সারাদেশের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত, পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ

274

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বৃহস্পতিবার। এই বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল পেয়ে পরীক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস। এবার ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে মূল আনুষ্ঠানিকতা রাখা হয়নি। শিক্ষা বোর্ডগুলো আলাদাভাবে ফলাফল প্রকাশ করেছে। এরপরও ফল পেয়ে উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না শিক্ষার্থীদের। আনন্দ উদ্‌যাপনে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে দিনটি স্মরণীয় করে রেখেছে তারা।

 

No description available.

ভালো ফলে উচ্ছ্বসিত রাজধানীর এক স্কুলের শিক্ষার্থীরা

ঢাকাঃ চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় তা ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় তা ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। জিপিএ ৫-প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে এবার। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি ও গণিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ফলাফলে।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল গতকাল প্রকাশ করা হয়। অবশ্য ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে এবার কোনো আনুষ্ঠানিকতাই রাখা হয়নি। শিক্ষা বোর্ডগুলো তাদের ফল প্রকাশ করেছে আলাদাভাবে। এবার পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখের মতো। পাস করেছে ১৩ লাখ এবং অকৃতকার্য হয়েছে ছয় লাখ। জিপিএ ৫-এর সংখ্যাও কমেছে, ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। আগের বছর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন।

বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে গণিত ও ইরেজিতে। এর মধ্যে গণিতে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৭৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ, আর ইংরেজিতে ৮৭ দশমিক ২১ শতাংশ। এছাড়া বাংলায় ৯৭ দশমিক ২৭ শতাংশ, পদার্থবিজ্ঞানে ৯৪ দশমিক শূন্য ২, রসায়নে ৯৪ দশমিক ৭৬, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ৯৭ দশমিক ২৯, পৌরনীতিতে ৯৪ ও হিসাববিজ্ঞানে ৯১ দশমিক ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। আবার গণিত ও ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে বরিশাল বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে ৩৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ গণিতে ও ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে।

পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আলী। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তার মেয়ে সানজিদা ইসলাম (ছদ্মনাম) সব বিষয়ে ভালো করলেও গণিতে ফেল করেছে। পেশায় কৃষক মো. আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিজে খুব বেশি পড়ালেখা করিনি। তবে মেয়ের যাতে রেজাল্ট ভালো হয় সে কারণে তাকে স্কুলের বাইরেও গণিত ও ইংরেজিতে প্রাইভেট পড়িয়েছি। কিন্তু এসএসসির আগে টেস্ট পরীক্ষায় মেয়ে অনুত্তীর্ণ হয়। স্কুলে গিয়ে জানতে পারি সে গণিত ও ইংরেজিতে পাস করতে পারেনি। কারণ জানতে চাইলে মেয়ে জানায়, ক্লাসে ভালোভাবে পড়ানো হয় না, প্রাইভেটেও কোনো বিষয়ে একাধিকবার প্রশ্ন করলে ওই শিক্ষক রেগে যান এবং কটূক্তি করেন। গ্রামে গণিত ও ইংরেজির আর কোনো ভালো শিক্ষকও ছিল না। এরপর মেয়েকে গলাচিপা সদর উপজেলার দুই শিক্ষকের কাছে পড়িয়েছিলাম। তবে মেয়ে ইংরেজিতে পাস করলেও গণিতে পারেনি।’

গণিত ও ইংরেজির দুর্বলতায় এসএসসিতে বেড়েছে অকৃতকার্য

rr

বরিশালের গ্রামাঞ্চলে অভিজ্ঞ ও দক্ষ, বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষকের সংকট রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকীও। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক সময় বিএসসি শিক্ষক পাওয়াই যায় না। ফলাফলে এ সংকটের প্রভাব পড়েছে।’

বিগত বছরগুলোয় পরীক্ষার হলের স্বচ্ছতা ও খাতা মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন ছিল জানিয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদেরকে এ বছর নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল যেন পরীক্ষায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকৃত ফলাফল তুলে আনা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী বরিশাল বোর্ডের সব কেন্দ্রে এবার শতভাগ সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া খাতা দেখার ক্ষেত্রে লেখা অনুযায়ী যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। এ কারণে বিগত বছরের ফলের সঙ্গে এ বছরের ফলের বড় ধরনের পার্থক্য হয়েছে।’

বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকদের প্রায় ৮৫ শতাংশেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। ২০২৩ সালে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী প্রকাশিত এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মোট ইংরেজি শিক্ষকের সংখ্যা ৬০ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের মধ্যে ইংরেজিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ৪ হাজার ১৫৮, যা মোট শিক্ষকের ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষক ৫ হাজার ২১৮, যা মোট শিক্ষকের ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সে অনুযায়ী ইংরেজির শিক্ষকদের ৯ হাজার ৩৭৬ জন বা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বিষয়ভিত্তিক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনধারী। আর ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর নেই ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশের।

