নিউজ২১ডেস্কঃ
১.
‘মুগ্ধপ্রাণ’ কাজলকে নিয়ে লিখতে বসলে কোন প্রকার বিশেষ বিশেষণ ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করি না, স্বজনপ্রীতিও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। সব সম্পর্ক রক্তের মাধ্যমে তৈরি হয় না, সব আত্মীয়তা আনুষ্ঠানিকতার আয়োজনে আবদ্ধ থাকে না। আত্মার সাথে আত্মার নিবিড়তর বন্ধনের সম্পর্কই প্রকৃত সম্পর্ক, যথার্থ আত্মীয়তা। আমি সদানন্দে স্বীকার করে কৃতার্থ হই, কাজল আমার ভাই, সে আমার- আমাদের চিন্তনসখা, পরম মানবিক ‘মানুষ’ (পরমহংসদেব কথিত মানুষ= মান+হুস)। আজ আমার পরম প্রিয় এই ভাইজানের, কাজলের (Kajal Gosh) জন্মদিন। শুভ জন্মদিন কাজল। রক্তের সম্পর্কের প্রতি আমার তেমন আস্থা কোনকালেই ছিলো না, আজো নেই। আমি ‘পাবনার পুলা’ হলেও ভবের হাটের ভাবের পাগল, আত্মার পরম আত্মীয়তায় চরম বিশ্বাসী। আর তাই ‘প্রাণে প্রাণ মিল’ হওয়ায় কাজল আমার ভাই, আমার আপনজন, স্বজন-সুজন-সুহৃদ। আমাদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সকলের প্রিয়জন, ‘নন্দন গুরু’ কায়েস ভাইয়ের (অকাল প্রয়াত প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস) সাথে সবসময় দ্বিমত পোষণ করে বলেছি, আজও বলবো, ‘যত দোষ কাজল ঘোষ’ নয় ‘ভাই আমার কাজল ঘোষ / নাই তাই তার কোনই দোষ।’ আগে ‘মলয় এসে কয়ে’ যেতো কানে কানে, আর এখন ফেসবুকসূত্রে জানা যায়, ‘কিশোরগঞ্জের চিরকিশোর’ আমার এই প্রিয় ভাইটির ধরাধামে শুভাগমন ঘটে ১৯৭৭ সালের ৩০ জুন, (২৭ জুন নয়, আগের লেখাগুলোয় এই তারিখের তথ্য সঠিক ছিলো না বলে আন্তরিকভাবে দু:খিত)। সুতরাং জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিরন্তর, আবারো কাজলকে। ‘নবঘন ঘোর’ বর্ষণ ক্লান্ত জুনের জাতক কাজল আক্ষরিক অর্থেই আমার, আমাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে ভালোবাসার জলে-স্থলে মোহন বাঁশীটি আপনমনে বাজায়। মননশীলতায় সদা জাগ্রত প্রিয় মুখ আমার ভাই, আমার চিরন্তন চিন্তনসঙ্গী কাজল। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমেই আমার পরিচয় কিন্তু সেটা ছাপিয়ে পারিবারিকভাবে জড়িয়ে পড়ি আমরা আপন সহোদরের ভূমিকায়। প্রীতিতে অনুরাগে হয়ে উঠি আবেগি ‘বড়োওওওওও ভাই’। নিরন্তর ওর জয় হোক। ভাই কাজলকে ভালোবাসি বলেই আমার লেখা ‘দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির ভারতভ্রমণ’ গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছি অন্য আরো অনেককে বাদ রেখেই।

২.
