অনলাইন ডেস্ক:
প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাসকারী হিসেবে মানুষ তাদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ার সফল বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় জলবায়ু, বৃষ্টিপাতের ধরণ এবং পানির গুণমান সম্পর্কে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, ইত্যাদি থেকে বাঁচার জন্য পরিবেশকে ভালোভাবে জানতে হয়। এই জ্ঞান প্রাকৃতিক বাস্তুশাস্ত্র সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ায়, যার ফলে বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হয়।
আজ আমরা কথা বলব বর্তমানে বাংলাদেশসহ এর প্রতিবেশী দেশে সংঘটিত তাপপ্রবাহ বা তাপ তরঙ্গ (Heat Wave) নিয়ে এবং এর সঙ্গে নগর অঞ্চলে ‘অতি উন্নত’ পরিকল্পনার ফলে সৃষ্ট উত্তাপ দ্বীপ (Heat Island) এই দুটি বিষয় নিয়ে।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, হিট ওয়েভ ও হিট আইল্যান্ড দুটিই কোনো জায়গা বা অঞ্চলের তাপ বৃদ্ধির কারণ, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। তাপ তরঙ্গ (Heat Wave) অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার বর্ধিত সময়কাল হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যা সাধারণত কয়েক দিন থেকে সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, এল নিনো সহ বিভিন্ন কারণকে তাপ তরঙ্গ সংঘটিত হওয়ার জন্য দায়ী করা হয়। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের (CO₂) উচ্চতর ঘনত্ব তাপপ্রবাহ তৈরিতে সহযোগিতা করে। যখন CO₂ বায়ুমণ্ডলে তৈরি হয়, তখন শীতকালে যেমন আমরা কম্বল দিয়ে শরীরকে গরম করি ভিতরে গরম আটকে ঠিক সেভাবে এটি কম্বলের মতো পৃথিবীর তাপকে আটকে ফেলে, যার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
এগুলো প্রায়ই উচ্চ আর্দ্রতার সঙ্গে থাকে, যা পরিবেশকে তাপ এবং আর্দ্রতার একটি বিপজ্জনক সংমিশ্রণের দিকে পরিচালিত করে। এর ফলে পরিবেশে বসবাসকারীরা অস্বস্তি, ক্লান্তি, এমনকি হিটস্ট্রোকেরও শিকার হতে পারে। তাপ তরঙ্গ বিশ্বের যে কোনো জায়গায় ঘটতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা আরও ঘন ঘন এবং গুরুতর হয়ে উঠছে। তাপ তরঙ্গের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেদের এবং আমাদের সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা এবং সচেতন থাকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, উত্তাপ দ্বীপ এমন একটি ঘটনা যা নগর এলাকায় বেশি ঘটে, যেখানে মানুষের কার্যকলাপ এবং অবকাঠামোর কারণে পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এটি ভবন, রাস্তা এবং অন্যান্য উপাদানের উপস্থিতিতে ঘটে যা তাপ শোষণ করে এবং ধরে রাখে, সেই সাথে গাছপালার অভাবের কারণেও ঘটে। তাপীয় দ্বীপ অন্যান্য কারণের মধ্যে মানুষের স্বাস্থ্য, শক্তি খরচ, এবং বায়ু মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি নগরের একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা এবং এর মোকাবেলার জন্য নগর পরিকল্পনা, সবুজ অবকাঠামো এবং পরিবেশ বান্ধব ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন কলাকৌশলের সমন্বয় প্রয়োজন৷ এই সমস্যা দীর্ঘ সময়ের জন্য চলতে পারে, বিশেষ করে গ্রীষ্মের মাসগুলোতে যখন তাপমাত্রা বেশি থাকে। নগরের ‘হিট আইল্যান্ড’ এলাকা এবং গ্রামীণ এলাকার মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে, যা নগর এলাকার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত সমস্যার কারণ।
