মহানায়কের রাজকীয় রাজনৈতিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

253

রাজনীতির এক মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আজ। তারেক রহমান ১৭ বছর পর যিনি  মাতৃভূমিতে ফিরছেন আজ, ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে স্বাগত জানাতে ঢাকামুখী জনস্রোত ষ এক দিন আগে থেকেই অভ্যর্থনাস্থলে লাখ লাখ মানুষের অপেক্ষার তর যেন সইছে না। তাঁর  আগমনী বার্তা পেয়ে গোটা জাতি তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। নেতা আসবেন; আগামীতে জাতির উন্নয়ন, অগ্রগতি ও দেশ পরিচালনার বার্তা দেবেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়ার মানুষ রাজধানীতে এসেছেন নেতার মুখের বাণী শোনার জন্য। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঢাকামুখী মানুষের স্রোত থামেনি। সবার উদ্দেশ্য: আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতির মহানায়ক, তারুণ্যের স্বপ্ন পুরুষ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে একনজর দেখা।

 

 

ঢাকাঃ অবর্ণনীয় নির্যাতন, কারাবাস আর নির্বাসনের দীর্ঘ ১৮ বছর পেরিয়ে আজ নিজ জন্মভূমিতে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাংলার এই মহান নেতা ফিরে আসছেন স্বদেশের সুমৃত্তিকায়। ১৭ বছর আগে নির্যাতিত হয়ে নির্বাসনে গিয়েছিলেন তিনি। মনে মনে বলেছিলেন, ‘আবার আসিবো ফিরে এই বাংলায়’। ঠিকই তিনি ফিরে আসছেন মা, মাটি ও মানুষের কাছে। বীরের অভিষেকে, মুকুটহীন সম্রাটের বেশে। তার রাজকীয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

হয়তো তিনি কোনোদিনই ফিরে আসতেন না। অসংখ্য হামলা-মামলার ভারে, নিরবচ্ছিন্ন নিপীড়নের দীর্ঘ ছায়ায়, ফ্যাসিবাদী সময়ের প্রতিদিনের আঘাতে একজন মানুষ ক্লান্ত হয়ে হারিয়ে যেতেও পারতেন ইতিহাসের অন্ধকারে। কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো নিজের নিয়মেই কথা বলে। জনতার কণ্ঠস্বর কখনো কখনো জাতীয় ইতিহাসের ধারাভাষ্যকার হয়ে রচনা করে নতুন ইশতেহার।  জুলাই-পরবর্তী রক্তাক্ত পট পরিবর্তনের আবহে ঐতিহাসিক নিয়তি ও জন-প্রত্যাশা তাকে ফিরিয়ে এনেছে। তার এই প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তিগত নয়। বাংলাদেশের নেতৃত্বশূন্যতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দৃশ্যপটে এক জাতীয় প্রয়োজন।

ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ও সমকালীন বাস্তবতায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কোনো সাধারণ আগমন নয়-এ এক প্রতীকী যাত্রা। তিনি ফিরছেন বীরের বেশে, সঙ্গে করে আনছেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের সেই মূলমন্ত্র, যা একদিন এ দেশের রাজনৈতিক প্রাণশক্তি ছিল। তিনি ফিরছেন আগামীর বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে-যে বাংলাদেশ হবে মত-ভিন্নমতের বহুত্বে সমৃদ্ধ, ন্যায়ের ভিত্তিতে দাঁড়ানো, মত প্রকাশে বিঘ্নহীন এবং মানুষের অধিকার আদায়ে শাণিত।

 

 

 

দীর্ঘ প্রবাস জীবন তাকে ঋদ্ধ ও বাস্তববাদী করেছে। নির্বাসনের দিনগুলো তাকে করেছে ঋজু ও সুদৃঢ়। তাকে দিয়েছে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। দিয়েছে তুলনামূলক রাজনীতির বোধ। শিখিয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজকে দূর থেকে দেখার নির্মোহ অভিজ্ঞতা। কালের পরিক্রমায় তিনি তারুণ্যের আবেগ পেরিয়ে হয়েছেন প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞতায়, সংযমে ও রাজনৈতিক উপলব্ধিতে অনেক বেশি পরিশীলিত। এই ঋদ্ধতা তাকে কেবল একজন দলীয় নেতা নয়, একধরনের রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছে। যার কাছে দল, দেশ ও জাতির প্রত্যাশা অনেক।