দৈনিক মানবজমিন-এর বার্তা সম্পাদক এবং চ্যানেল আই-এর প্রযোজক পদের দায়িত্ব যৌথভাবে যোগ্যতার সাথেই দীর্ঘদিন যাবত পালন করে যাচ্ছে কাজল ঘোষ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ কর্মি হিসেবেও নানা দায়িত্ব দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে পালন করেছে কাজল। আবার কাজল পৃথিবীর প্রতিদিনের জীবন থেকে পালিয়ে থাকতে চায় না, জানেও না। আর তাই পরিবারের প্রতি তাকে যথেষ্ট সংবেদনশীল ও দায়িত্ববান সদস্য হিসেবে লক্ষণীয়ভাবে দৃশ্যমান। প্রায় দু’দশকের ঘনিষ্ঠতার সূত্রে বলতেই পারি, রুচিতে মননশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত ভাইটি আমার নিত্য সত্যান্বেষী।মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ কাজল মুক্তচিন্তায় আস্থাশীল, যুক্তিতেই মুক্তির অনুসন্ধানে ব্যস্ত সময় কাটায়। জাতিভেদ বা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষ নয় মোটেই সে। ব্যক্তি স্বাধীনতায় প্রবল বিশ্বাসী সে তাই জ্ঞানের আলোতেই সভ্যতার সকল সংকটকে দূর করতে তৎপর। সৃষ্টিশীলতার আবেগ ও অনুভবের প্রেরণায় প্রোজ্জ্বল রূপের প্রতিচ্ছবি কাজলের মন ধৈর্য, নিষ্ঠা আর দায়িত্বে পরিপূর্ণ। সম্প্রতি তার সৃষ্টিশীলতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে- প্রকাশনা শিল্পে। চমৎকার কয়েকটি গ্রন্থ ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে তার নবপ্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশনাডটকম থেকে। আমি প্রবলভাবে আশাবাদী কেবল ব্যবসা নয়, বই পড়ার বিকেন্দ্রীকরণে সুলভমূল্যে প্রকৃত পাঠকের হাতে মানসম্পন্ন বইটি পৌঁছাতে কাজলের প্রয়াস সফল হবেই হবে। প্রকৃত পাঠকের বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ক্রয় ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে কাজলের প্রকাশনাগুলোর মান বজায় থাকবে এবং প্রকাশ ও বিপনণে বৈচিত্র্য আসবে, মূল্যও যৌক্তিক থাকবে।
৩.
আমার মতোই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কলেজ কর্মসূচির সক্রিয় সদস্য ছিলো কাজল। সেখানেই পরিচয়, আত্মীয়তা। আমাদের অনেকের মতোই আড্ডা আর আলাপনের ‘গভীরতর অসুখ’, নেশার কারণে নিয়মিত পাঠ অভ্যাস এবং পাঠ আলোচনা ওর রক্তের মধ্যে মিশে আছে। কেন্দ্রের নিয়মিত নানা চক্রের শেষান্তে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রের প্রাক্তনীদের নব আয়োজনের পাশপাশি ছায়ানটের পাঠচক্রেও আমরা সতীর্থ ছিলাম অনেকদিন। নানা দৃশ্যমান-অদৃশ্য কারণে আমরা প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রের নব ভুবনে-ভবনে পাঠচক্র আর পরিচালনা করতে পারিনি। অন্যত্র চেষ্টা করে সেই আগের আবেগি আবহ আমরা আনতে পারিনি, টানে ঘাটতি পড়ে। এসব কথা ভাবলেই মন কেমন কেমন করে আমার যেমন, কাজলেরও তেমনই নিশ্চিত জানি। যদিও প্রয়োজনে অপ্রিয় সত্য উচ্চারণেও দ্বিধা করে না কাজল আমাদের অনেকের মতোই। আর তাই নানা সময়ে অনুচ্চারিত দ্রোহ কিংবা নিষ্ফলা প্রতিবাদের বন্ধ্যত্বের প্রতিভাস ওর চিন্তার প্রতিফলনে দৃশ্যমান আমার কাছে। ভুবন মাঝির কারসাজি বুঝি না বলেই হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতোই বুদ্ধদেব বসুকে মনে পড়ে ‘বহিরাগত’ আমার, ‘বিরূপ ব্যভিচারে দেহের কোষে যদি / মনের বীজাণুর গরল বেড়ে যায়, / তাহলে স্বাস্থ্যের আকর কোনখানে? / বুঝিনি, আমরা যে এমন অসহায়।’

৪.
চিন্তনসখা কাজল আর নন্দনগুরু কায়েস ভাই আমার স্মৃতিতে গভীরতর প্রীতির নাম, স্মৃতির শিহরণ। বড্ড অকালেই অচেনালোকে ২০১৭ সালের ১০ মার্চ বিনা নোটিশে চলে গেলেন কায়েস ভাই। ভাই হারানোর বেদনার নীল সাগরে সিক্ত হয়ে ওঠে আমাদের জীবন। কায়েস ভাইয়ের মহাপ্রয়াণে বেদনাহত কাজলের অনুভব ছোঁয়া যাক ওর রচনা থেকেই। ফেসসবুকে একটি ছবিসহ স্মৃতিচারণা করে কাজল লিখেছে আমাদের অনেকের মনের গোপন কথাগুলোই, ‘ছবিটি ২০১০ সালের ২৫শে ডিসেম্বরের। বিশ্বাসহিত্য কেন্দ্রের কলেজ কর্মসূচির পঁচিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের। মঞ্চে আমাদের মধ্যমনি ছিলেন কায়েস ভাই। এমন প্রাণময় মানুষ কমই দেখেছি। যিনি সরলভাবে হাসাতে জানতেন। ছোট ছোট শব্দের বোলচালে কাছে টানতেন। এক নির্ভেজাল ভাল মানুষ ছিলেন। যখনই দেখা হয়েছে কাজলা বলে টেনে ধরতেন। শিল্পের নানা শাখায় এক অসাধারণ পারঙ্গমতা নিয়ে বিচরণ করতেন কায়েস ভাই। কি শিল্প; কি সাহিত্য; কি চলচ্চিত্র; কি চিত্রকলা কায়েস ভাই অপরিসীম আগ্রহ আর ধৈর্য্য নিয়ে নতুন নতুন অধীত বিষয়ে কথা বলতেন। কায়েস ভাইয়ের ‘উইট অ্যান্ড হিউমার’ কখনো কখনো টেনিদা-ঘনাদাকেও হার মানাতো। কথার ইন্দ্রজালে মুগ্ধ হতাম যখনই কোন বিষয়ে কথা বলতেন। চীনাবাদামকে চৈনিক বাদাম, মিতা ভাবীকে মাইটা ভাবী, দ্রুতকে অধিকতর তাড়াতাড়ি বুঝাতে দ্রু-ত বলতেন। আমাদের দেখলেই বালক বলে সোল্লাসে ডাক দিতেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রের আড্ডাগুলোতে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতেন আর বইয়ের বাইরেও যে একটি ভাবের বা জ্ঞানের জগত আছে তাই জানান দিতেন। কায়েস ভাইকে নিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছুই স্মৃতিই সামনের দিনগুলোর বাস্তবতা এটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। সবাইকে একদিন যেতে হবে এটাই সত্যি। কিন্তু আর কটা দিন, কিছুটা সময় এক টেবিলে আড্ডা দিলে আমাদের হাসি আর আনন্দে মাতিয়ে বিদায় নিলে খুব দোষের কি কিছু হতো? বিধাতা বড় নির্দয়…।’
৫.
আমার বিজ্ঞানমনস্ক এই ভাইটি প্রচণ্ড রকম অনুসন্ধিৎসু পাঠক, গভীর ভাবুকও। চিন্তক ও যুক্তিবাদি কাজলের কাছে আবেগের চেয়ে সত্য আর সুন্দরের সন্ধানই শিল্পের দায় ও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলেই মনে হয়েছে আমার। কাজলের সাহিত্যরুচি, নান্দনিকবোধ এবং শিল্পচিন্তার প্রতি আমার আস্থা ও আগ্রহ পাঠচক্রের আলোচনায় যেমন ছিলো আজো তেমনই অবিচল আছে। সময়ের সাথে সাথে ওর ভাবনার গভীরতা বাড়ছে, ভাষার উপর দক্ষতা ও প্রয়োগের কৌশল আরো সুনিপুণ হচ্ছে। কাজলের বেশ কয়েকটি প্রকাশিত গ্রন্থও আছে। ওর লেখার হাতও সাবলীল এবং ভাবনার খোরাক জোগায়। দৈনিক মানবজমিনে একসময় নানান বিষয়ে উপসম্পাদকীয় লিখতো। দু:খের বিষয় আমাদের পত্রিকাগুলো কর্পোরেট বাণিজ্য-বিজ্ঞাপনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ায় চিন্তা চর্চা কিংবা ভাব-ভাবনা প্রকাশের চেয়ে নগদ নারায়ণকেই বেশি উপাদেয়-উপভোগ্য মনে করে বলে উপসম্পাদকীয় জাতীয় মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশে চরম অনীহা প্রকাশে সংকোচ করে না।ফলে আমরা কাজলের একটু অন্য ধরনের লেখা পাঠের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কাজলের দু’একটা লেখার নমুনা শেষের দিকে উপস্থাপন করার ইচ্ছে আছে। কাজল সুরের পাগল। কত রাত জেগে যে আমরা ছায়ানটের ধ্রুপদি সঙ্গীত আসর, বেঙ্গলের বিশাল আয়োজনে সুরের মধুর সময় কাটিয়েছি, সে সবও আজ মনে পড়ছে খুব। লেখক কাজলের প্রতিও আমার বিশেষ অনুরাগ রয়েছে। ওর ‘নানা রঙের ঢাকা’ বইটি যে কোন আগ্রহীজনকেই রাজধানী ঢাকার পুরাতন ইতিহাসের অলিতে-গলিতে ঢু মারতে, চলার পথে স্পষ্টভাবেই আলো ফেলবে বলে আমার ধারণা।আবার ছোটদের জন্য লেখা ‘এই বইটার নাম কী’ বইটিও শিশুমনের সৃজনশীল জ্ঞানবিকাশে দারুণ সহায়ক ভুমিকা রাখবে বলে মনে করি। চার্লি চ্যাপলিনের জীবনী গ্রন্থটিও পাঠের সময় আবেগ-অনুভূতিকে নাড়া দেয়। কাজল রচিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হলো- হাজার বছরের সেরা বাঙালি (২০০০) অনন্যা, অটোগ্রাফ (২০০২) অনন্যা, এই বইটার নাম কি (২০০৪) দিব্য, চির বিপ্লবী চে (২০০৭) আজকাল, নানা রঙের ঢাকা (২০০৮) নালন্দা, স্মৃতির ঢাকা (২০০৯) নালন্দা, চার্লি চ্যাপলিন (২০১১) নালন্দা, ছেলেবেলার টুকরো স্মৃতি (২০১৭) দোয়েল, প্রথম লেখার গল্প (২০১৭) অনন্যা, মিথের শহর (২০১৯) নালন্দা, গৌতম বুদ্ধ (২০২২) ভাষা প্রকাশ।
৬.
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতি কাজলের টান অন্তরাত্মার টান। তাই পুরানো কেন্দ্রের ভুবন আর নতুন ভবনের মাঝে খুঁজে ফেরে স্মৃতির রংধনু-মেঘ, প্রজাপতিকে। অকপটে কাজল লিখছে, ‘পুরনো ছবির তালিকায় আরও একটি ছবি চোখে পড়লো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আমতলার। কলেজ কর্মসূচির কোনও এক অনুষ্ঠানের। আজ সেই আমতলা নেই। সেই পুরনো ভবনটিও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্মৃতিনন্দন কিনা জানি না তবে দৃষ্টিনন্দন এক ভবন সেখানে ঠাঁই পেয়েছে। শ্রী বাবু, রাধে শ্যাম আর মামুর চিড়ে ভাজা আর ছোলা মুড়ি অতীত হয়েছে তাও এক দশক। লনের সবুজ ঘাসেরা চাপা পড়েছে নগর সভ্যতার জাঁতাকলে। স্মৃতির ঘুণপোকাটা কেবলই হাতড়ে ফেরে সুখময় বুনো সেই দিনগুলোকে।’কেন্দ্রের প্রতি, সায়ীদ স্যারের প্রতি কাজলের প্রেম অকৃত্রিম। তারই প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় ওর কথায়, লেখায়।‘ম্যাজিক দেখাতে পারেন দু’নেত্রী’শিরোনামের লেখার শুরুতেই স্মৃতিকাতর কাজল তাই লিখছে, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র একটি স্বনামখ্যাত প্রতিষ্ঠান। আলোকিত মানুষ গড়া যার কাজ। গত তিন দশকেরও বেশি সময় দেশজুড়ে চলছে তাদের বইপড়া আন্দোলন। কিশোর যুবাদের মননের বিকাশে অবিরত কাজ করে চলেছে। টানা পথ চলায় প্রতিষ্ঠানটি তার নৈর্ব্যাক্তিক মান বজায় রাখতে পেরেছে। দেশের নানা টানাপড়েনে এ থেকে বিবৃতি আসেনা। দেশের কোন সঙ্কটে এখান থেকে মিছিল হয় না। এমন নানা অনুযোগ, নানা প্রশ্ন হজম করতে হয় এখানকার কর্মীদের। শত প্রতিকূলতাতেও, সমালোচনাতেও শুধু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর নীতির কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। যদিও রাজনীতির বাইরে এদেশে কিছুই নেই। তবু ঢালাও রাজনীতি আমাদের সবকিছু বিভক্ত করেছে। একমাত্র সায়ীদ স্যারই ব্যতিক্রম। যিনি সস্তা কিছুর কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেননি। জনপ্রিয় এই শিক্ষাবিদ বই দিয়েই সমাজ বদলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।’ (দৈনিক মানবজমিন, ১৬/৪/২০১৩)।
৭.