বর্তমানে যারা ইংরেজি পড়াচ্ছেন তাদের মধ্যে বড় অংশই অন্য বিষয়ে ডিগ্রিধারী। আর ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ বা ৩ হাজার ১৪৭ জন শিক্ষক স্নাতকই করেননি, এইচএসসি পাস।

গণিতেও প্রায় একই চিত্র উঠে আসে ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বরগুনার একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক বলেন, ‘ফেলের যে উচ্চহার দেখা যাচ্ছে সেটি মূলত গ্রামাঞ্চলের। জেলা সদর ও উপজেলা সদরের স্বনামধন্য স্কুলগুলোর পাসের হার বেশির ভাগেরই কিন্তু ৯০ শতাংশের ওপরে। আর গ্রামাঞ্চলে খারাপ ফলের প্রধান কারণ শিক্ষক সংকট। সাধারণত এসব স্কুলে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা খুবই কম হয়। গ্রামের অভিভাবকদের অধিকাংশই আবার দরিদ্র হওয়ায় কোচিং বা গৃহশিক্ষকও দিতে পারেন না। ফলে এসব স্কুলে ভালো শিক্ষক যেতে চান না।’

অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের জেরে গত দেড় দশকে প্রায় শতভাগ নিয়োগই হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব কারণে গ্রামের স্কুলগুলোয় শুধু ইংরেজি ও গণিতেই নয়, সব বিষয়েরই দক্ষ শিক্ষকের মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। বিগত বছরগুলোয় হলে বাড়তি সুযোগ এবং খাতায় অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাস করানোয় বিষয়টি তেমন চোখে পড়েনি। কিন্তু এ বছর প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে।’

এদিকে বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও পাসের হার এবং জিপিএ ৫-এ মেয়েরা এগিয়ে। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মোট ছাত্রী ছিলেন ৯ লাখ ৫২ হাজার ৩৮৯ জন ও ছাত্র ৯ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৭ জন। ছাত্রীদের ৭১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ও ছাত্রদের ৬৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ পাস করেছে। এছাড়া ৭৩ হাজার ৬১৬ ছাত্রী ও ৬৫ হাজার ৪১৬ ছাত্র জিপিএ ৫ পেয়েছে।

এ বছর ১১টি শিক্ষা বের্ডের মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী। এ বোর্ডে ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। আর সর্বনিম্ন পাসের হার বরিশাল বোর্ডে। এ বোর্ডে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এছাড়া ঢাকা বোর্ডে ৬৭ দশমিক ৫১ শতাংশ, কুমিল্লা বোর্ডে ৬৩ দশমিক ৬০, যশোর বোর্ডে ৭৩ দশমিক ৬৯, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭২ দশমিক শূন্য ৭, সিলেট বোর্ডে ৬৮ দশমিক ৫৭, দিনাজপুর বোর্ডে ৬৭ দশমিক শূন্য ৩, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৫৮ দশমিক ২২, মাদ্রাসা বোর্ডে ৬৮ দশমিক শূন্য ৯ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।

ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৯ সালের পর এবারই পাসের হার সর্বনিম্ন। এর কারণ হিসেবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরীক্ষার হলে এবং খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় এ বছর এসএসসি পরীক্ষার ফলে প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এহসানুল কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত বছরগুলোয় কীভাবে ফল তৈরি করা হতো তা নিয়ে আমরা মন্তব্য করব না। তবে এবারের ফলে কোনো ধরনের চাপ ছিল না। আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল—প্রকৃত নম্বরই প্রকাশ করতে হবে। আমরা সেটাই করেছি। উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়নের পর যেটি এসেছে, সেটিই দেয়া হয়েছে। কোনো অতিরিক্ত নম্বর বা গ্রেস মার্ক দেয়া হয়নি।’

চলতি বছর সারা দেশে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৮৪। গত বছর শতভাগ পাস করেছিল ২ হাজার ৯৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা। সে হিসাবে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ১ হাজার ৯৮৪টি। একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি, এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে ১৩৪টি। আগের বছর এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫১টি। সে হিসাবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ৮৩টি বেড়েছে এবার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পাসের হার বাড়ানোর চাপ ছিল শিক্ষকদের ওপর। ফলে হঠাৎ করেই পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় সে হার অনেক বেড়ে গিয়েছিল কিন্তু শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে কোনো উন্নয়ন দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে অবনমন ঘটেছে। এ বছর এমন কোনো চাপ ছিল না বলেই প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। এছাড়া গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক সবার মধ্যেই এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেনি। এ কারণেও ফলে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা প্রসঙ্গে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘আমাদের দেশে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর একটি বড় কারণ দক্ষ শিক্ষকের সংকট। তাই সরকারের উচিত হবে ফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া। বিশেষত যারা তুলনামূলক বেশি পিছিয়ে আছে তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দেয়া।’

পূর্বের খবর”তারেক রহমানের নেতৃত্বেই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে”ঃ ডা. এ.জেড.এম জাহিদ হোসেন
পরবর্তি খবরনির্বাচন সামনে রেখে এখন যে ৫ সংকট বিএনপির