ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল

122

বৃহস্পতিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রবীণ সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সংসদে সভাপতি হিসেবে স্পিকারের চেয়ারে আসন গ্রহণ করেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হয়। প্রেসিডেন্টে চুপ্পুর ভাষণকে কেন্দ্র করে প্রথম দিনই বিরোধী দলের ওয়াক আউট, সংসদ অধিবেশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি।

 

 

সংসদ ভবন থেকে : আজ বৃহস্পতিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে তিনি ভাষণ দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না ও হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আবারও জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হচ্ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় সংসদকে তিনি সকল যুক্তি, তর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের রাজনীতির এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছেন, যার অশেষ রহমতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন যাত্রা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম পর্যন্ত গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রালগ্নে তিনি তাঁদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, এসব আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব মায়েরা সন্তান হারিয়েছেন, যেসব সন্তান তাঁদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে এবং যেসব আহত মানুষ স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন, তাঁদের অবদান তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

তিনি আরও বলেন, নির্যাতন, নিপীড়ন, রাজনৈতিক হয়রানি কিংবা মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন, দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, কামার-কুমার, জেলে-তাঁতি, গাড়িচালক, ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, গৃহিণীসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ যারা গুম, খুন, হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং মিথ্যা হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন কিংবা জীবন্ত মানুষ কবরস্থানের মতো বর্বর বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর মতো পরিস্থিতির মধ্যেও যাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে রুখে দেওয়া যায়নি, তাদের সাহসী ভূমিকায় দেশে পুনরায় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই যাত্রালগ্নে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক বীর ছাত্র-জনতাকে অভিনন্দন জানান।

ভাষণে তিনি বলেন, দেশনেত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করে জাতীয় সংসদকে হাস্যরসের খোরাকে পরিণত এবং দেশে তাবেদারি শাসন-শোষণ কায়েম করা হয়।

তিনি বলেন, দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বেগম খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন এবং জীবনে কখনো স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি। আজ থেকে দেশে আবারও সেই কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতা বেগম খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের এই সাফল্যের মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি। তাই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি দেশ ও জনগণের স্বার্থে আপসহীন নেতৃত্বের অধিকারী, স্মরণীয় ও অনুকরণীয় রাজনীতিবিদ মরহুমা খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন—‘জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে আমি সেই দলেই আছি’। অর্থাৎ ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থই সবচেয়ে বড়—এটাই বিএনপির রাজনীতি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি প্রথমবারের মতো বিএনপি থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য এবং সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

তিনি বলেন, তাঁর রাজনীতি দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার রাজনীতি। বিএনপির রাজনীতি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতি। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করাই তাঁদের রাজনীতির লক্ষ্য।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। আর ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল।

 

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করার মাধ্যমেই বিএনপি একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি গণতান্ত্রিক জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা এবং জাতীয় সংসদের সকল দলের নির্বাচিত সদস্যদের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।

তিনি বলেন, দল বা মত কিংবা কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাবেদারমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বাধীন, সার্বভৌম, নিরাপদ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু না করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার সংসদকে অকার্যকর করে ফেলেছিল।

তিনি বলেন, নতুন সংসদের যাত্রা শুরু করার সময় সংসদের সাবেক স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও পতিত ও পরাজিত সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জনরোষের ফলে তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক রয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী ও তাবেদারি শাসন-শোষণের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির বিধান অনুসরণ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও পাঁচবারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন।

তিনি বলেন, সংসদীয় রীতিনীতির ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতি নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ওই সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন এবং তার সভাপতিত্বে বাংলাদেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল।

facebook sharing button
copy sharing button
sharethis sharing button

 

জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতির বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশ গতকাল সকাল ১১টায় শুরুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে নতুন করে যাত্রা শুরু করল। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হয়। তবে জুলাই বিপ্লবের পর এবার দেশের ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হয় ব্যতিক্রম পদ্ধতিতে। দেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, এক সংসদের পর পরবর্তী সংসদ শুরু না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারের মেয়াদ থাকে। বিদায়ী সংসদের স্পিকারই নতুন সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন। নতুন সংসদে স্পিকার ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করার পরই তার দায়িত্ব শেষ হয়।

কিন্তু ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে প্রেসিডেন্ট দ্বাদশ সংসদ ভেঙে দেন। সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করেন অভ্যুত্থানের পরপরই। আর ডেপুটি স্পিকার যিনি ছিলেন তিনিও আছেন কারাগারে। এমন পরিস্থিতিতে অধিবেশনের শুরুতেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি নির্বাচন করা হয়। সংসদ কক্ষে স্পিকারের আসন ফাঁকা রেখে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অধিবেশন শুরু হয়।

পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের পর বক্তব্য শুরু করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তারেক রহমান সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন। এতে পূর্ণ সমর্থন জানান বিএনপি মহাসচিব, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশনে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। আর ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রী এবং কায়সার কামাল ভূমি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সংসদের সূত্র জানায়, তারা দুজন শপথ নেয়ার আগে দলীয় ও মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে শপথ পড়ান প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে এই শপথ পড়ানো হয়।

অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমরা এই সংসদ অর্থবহ করতে চাই। দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক মানুষ এই সংসদের দিকে প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। জনগণকে দুর্বল জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা হয়েছিল এবং সংসদকে মানুষের অধিকার লুণ্ঠনকারীদের ক্লাবে পরিণত করা হয়েছিল।