সুপ্রিয় স্বজন কাজলকে নিয়ে লিখতে গিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অনেক প্রিয়জনের মুখই মনের আয়নায় ভেসে উঠছে, কাকে রেখে কার কথা বলি? মাযহার ভাই, আমীরুল ভাই, রিটন ভাই, বকুল ভাবি, সবুজ ভাই, মিতা ভাবি, লিলিদি, চয়নদা, বিপ্লব, মোখলেস, রোমেল, মোর্তোজাসহ অসংখ্য প্রিয়জনের মুখ স্মৃতিপটে ভাসছে। সেই সাথে পুষ্পিতা, হাসিনা, সজীব, সুপ্রিয়া শৈলী, ইরাজ, জাভেদ, নজরুল, ডা. সঞ্জয়, লেনিন ভাই, ইভান ভাইসহ অনেকের সাথে কাটানো পাঠচক্রের সাথে সাথে আহারে-বিহারে-ভ্রমণের মজার স্মৃতিগুলোও জেগে উঠছে। আর আমরা সমবেত হওয়া মানেই নিজেদের কাজের প্রতি বঙ্কিম আত্মসমালোচনাও ছুঁয়ে যাওয়া। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নানা কাজের মূল্যায়ন কিংবা সমালোচনামূলক আলোচনা উঠে আসলে কাজলের ভূমিকা ভাবতে গিয়ে প্রখ্যাত ইংরেজ কবি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার চরণ স্মরণে আসে, ‘পৃথিবীর সঙ্গে আমার ঝগড়াটা প্রেমিকের ঝগড়া’। স্মৃতিময় ভুবন আর সুরম্য ভবন নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা স্বাভাবিকভাবেই আসে প্রসঙ্গক্রমে। কাজলকে প্রশ্ন করতে, সমালোচনা করতে দেখি, তবে সে সবই অনেকটা সমঝোতার সহনশীলতা আর প্রেমের প্রত্যয় নিয়ে করা।ফলে সে কাউকে দূরে ঠেলে দেয় না, তার থেকে দূরে সরে যাওয়া যায় না।‘সমস্ত অনৈক্যের অন্তরালে সকলের মধ্যেই যখন গভীর মূলে মিল থাকে, তখনই আলোচনা সম্ভব’ বলেই কাজলের সাথে আলোচনা শেষে যেন পাওয়া যায় ‘কথাবার্তা বলার যে একটা উজ্জীবনী প্রভাব, যাতে মন সরস হয়, মগজে নানারকম নতুন ভাবনা খেলা করে, শরীরে ফুর্তি আসে’। আজ জ্ঞানসাধনার নিবিড়ভুবনের সহায়ক উপাদান খুঁজে পাওয়া দায় ঠেকে। কালের সর্বপ্লাবী স্রোতের টানে পড়ে আমাদের চেনাজগতের বাইরে চলে যায় আমগাছ, ছাদ, সবুজ লন সবই। আর অলস প্রিয়জন স্মৃতির জলছবি আঁকে বসে বসে। আলো-আশা, দুরন্ত আলোড়ন, প্রাণের তরণী আর নবজীবনের ডাকে যুগান্তরেও কেন যেন ‘সবি জীর্ণ হয়ে আসে’ কিংবা মনে হয় ‘কালস্রোত সর্বগ্রাসী’।
৮.