তাপ তরঙ্গের যখন ঘটে, তখন গরম বাতাসে উচ্চ-চাপ তৈরী হওয়ার কারণে তা মাটির কাছাকাছি আটকে যায়, যার ফলে কয়েক দিন বা সপ্তাহের জন্য অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার সৃষ্টি হয়। জলবায়ু পরিবর্তন এই ঘটনাগুলোকে ব্যাপক করে তোলে, তাদের আরও ঘন ঘন সংঘটিত হতে দেয়। তাপ তরঙ্গ বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে যা হতে পারে শহর ও গ্রামীণ উভয় এলাকাকে ঘিরে। আবহাওয়ার এই বৈশিষ্ট উচ্চ তাপমাত্রার দ্বারা চিহ্নিত করা হয় যা বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে এবং এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রায়শই স্থির বায়ুর ভরের সাথে মিলে যায় যার ফলে বায়ুর গুণমান খারাপ হতে পারে।
তাপীয় দ্বীপে বসবাসকারীরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকেন। অন্যদিকে ঘরের অভ্যন্তর শীতল করতে বাড়তি শক্তি ব্যয় হয়। সেটিও পরিবেশ দূষণ ঘটায়।
আমরা যদি ঢাকা শহরের কথা চিন্তা করি, তাহলে ঢাকাকে অস্বাভাবিকভাবে সম্প্রসারণের ফলে এর আশেপাশের গ্রাম্য অঞ্চলগুলোও এখন নগরের অংশ হয়ে উঠেছে এবং তাপীয় দ্বীপের প্রভাবে তাপমাত্রা বেড়ে বসবাস অনুপযোগী হয়ে উঠছে। তাই, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের জন্য কার্যকর প্রশমন এবং অভিযোজন কৌশল বিকাশের জন্য এবং তাপীয় দ্বীপের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে এর প্রভাব বুঝে প্রকৃত পরিবেশবিদ দ্বারা পরিবেশ পরিকল্পনা করা অপরিহার্য।
একইভাবে তাপ তরঙ্গের ঝুঁকি নিয়ে বলতে গেলে, তাপ তরঙ্গ মানবস্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে; বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু, গর্ভবতী, এবং অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য। তাপ-সম্পর্কিত অসুস্থতা, তাপের চাপ, এমনকি প্রাণহানিও এই উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ঘটে যেতে পারে। উপরন্তু, এই ধরনের ঘটনাগুলো অবকাঠামোর উপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং কৃষি ও বাস্তুতন্ত্রের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে যা একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই মানুষ ও পরিবেশ উভয়ের উপর তাপ তরঙ্গের প্রভাব কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, তাপীয় দ্বীপ থেকে বাঁচার জন্য যা যা করা যাবে, তাপ তরঙ্গ বা তাপপ্রবাহের জন্য তার সবগুলো কাজে আসবেনা।
তাপপ্রবাহ থেকে নিজেকে, নিজ বাসভবনকে ও আশেপাশের পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য কিছু করণীয়:
প্রচুর পানি এবং তরল পান করুন, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন, কারণ এর ফলে আরও ডিহাইড্রেশন হতে পারে।
ঘরের ভেতরে তুলনামূলক ঠান্ডা স্থানে থাকুন। যদি আপনাকে বাইরে যেতেই হয় তবে ছায়ায় থাকুন এবং আপনার সাথে ছাতা ও খাবার পানি নিন।
আপনার পরিবারের সদস্যদের উপর লক্ষ্য রাখুন, বিশেষ করে শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ, গর্ভবতী, এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের, যারা তাপ তরঙ্গের সময় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
আপনার যদি পোষাপ্রাণী থাকে তবে নিশ্চিত করুন যে তারা প্রচুর পানি পান করছে কিনা এবং এদের ছায়া যুক্ত স্থানে রাখার চেষ্টা করুন।
যদি আপনার বাড়ি ঠাণ্ডা রাখা সম্ভব না হয় তাহলে দিনের ২-৩ ঘন্টা ঠান্ডা জায়গায় কাটান (যেমন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পাবলিক বিল্ডিং)।
দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন।
কঠোর শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন। আপনি যদি কঠোর কার্যকলাপ করতে চান তবে দিনের সবচেয়ে শীতল অংশে এটি করুন, যা সাধারণত ভোর থেকে সকাল ৯টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়।
ঠান্ডা পানিতে গোসল করুন।
আপনার বাসাবাড়ি ঠান্ডা রাখার জন্য যা যা করবেন:
তাপপ্রবাহের সময়, আপনার থাকার জায়গাকে ঠান্ডা রাখার প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। রাত ৮টা, ১০টা, ১টা ও ভোর ৬টার পরে তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাপ তরঙ্গের সময় ঘরের তাপমাত্রা দিনে ৩০-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ২৫-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা উচিত।
রাতে এবং ভোরে যখন বাইরের তাপমাত্রা কম থাকে, তখন আপনার বাড়ির সমস্ত জানালা খুলে দিন যেন বাহিরের ঠান্ডা বাতাস এসে ঘরের আবদ্ধ গরম বাতাসকে বের করে দিতে পারে এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের চাহিদা মেটাতে পারে।
দিনের বেলা জানালা বন্ধ রাখুন এবং জানলার পর্দা টেনে দিন, বিশেষ করে যেই জানলাগুলো সরাসরি সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। এতেকরে সূর্যের কিরণ সরাসরি ঘরে প্রবেশ করতে পারবেনা এবং ঘর ঠান্ডা থাকবে।
কৃত্রিম আলো এবং যতটা সম্ভব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিগুলো বন্ধ রাখা উচিত যেগুলো থেকে তাপ নির্গমন হয়। কারণ এইগুলো ঘরের অভন্তরীন তাপমাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে।
যাদের ঘর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত না তারা ঘরের বাতাস ঠান্ডা করতে ভেজা তোয়ালে ঝুলিয়ে রাখুন, যাতে ঘরের ভেতরের বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়।
যদি আপনার বাসস্থান শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে দরজা এবং জানালা বন্ধ করুন এবং কোনো ভাবেই ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা নামাবেন না। ২৮ ডিগ্রিতে এসি চালিয়ে সিলিং ফ্যানও চালাতে পারেন। এতে ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ সবদিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে।
নতুন ভবন বানানোর সময় যথাযত পেশাজীবীদের সহায়তা গ্রহণ করুন এবং পরিবেশবান্ধব ভবন বানাতে চেষ্টা করুন।
পরিশেষে এইটুকুই বলব, তাপীয় দ্বীপ বা তাপপ্রবাহ কোনোটিই মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীকূলের জন্য সুখকর নয়। আমরা আমাদের প্রতিদিনের কর্মকান্ডে এমন কিছু করবনা যেন আমাদের কাজগুলো তাপ দ্বীপ বা তাপ তরঙ্গের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সার্বিয়ান বিজ্ঞানী মিলুতিন মিলানকোভিচ এর থিওরি থেকে আমরা জানতে পারি, জলবায়ু পরিবর্তন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা এবং মানুষের তৈরী পরিবেশ দূষণও পৃথিবী উত্তপ্ত হতে সহযোগিতা করে। আমরা যদি আমাদের সকল কর্মকান্ড পরিবেশবান্ধব ভাবে করি তাহলে আমরা এই দূষণ ঠেকাতে পারব এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটি বাসযোগ্য, সুন্দর, সহনীয় পরিবেশ উপহার দিতে পারব যা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। আসুন সবাই শপথ করি, গাছ কাটবো না, বরং লাগাবো, যত পারি ততো; পুকুর, ডোবা, খাল, বিল, নদী ইত্যাদি ভরাট করব না, বরং তাদের বাঁচিয়ে রাখবো পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য।