 

দূরে থেকেও তিনি দলের হাল ধরেছেন দৃঢ় হাতে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এনেছেন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বদলে দলীয় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা-কাঠামোকে শক্তিশালী করার প্রয়াস দেখিয়েছেন। প্রতিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে রেখেছেন জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য ও সুসংহত মতামত। তিনি কথা বলেছেন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ইতিবাচক সংস্কারের পক্ষে-প্রতিহিংসার নয়, পুনর্গঠনের ভাষায়। তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে সব সময়ই ছিল গণতান্ত্রিক উত্তরণ-সহিংসতার নয়, সমঝোতার আহ্বান। একদলীয় আধিপত্যের নয়, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির স্বপ্ন বপন করেছেন তিনি প্রতিটি মানুষের অন্তরে।

 

কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পুরনো সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই-তার যাত্রাপথ কখনোই মসৃণ ছিল না। অতীতের মতো বর্তমানও, এমনকি ভবিষ্যতের দিনগুলোও তার সামনে সহজ হবে না। তাকে ঘিরে আছে একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙন, রাজনৈতিক বিভাজন, আস্থাহীন সমাজ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং ঘরে-বাইরের শত্রুর কুটিল ছায়া। তাকে দাঁড়াতে হবে বাংলাদেশের পক্ষে। মানুষের স্বার্থে। বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করার শপথে। বাংলাদেশকে ব্যর্থ ও দুর্বল রাষ্ট্র বানানোর বিপক্ষে। বাক-ব্যক্তি-সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মৌলিক মানবাধিকার ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক মতাদর্শের স্বপক্ষে।

 

বিভাজিত সমাজ ও রাজনীতিতে তারেক রহমানকে চলতে হবে মধ্যপন্থার উদার পথে। যে পথ মিশেছে বহুদলীয় গণতন্ত্রের মহাসড়কে। যে পথের বাঁকে বাঁকে রয়েছে শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার স্বর্ণালী অর্জন। সে অর্জনের প্রভা ও দীপ্তিকে হীরক-জ্যোতির উদ্ভাসে উজ্জ্বলতর করতে হবে তারেক জিয়াকে। ফলে তার এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন দলীয় নেতার ফেরা নয়। এক সম্ভাবনার ফিরে আসা। জাতীয় ইতিহাসের অসমাপ্ত অধ্যায়ের কালো পর্দা ছিন্ন করে নতুন রাজনৈতিক উপাখ্যানের সূচনালগ্ন হলো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন।

 

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বিরাজমান বাস্তবতায়  বিভাজিত সমাজ ও মেরুকৃত রাজনীতিতে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো “মধ্যপন্থার উদার রাজনীতি”কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তারেক রহমানের সামনে এই চ্যালেঞ্জটি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত-দু’ভাবেই অনিবার্য। কারণ, বিভাজিত সমাজ (divided society) বলতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান যা বোঝায়, তা কেবল রাজনৈতিক দলাদলি নয়; বরং পরিচয়, স্মৃতি, ক্ষোভ ও আস্থাহীনতার স্তরায়িত সংকট। বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে শাসক বনাম বিরোধী, দেশপ্রেমিক বনাম রাষ্ট্রদ্রোহী, উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র-এই দ্বান্দ্বিক ভাষ্যে বন্দি। এ ধরনের সমাজে চরমপন্থা স্বল্পমেয়াদে জনমত উস্কে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি দিতে পারে না। বরং সামগ্রিক স্থিতি ভেঙে দেয়, যা বর্তমানে চারদিকে সুস্পষ্ট। তাই তারেক রহমানের জন্য কার্যকর পথ হলো উদার মধ্যপন্থা (liberal centrism)-যা সংঘাত প্রশমিত করে, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিকে সামনে আনে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে ন্যূনতম শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থানের ভিত্তি গড়ে তোলে।

 

