পথে হাটতে হবে।

প্রিয় সুধী, আলোচনার এই পর্যায়ে অত্যন্ত বেদনার সাথে আমাদের একটি কালিমার কথা বলতে হয় তা হলো ‘হলুদ সাংবাদিকতা’। যখন সংবাদ পরিবেশনের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ না হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা চরিত্রহনন হয়, তখন তা আর সাংবাদিকতা থাকে না, হয়ে ওঠে এক সামাজিক ব্যাধি। চটকদার শিরোনাম আর অর্ধসত্যের কারবার করে যারা সাময়িক দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান, তারা আসলে এই মহান পেশার শিকড় কেটে দিচ্ছেন। হলুদ সাংবাদিকতা কেবল সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নৈতিকতাকে নষ্ট করে না, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজের বিশ্বাসযোগ্যতাকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা তৈরি করা কোনোভাবেই পেশাদারিত্ব হতে পারে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, মিথ্যার আয়ু ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্যের তেজ অবিনশ্বর।

সাংবাদিকতার শক্তি তার নৈতিকতায়। রাষ্ট্র ও সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে আমাদের মেরুদণ্ড হতে হবে ইস্পাতকঠিন। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের পেশাদারিত্বের মধ্যে একটি স্বচ্ছ সমন্বয় বা ‘এলাইনমেন্ট’ প্রয়োজন।

পূর্বের খবরআজ বোমা-উত্তরা মিডিয়া ক্লাবের বিশ্বমুক্ত গণমাধ্যম দিবস আলোচনা সভা