সংসদ নেতা বলেন, বিগত দেড় দশকে যারা নিজেদের এমপি পরিচয় দিতেন, তারা কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। কিন্তু আজকের সংসদ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদ। এটি বাংলাদেশের জনগণের সংসদ। তিনি বলেন, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়; বরং সুনির্দিষ্ট যুক্তি ও বিতর্কের মাধ্যমে সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলতে চাই আমরা। এক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে সংসদ পরিচালনায় আমরা স্পিকারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব ইনশাআল্লাহ। বক্তব্যের শেষ দিকে স্পিকারকে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান তিনি। সেই সাথে জাতীয় সংসদের সফলতা কামনা করেন।

এরপর সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, জাতীয় সংসদকে আমরা একটি জনকল্যাণ ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার স্থান হিসেবে পরিণত করতে চাই। এটি যেন কোনোভাবেই ব্যক্তিগত চরিত্র হননের কেন্দ্রে পরিণত না হয়।

তিনি বলেন, ’২৪ জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের এই সংসদ গঠিত হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের প্রধান স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’। আজ আমরাও বলতে চাই সরকারবিরোধী ভেদাভেদ নয়, স্পিকারের কাছে আমরা সবার জন্য জাস্টিজ বা সুবিচার প্রত্যাশা করি।

তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ সাধারণ কোনো সংসদ নয়; বরং এটি অনেক ত্যাগ ও রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত একটি সংসদ। বক্তব্যের শুরুতে তিনি দেশের বিভিন্ন আন্দোলন ও সময়ের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। ডা. শফিকুর রহমান ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং শাপলা চত্বরসহ বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, আহত বা পঙ্গু হয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট আমলে যারা নির্যাতনের শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন, কিংবা আয়নাঘরে বন্দি হয়েছেন তাদের সবার প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই। বিশেষভাবে চব্বিশের জুলাইয়ে যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে আজকের এই সংসদ গঠনের সুযোগ করে দিয়েছেন, তাদের স্মরণ করছি। শহীদদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যারা শহীদ হয়েছেন আল্লাহ যেন তাদের শহীদের মর্যাদা দান করেন এবং যারা আহত বা পঙ্গু হয়েছেন তাদের দ্রুত সুস্থতা দান করেন। এ সময় তিনি নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানান। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে সংসদ পরিচালনা করবেন।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর অতিক্রম করলেও দেশের সংসদীয় রাজনীতি সবসময় কার্যকর ছিল না। অনেক সময় ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে সংসদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে বর্তমান সংসদকে তিনি গতানুগতিক ধারার বাইরে একটি কার্যকর ও গতিশীল সংসদ হিসেবে দেখতে চান। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সংসদের মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব ধরনের অন্যায়-অসঙ্গতির অবসান ঘটবে।

অধিবেশনের প্রথম দিনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংক্ষিপ্ত বিরতির পর সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এ সময় বিভিন্ন মরহুম রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্টজন ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় নিহতদের স্মরণ করা হয়। শোকপ্রস্তাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস, ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সাবেক প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা দেশি-বিদেশি ব্যক্তিত্বদেরও স্মরণ করা হয়।

শোকপ্রস্তাবে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শূরা সদস্য মীর কাসেম আলী এবং নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এসব নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার বিষয়টি অনুমোদন করেন। একই সঙ্গে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামও এতে সংযোজন করা হয়। আলোচনার পর শোকপ্রস্তাবটি সংসদে গৃহীত হয়। এছাড়া জুলাই যোদ্ধা আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শাহারিয়ার খান আনাস, মেহেদি হাসান জুয়েল, ফারহান ফাইয়াজসহ ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের গুলিতে নিহত ফেলানীর নাম শোকপ্রস্তাবে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার প্রস্তাবের ভিত্তিতেও এসব নাম শোক প্রস্তাবে গৃহীত হয়। শোকপ্রস্তাবের ওপর বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়র ওপর এবং জুলাই যোদ্ধাদের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে তা সংসদে গৃহীত হয়। এর আগে তাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন।

এরপর সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। সবশেষে সংসদের রীতি অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের ভাষণের পালা আসে। তবে সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রেসিডেন্টের ভাষণ শুরু করার সময় ওয়াক আউট করে জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট। এ জোটের সংসদ সদস্যরা সংসদে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও বিক্ষোভ করেন। এ সময় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ হট্টগোলের মধ্যে প্রেসিডেন্ট সংসদে ভাষণ শুরু করলে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, জামায়াতের সংসদ সদস্য ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেন। এ সময় তারা ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধানসহ নানান স্লোগান দিতে থাকেন। প্রেসিডেন্টের ভাষণ শেষে বিরোধী দলের সদস্যরা আবার সংসদে যোগদান করেন। প্রেসিডেন্টের ভাষণ শেষে সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১৫ মার্চ (রোববার) বেলা ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে। এ মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। সংবিধান অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন প্রেসিডেন্ট। তার ভাষণ শেষে সংসদ অধিবেশনের মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার। সংসদ অধিবেশন আগামী ১৫ মার্চ বেলা ১১টায় পুনরায় শুরু হবে।

পূর্বের খবরআজ জাতীয় সংসদের অধিবেশন, সংসদ নেতাকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার চূড়ান্ত করবেন
পরবর্তি খবরবিসা’র ইফতার পার্টি ও নেটওয়ার্কিং প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত