বিএনপি সরকার ও দল পৃথক সত্তা পরিকল্পনায় নেতৃত্ব সাজাচ্ছে

37
ঢাকাঃ বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোনো কথা নেই। যে রাজপথ একসময় ছিল কাঁদানে গ্যাস, লাঠিপেটা আর গ্রেপ্তারের আতঙ্কে ঘেরা, সেই রাজপথ পেরিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছাতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) পার করতে হয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছরের এক কণ্টকাকীর্ণ পথ।
২০০৯ থেকে ২০২৪, দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, মামলা-হামলা আর নিপীড়ন সহ্য করে দলটি আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। ২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি এখন সরকার পরিচালনার পাশাপাশি নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দলটির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল।
এবারের কাউন্সিল নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণের এক যুগান্তকারী টার্নিং পয়েন্ট। দলের হাইকমান্ডের স্পষ্ট বার্তা—যারা বিগত ১৭ বছর রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে দলের ছায়া হয়ে ছিলেন, আগামী দিনে তারাই হবেন দলের কাণ্ডারি।
বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলে রূপান্তরের পর যেকোনো রাজনৈতিক দলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সরকার ও দলের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা। ইতিহাসে দেখা গেছে, দল যখন সরকারে একীভূত হয়ে যায়, তখন তৃণমূলের সাথে নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়ে। বিএনপি এবার সেই ফাঁদে পা দিতে নারাজ। দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দল পরিচালনা—এই দুটিকে সম্পূর্ণ পৃথক সত্তা হিসেবে দাঁড় করানোর এক মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
 

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগরের এক সিনিয়র নেতা বলেন, দলের যে নেতৃবৃন্দ সরকারে থাকবেন, তারা দেশ ও জাতির জন্য কাজ করবেন। কিন্তু আমাদের বিএনপির যে মূল সংগঠন, সেটার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা এবং নিবেদিতপ্রাণ নেতৃবৃন্দ দরকার। আমি মনে করি, এই দুটিকে আলাদাভাবেই দেখা প্রয়োজন।

ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেই দলে সুবিধাবাদীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। রাজনীতিতে যাদের বলা হয় ‘হাইব্রিড’ নেতা। তবে ১৭ বছরের চরম দুঃসময় পার করে আসা বিএনপির তৃণমূল এবার এ বিষয়ে বেশ সোচ্চার। দলের পরীক্ষিত কর্মীরা চাইছেন, কোনোভাবেই যেন বসন্তের কোকিলরা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করতে না পারে। মাঠপর্যায়ের এক কর্মী আক্ষেপ করে বলেন, “পার্টির দুঃসময়ে যারা পাশে ছিল, পার্টিকে ‘ঔন’ করেছিল, তাদের দলের প্রতি একটা কমিটমেন্ট আছে। তারা দুঃসময়ে বিএনপিকে ছেড়ে যায়নি। যারা নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং যাদের রাজনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে—এমন নেতৃত্ব বাছাই করতে দল কখনোই ভুল করবে না বলে আমার বিশ্বাস।”

এবারের কাউন্সিল বিএনপির জন্য এক আবেগঘন ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দীর্ঘ ৮ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পর গত ৯ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ভারমুক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। গত বছরের (২০২৫) ৩০ ডিসেম্বর দলের চেয়ারপারসন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসানের পর এটিই হতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের প্রথম জাতীয় কাউন্সিল।

অন্যদিকে, এই কাউন্সিল হতে যাচ্ছে দলের বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিদায়ী মঞ্চ। ২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালের ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর থেকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দলের চরম দুঃসময়ে তিনি শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন। বয়সের ভার ও দীর্ঘ ক্লান্তির কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক বলেন, “আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।”

ফলে, এবারের কাউন্সিলে বিএনপি যেমন উৎসবের আমেজে মাতবে, তেমনি একজন নতুন, ডাইনামিক মহাসচিবকে বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষাতেও থাকবে।

জাতীয় কাউন্সিলের আগে দলের ভিত্তিমূল শক্ত করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং ঢাকা মহানগর কমিটিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিএনপি। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি নতুন করে গঠন করা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, “সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় কাউন্সিলের আগেই ঢাকা মহানগরের কমিটি দেওয়া হবে। যে ওয়ার্ডগুলোতে কমিটি নেই বা আহ্বায়ক কমিটি আছে, সেগুলো দ্রুত পূর্ণাঙ্গ করা হবে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সংগঠনকে শক্তিশালী ও সুসংহত করা অপরিহার্য।”

এছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার কাজও দ্রুতগতিতে চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, “অঙ্গসংগঠনগুলোর খসড়া কমিটি চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে তৈরি করেছেন। যাচাই-বাছাই চলছে। যেকোনো সময় এগুলো ঘোষণা করা হতে পারে।”

সম্প্রতি রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে (কেআইবি) অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন। সভায় অংশ নেওয়া এক নেতা জানান, সরকারের গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো কীভাবে তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং একইসাথে সাংগঠনিক কর্মসূচি কীভাবে জোরদার করতে হবে, সে বিষয়ে চেয়ারম্যান সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

বিএনপি সর্বশেষ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলের কাউন্সিল করেছিল ১৯৯৩ সালে (চতুর্থ কাউন্সিল)। এরপর ২০০৯ সালে পঞ্চম এবং চরম বৈরী পরিবেশে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ কাউন্সিল। বিগত দিনের সীমাবদ্ধতা আর সাদামাটা আয়োজনের বৃত্ত ভেঙে এবারের সপ্তম কাউন্সিল হবে এক বিশাল উৎসবের মঞ্চ।

পূর্বের খবরপ্রধানমন্ত্রীর টঙ্গীতে আগমন উপলক্ষে গাজীপুর মহানগর বিএনপির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত