জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪ঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ১৮ জুলাই আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেন 

394

নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ এক বছর আগে রাজধানীর রামপুরা সড়কে গত বছরের ১৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর নজিরবিহীন হামলা চালায় পুলিশ |

তেইশ বছর বয়সী মো. ইরফান ভূঁইয়া ছিলেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সংসারের টানাপড়েনের মধ্যেও ইরফান ভূঁইয়া বাবাকে বলতেন, পড়ালেখা শেষ করে নিজের হাতে পরিবারের জন্য একটা বাড়ি বানাবেন।

তেইশ বছর বয়সী মো. ইরফান ভূঁইয়া ছিলেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সংসারের টানাপড়েনের মধ্যেও ইরফান ভূঁইয়া বাবাকে বলতেন, পড়ালেখা শেষ করে নিজের হাতে পরিবারের জন্য একটা বাড়ি বানাবেন। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি তিনি। গত বছরের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইরফান।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তালিকায় মোট ৮৫৪ জন জুলাই শহীদের তথ্য রয়েছে। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৮৪৪ জন সরকারি গেজেটভুক্ত হয়েছেন। এ তালিকা অনুযায়ী ১৮ জুলাই ঢাকাসহ সারা দেশে ৩৭ জন নিহত হন। যাদের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাতজন। আন্দোলনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৬ জুলাই আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ১৭ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জোরালো আন্দোলন এবং এ আন্দোলনে পুলিশের নির্বিচারে গুলির জেরেই সাধারণ মানুষ গণ-অভ্যুত্থানে শামিল হয়েছিলেন।

১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ওইদিন রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করে এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়। ১৭ জুলাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগে বাধ্য করা হয়। যে কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। এরপর আন্দোলনকে কার্যত এগিয়ে নেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ১৮ ও ১৯ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নজিরবিহীন হামলা ও নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ, যা জুলাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

১৬ জুলাই আবু সাঈদসহ ছয়জনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সারা দেশে ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী ওইদিন ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ নিকটবর্তী বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বসুন্ধরা গেটে, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড-ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ নিকটবর্তী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা মেরুল বাড্ডায়, নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ নিকটবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজমপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জড়ো হন। এছাড়া মিরপুর-১০, যাত্রাবাড়ী এলাকার নিকটবর্তী শিক্ষার্থীরা মিরপুর-১০ গোলচত্বর এবং যাত্রাবাড়ীর কর্মসূচিতে অংশ নেন।

এদিন শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয়। এদিন প্রথম পুলিশের হামলার ঘটনা ঘটে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানান, ওইদিন প্রথমে শিক্ষার্থীদের ওপর বিপুল পরিমাণ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে শিক্ষার্থীদের গুলি করা হয়। এতে আহত হন শতাধিক শিক্ষার্থী।

ওইদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এএসএম ফাহিম আবরার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সেদিন প্রথমে আমাদের ওপর খুবই কাছ থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমরা তাৎক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আশ্রয় নিই। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পুলিশ ভেবেছিল আমরা আন্দোলন থামিয়ে দেব। কিন্তু এরপর আমরা পুনরায় সংগঠিত হয়ে আবারো বের হই। আর তখনই পুলিশ নির্বিচারে রাবার বুলেট, ছররা গুলি চালায়। অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের যতটা সম্ভব বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওই সময় আমাদের চিকিৎসকরা খুবই সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ হামলার পর ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থীরা আমাদের পাশে দাঁড়ায়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মিছিল নিয়ে ব্র্যাকের দিকে আসতে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত অবস্থানের পর পুলিশ কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়ে আমাদের দিকে গুলি চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশের গুলি শেষ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা তখন খুবই ক্ষুব্ধ ছিল। ক্ষোভ থেকে তারা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরে বিকালের দিকে র‌্যাবের হেলিকপ্টার দিয়ে পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করা হয়।’

এ শিক্ষার্থী আরো বলেন, ‘আন্দোলন কোটা সংস্কারের জন্য হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে বড় পরিসরে জড়িয়ে পড়ার মুখ্য কারণ ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচার হামলা ও আবু সাঈদ হত্যার বিচার নিশ্চিত করা। এরপর ১৮ জুলাই যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপরও হামলা হয়, তখন আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—যাদের নির্দেশে হামলা হয়েছে তাদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। শেষ পর্যন্ত তা-ই করেছি।’

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তালিকা অনুযায়ী এদিন যে সাতজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছিলেন তারা হলেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আল হামীম সায়মন, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষার্থী জাহিদুজ্জামান তানভীন, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. ইরফান ভূঁইয়া, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. আসিফ হাসান, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী রাব্বী মিয়া এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক মো. শাকিল হোসেন।

মৃত্যুর প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলেও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদদের পরিবারের সদস্যরা। ১৮ জুলাই রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএর শিক্ষার্থী আল হামীম সায়মন। তার বাবা কামরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার একটাই ছেলে ছিল। তাকেও পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলল। সন্তান হত্যার বিচার ছাড়া আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই।’

একইভাবে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নিহত শিক্ষার্থী ইয়ামিন ভুঁইয়ার বাবাও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘এ সরকারের কাছে সর্বপ্রথম চাওয়া জুলাই শহীদের বিচার নিশ্চিত করা।’

পূর্বের খবরসারাদেশে তীব্র গাড়ি সংকটে বাংলাদেশ পুলিশ
পরবর্তি খবরজাতিসংঘের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে ১ কোটির বেশি শরণার্থী