রাজধানীর বাংলামোটরের মূল সড়ক থেকে আমাদের কেন্দ্রে প্রবেশমুখের ঠিক উল্টো দিকেই একবার এক বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপন নজর কেড়েছিলো আমার। কোন একটি ব্যাংকের প্রচারণায় লেখা হয়েছিলো ‘লোকাল ব্যাংক, গ্লোবাল নেটওয়ার্ক’। মনে ধরা সেই বাণীটি কেন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে মনে করতাম একসময়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে মোবাইল কোম্পানীর মাত্রাধিক গ্রাহক সংখ্যাবৃদ্ধির উপজাত হিসেবে ভয়াবহ নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের নিদারুণ কাহিনি শুনতে শুনতে আমার সংশয়ী মনে কেন যেন তেমন কোন অশুভ আশংকা জাগে প্রাণের প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও। নম্রভাষী কাজল আমার বচন কথা শুনে কেবলই মুচকি হাসে, আশ্বস্তু করার আপ্রাণ চেষ্টা করে।বহুতল ভবন হয়েছে ঠিকই কিন্তু পাঠচক্র পরিচালনার সুযোগ বা ‘স্পেস’কমে এসেছে, মানতে মন চায় না কাজলের। প্রকল্পের আলোয় ভালোই সচল ভাসমান গ্রন্থাগারের চাকা কিন্তু নওগাঁর প্রয়াত জাহিদ আনোয়ার ভাই, বগুড়ার শ্যামল ভট্টাচার্য স্যার, ফরিদপুরের আলতাফ স্যার, নাটোরের শেখর স্যার কিংবা রাজশাহীর আহমেদ সফিউদ্দীন ভাইদের মতোন মানুষদের সেই পাঠ আলোচনা কেন্দ্রিক সৃজনশীল নানান কার্যক্রম কিংবা সাংস্কৃতিক জাগরণের অংশীদারি অভিগম্যতা দৃশ্যমান নয় বলেই প্রায় নিয়মিত তৃণমূলের পর্যটক, ঘুরে বেড়ানো এই আমি প্রশ্ন উপস্থাপন করি কাজলের কাছে। ভাইটি আমার কেবলই মুচকি হাসে আর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে খাবার শেষ হওয়ার আগেই পৌঁছানোর তাগাদা দেয়। মুখরোচক খাবার শেষ হয় কিন্তু বিত্তের আর চিত্তের জাগরণ, আলোড়ন ভিত্তিক নিবিড় আলাপন আমাদের শেষ হয় না কোনদিন। বুদ্ধদেব বসুকে শুধু মনে পড়ে, ‘জলের উজ্জ্বল শস্য, রাশি-রাশি ইলিশের শব,/ নদীর নিবিড়তম উল্লাসের মৃত্যুর পাহাড়।’(‘ইলিশ’, দময়ন্তী)
৯.
দেবি সরস্বতীর পরম আর্শীবাদে কোন এক লক্ষ্মীভারাক্রান্ত লগ্নে কাজলের সাথে আমার মধুর দাতা-গ্রহীতার দারুণ সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০০০ সালে আমি যখন সোনালী ব্যাংকের চাকুরিতে যোগদান করি, তখন পেশাগত কারণে বিশেষ সুবিধা আমার ছিলো বলেই যৌবনের আনন্দে সকল প্রকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবসময় নতুন ব্যাংক নোট ব্যবহার করতাম। তখন মানিকগঞ্জের এই মানিক ফাঁকা মন নিয়ে ঢাকায় জন-অরণ্যের নির্বাসনে ভ্রমণে এলেই অন্য যে কোন কিছুর চেয়ে প্রিয়জনকে সাধ্য অনুযায়ী নগদ অর্থ প্রদানকেই বেশি গুরুত্ব দিতাম। ফলে ভাই কাজল আর রুমার (অনন্যা রুমা, যিনি আবার আমার আম্মাজানও বটে!) মতোন স্বজনকে নতুন নোট প্রদান করতে পেরে ধন্য মনে করতাম, খুশিই হতাম। নতুন টাকার নোট প্রদানের সেই রীতি চিরায়ত প্রথায় রূপ নিয়েছে। তবে আগে ছিলো রুমা আর কাজল, ক’বছরে গ্রহীতার সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটেছে, যুক্ত হয়েছে কাজলের ‘অর্ধেক আকাশ’ পুষ্পিতা। তবে এবার ত্রিরত্নের ‘চাওয়া-পাওয়া’র দিন শেষ হয়ে ‘জুনিয়র কাজল’ ঘোষের আর্বিভাব ঘটেছে দৃশ্যপটে। সুতরাং বেরসিকের সুরে গাইতেই পারি, ‘হরি দিন তো গেলো …’। এবার ওর প্রিয়তমা স্ত্রী, আমার ছোটবোন পুষ্পিতার প্রতি অগাধ প্রীতির স্মৃতিচারণের চরণামৃত পান (পাঠ) করা যাক। কাজল-পুষ্পিতার বিয়ে বার্ষিকীর দিনে কাজল বিরচিত কয়েকছত্র, ‘সকল সমস্যা-সম্ভাবনায় অসীম ধৈর্য নিয়ে যে থাকে আমার পাশে। দিন শেষে বাড়ি ফেরা না ফেরার প্রতিটি মুহূর্ত নির্ঘূম অপেক্ষায় আমার জন্য কাল কাটে যার। বিপদ-আপদ-রোগ-বালাইয়ে ছায়ার মতো ভরসা দেয় যে। সেই মানুষটি পুষ্পিতা মহলানবীশ। যার সঙ্গে সাতপাকে বাঁধা পরেছিলাম ২০১১ সালের ১১ই মার্চ। তারও কেটে গেছে ছয় বছর… ।’ জয়স্তু ভাইট আমার!এই প্রণয়, প্রেম যেন দিনে দিনে আরো গভীর থেকে প্রগাঢ়তর হয়, সেই শুভ কামনাই করি একান্ত চিত্তে নিত্য।
১০.
পারিবারিক দায়িত্ব পালনেও ভীষণই সজাগ ও সক্রিয় কাজল। অতি সম্প্রতি তার অনুভবকে ফুটিয়ে তুলেছে একটি লেখায়। ২০১৬ সালের ১ জুন প্রিয়জনের শোকগাথার সূচনাতেই আত্মকথনে কাজল লিখছে, ‘শেষ পনেরদিন লড়ছি বাবাকে নিয়ে। হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডাক্তারের চেম্বার। হরেক রোগি আর হরেক ভোগান্তি। কখনও কান্না আর কখনও হাসি। বয়সের ভারে বাবার চামড়া কুচকে এসেছে। ক্যানোলা রগ খুঁজে পাচ্ছে না। নার্সদের ত্রাহি অবস্থা। স্যালাইন আসি যাই করছে। রক্ত আর ইউরিনের নানা পরীক্ষা। পরিবারের সবচে বড় শিশুটিকে পালা করে সময় দেয়ার ডিউটি। মনে শক্তি সঞ্চয় করছি। সান্ত্বনা খুঁজছি। এর মধ্যেই পুষ্পিতা জানায়, দাদুও খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। একজন ধানমন্ডি ৮-এ আনোয়ার খান মডার্ণ হসপিটালে। অন্যজন গ্রীনরোডে গ্রিন লাইফ হসপিটালে। ছুটছি আনোয়ার খান থেকে গ্রিন লাইফে। দাদুর কথাও এলোমেলো। স্মৃতিরা জড়িয়ে যাচ্ছে। শরীর কেবলই জীর্ণ থেকে জীর্ণ হচ্ছে। বাবাকে দুষ্টামি করে বলছিলাম, ডাক্তার বলেছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। চলেন, বাপ-বেটা একটু দৌড়ে আসি। দম সঞ্চয় করে বাবা জড়ানো গলায় বলেছেন, ‘না বাবা তুমি যতোই বলো, তা আর হবে না। আর সেই দিন ফিরবে না। মনের সঙ্গে লড়াই করছি আর ভাবছিলাম, জন্মের সঙ্গে-সঙ্গে একটি অজানা গন্তব্য আমাদের নিশ্চিত। তা হলো মৃত্যু। কিন্তু একটিই প্রার্থনা তা যেন হয় কাজের মধ্যে সচল থাকতেই। বন্ধু, সহকর্মীদের এই কথাটি বলাবলি করছি গত ক’দিন।’ এমন দায়িত্ববান ভাইটিকে স্যালুট না করে পারা যায় ?
১১.