বাংলাদেশের জন্য অতি জরুরি রাজনৈতিক মধ্যপন্থার পথটি কোনো কাল্পনিক প্রকল্প বা  শূন্যস্থান থেকে আসেনি। এটি বহুদলীয় গণতন্ত্রের মহাসড়ক-যার ঐতিহাসিক ভিত্তি শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনে এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে নিহিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এগুলো ছিল institution-building moments -যেখানে ব্যক্তিনির্ভর ক্ষমতা নয়, বরং দল, নির্বাচন ও সংসদের ভূমিকা পুনঃস্থাপিত হয়েছিল। তারেক রহমানের রাজনৈতিক দায়িত্ব হলো এই অর্জনকে কেবল হারিয়ে স্মৃতির স্তরে নয়, সমকালীন বাস্তবতায় ও ভবিষ্যতের রূপকল্পে যথার্থভাবে প্রতিস্থাপন করা।

 

কারণ, নেতৃত্বের উত্তরাধিকার তত্ত্ব (theory of political succession) অনুযায়ী, উত্তরসূরি তখনই গ্রহণযোগ্য হন যখন তিনি অতীতের ঐতিহ্যকে শুধুমাত্র অন্ধ ও আবেগী অনুকরণ না করে তা রূপান্তরিত (transform) করতে পারেন সমকালীন চাহিদা অনুসারে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রে “হীরক-জ্যোতির উদ্ভাস” মানে কেবল অতীত গৌরবের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং তা নতুন রাজনৈতিক ভাষা, প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধতা, দলীয় গণতন্ত্র এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতার প্রতিফলন, যা উত্তরাধিকার স্মৃতিচারণের পথ বেয়ে রাষ্ট্রনায়কত্বে রূপ নেয়ার প্রয়াসী।

 

এমনই এক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে তত্ত্ব ও বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনার পুনরাগমন’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তার রাজনৈতিক সম্ভাবনা সমাজের অসমাপ্ত চাহিদার সফল সম্পাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিণত হয়েছে এক জাতীয় ঘটনায়। বাংলাদেশে বহুত্ববাদী, উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ন্যায্য নির্বাচন, আইনের শাসন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিতা, ব্যক্তি ও গণমাধ্যমের মৌলিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা তার নেতৃত্বে সাফল্যের সোনালী সৈকতে উপনীত হওয়ার জন্য অধীর অপেক্ষায়। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী একচেটিয়া শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফলে জাতীয় ইতিহাসে যে “অসমাপ্ত অন্ধকার অধ্যায়” তৈরি হয়েছে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন সেই অধ্যায়কে গণতন্ত্রের মোহনায় পুনরায় খুলে দেয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

 

বিশ্বের দেশে দেশে নির্বাসিত নেতাদের বিজয়ীর বেশে রাজকীয় ভাবে ফিরে আসার স্মৃতি ও ইতিহাস মেখে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন একটি নতুন ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উপাখ্যানের সূচনালগ্ন-যার সাফল্য নির্ভর করছে গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ধারায় মধ্যপন্থার উদার পথে অবিচল ও সুদৃঢ় পরিক্রমায়।  কারণ, তিনি বিভাজনের রাজনীতিকে সমপ্রীতি ও সংলাপের রাজনীতিতে নিয়ে আসার কাণ্ডারি। প্রতিশোধের প্রচলিত ভাষা বদলে দিয়ে একতাবদ্ধ ও পুনর্মিলনের নৈতিকতার প্রয়াসী। তার নেতৃত্ব কেবল একটি দলের নয়, বরং বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রনৈতিক জাতীয় দায়িত্বের অংশ। তার রাজকীয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে নতুন রাজনীতির গণ-ইতিহাস রচনার মাহেন্দ্রক্ষণ।
লেখক: শরিফুল ইসলাম খান, সম্পাদক- ডেইলি বাংলাদেশ ভিউজ ও নিউজ২১বিডি.কম

সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন মিডিয়া এসােসিয়েশন ও উত্তরা মিডিয়া ক্লাব।

পূর্বের খবরপ্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) খোদা বকশ চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন
পরবর্তি খবরদেশের মাটিতে পা রাখলেন তারেক রহমান