আমার অনেক অনুরোধেও কাজল নিয়মিত লেখে না, লিখতে পারে না বলেই প্রতীয়মান হয়। জীবন ও জীবিকার টানে, পারিবারিক দায়-দায়িত্ব পালনের কারণে সময়ের অভাবেই হয়তবা ওর নিয়মিত কলম ধরা হয়ে ওঠে না।কিন্তু আমি ওর কলমের শক্তির ব্যাপারে আশাবাদী, আস্থাশীল। এবার কাজলের লেখার যৎসামান্য নমুনা উপস্থাপন করা যাক। ‘দুঃখ, মূসা ভাই জানতে পারলেন না’ লেখার শুরুটাই করছে এভাবে, ‘কানাডা থেকে যখনই রিটন ভাই (খ্যাতনামা ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন) দেশে ফিরেন তখনই দেখা হলে অদ্ভুত কায়দায় একটি কথা বলেন। ঢাকাইয়া ঢং-এ বলা কথাটির হুবহু উচ্চারণ, কি মিয়া তুমিতো প্রাতঃস্মরণীয়। প্রথম যেদিন কথাটি শুনেছিলাম একটু হোঁচট খেয়েছিলাম। বলে কি? কারণ, সাধারণত এ জাতীয় শব্দ আমরা পরলোকে চলে গেলে ব্যবহার করে থাকি। পরে তিনি ভেঙে বললেন, আরে মিয়া প্রত্যেক দিন সকালে কানাডায় বসে টিভি পর্দায় তোমার অনুষ্ঠান দেখি। শেষে স্ক্রিনে যখন নামটি ভেসে ওঠে ঠিক তখন তোমার চেহারাটাও মনে পড়ে। প্রাতঃকালে স্মরণীয় বলেই তুমি আমার কাছে প্রাতঃস্মরণীয়।’ (দৈনিক মানব জমিন, ২১ এপ্রিল ২০১৪)।
১২.
`মাথার ছায়া, হাতের লাঠি’ শিরোনামে বাঁশ নিয়ে কাজল লিখছে, ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ঐ, মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই’। কবিরা বরাবরই কল্পনাপ্রবণ। কিন্তু যতীন্দ্রমোহন বাগচীর লেখা এই কবিতাটিতে কল্পনার মিশেল যত না ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল বাস্তবতার উপস্থিতি। ভাবুন তো একবার, ভরা পূর্ণিমায় আপনি বাঁশবাগানের ভিতর একা দাঁড়িয়ে। উপরে দিগন্তবিস্তৃত আকাশ। চোখ যেদিকে যায় কেবলই অগুনতি তারা। দূরে অবস্থান নিয়েছে সপ্তর্ষি। বাঁশঝাড়ে ঝিরিঝিরি বাতাসে পাতার মর্মর ধ্বনি। পা পড়ার মচমচ আওয়াজ। নীরবতায় গা ছমছম করা পরিবেশ। আপনার সঙ্গী তখন কেবলই কাছে, তবু দূরে আপনারই ছায়া। খানিকটা সৌভাগ্য হয়েছিল আমার সেই সৌন্দর্যের ছোঁয়া পেতে। মন জুড়িয়ে উপলব্ধি করতে, বাঁশঝাড়ের ঘন ছায়ায় প্রকৃতির সেই অপরূপ রূপ। বাঁশ নিয়ে কত না প্রবাদ-প্রবচনের ছড়াছড়ি।‘বাঁশ পাকলে সরু, বাড়ির কর্তা পাকলে গরু’, ‘দাতার নারকেল, বখিলের (কৃপণ) বাঁশ’, ‘কাঁচায় না নোয়ায় বাঁশ, পাকলে করে ট্যাঁসট্যাঁস’, ‘বাঁশ বনে ডোম কানা’, ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়’, ‘বাঁশ মরে ফুলে, মানুষ মরে ভুলে’। আর কেউ কারও বিরুদ্ধে বিবাদে জড়ালে বাঁশ দিতে ভুল করে না- এটা নতুন কিছু নয়।’ (দৈনিক মানবজমিন : ১৪.১০.২০১৩)।
১৩.
আমার প্রিয় ভাই কাজলের জন্মদিনের শুভক্ষণে আবারো কায়মনে কামনা করি, নিরন্তর জীবনানন্দে কাটুক তার আগামি দিনগুলো শারীরিক সুস্থতায়, মানসিক শক্তির তীব্রতায়। সেইসাথে প্রত্যাশা সপরিবারে, প্রিয়জন সকলকে নিয়ে ভালো থাকুক, আর আমরাও যেন বাদ না থাকি তার ভালোবাসার ভুবনের ছায়াতল থেকে। কাজলের জয় হোক।
লেখকঃ আবদুল্লাহ আল মোহন





