বাংলাদেশে প্রতি বছরই রমজানের শেষ দিকে কিছু বিতর্ক জোরালো হতে শুরু করে। তার অন্যতম চাঁদ দেখা ও ঈদের দিন নির্ধারণ। এবারও তেমন বিতর্কে নেমেছেন সামাজিক মাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী। নিজেদের অবস্থানের পক্ষে নানা ধরনের যুক্তি দিতে দেখা যাচ্ছে তাদের। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পালনে চাঁদ দেখার ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন উঠে আসছে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তার কয়েকটির উত্তর খোঁজা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।

ঢাকাঃ ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণের মনে সাধারণত প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশে কেন সৌদির ১ দিন পরে ঈদ হয়? সৌদি পশ্চিমে, মাঝে বাংলাদেশ, পূর্বে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া।
প্রশ্নটা যদি হয় সৌদির সাথে আমাদের চাঁদ সময়ের পার্থক্য ২১ ঘন্টা, সৌদির সাথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার চাঁদ সময়ের পার্থক্য প্রায় ২২ ঘন্টা। তবুও তারাই আগে চাঁদ দেখে, বাংলাদেশ পরে কেন?
এর সঠিক উত্তর হল চন্দ্রবর্ষ: চাঁদের পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় লাগে গড়ে প্রায় ২৯.৫৩ দিন। ফলশ্রুতিতে চন্দ্রমাস হয় ২৯ বা ৩০।
মজার ব্যাপার হল, চন্দ্রমাস নির্দিষ্ট নয়। ফলে মুসলিমদেরকে রমজান ও ঈদ পালন করতে চাঁদ দেখতে হয়। এই অনির্দিষ্টতার কারণে চন্দ্রবছরও আলাদা হয়। কোন বছর ৩৫৪, আবার কোন বছরে ৩৫৫ দিন হয়। অর্থাৎ এটি গ্রেগরীয় বা সৌরবর্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনন্য এবং এখানেও সূর্যের কোন কাজ নেই । যদিও চন্দ্রবর্ষে সূর্য ডোবার পর নতুন দিন গণনা শুরু হয়। অর্থাৎ রাত আগে আসে, তারপর দিন।
আসা করছি বিষয় দুটো পরিষ্কার। তবে এবার মূল বিষয়ে আলোচনা করা যাক।
সময়ের বিশাল তারতম্য:
শুরুতে যেই প্রশ্নটা ছিল সেটাই আবার আলোচনা করি। হিসেব অনুযায়ী সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ ৩ ঘণ্টা এগিয়ে। এতে বরং বাংলাদেশ ৩ ঘণ্টা আগে চাঁদ দেখবে। কিন্তু তা তো হয়ই না, উল্টো সৌদি আরবে একদিন আগে রমজান, ঈদ শুরু হয়ে যায় সাধারণত।
এর উত্তরের সঙ্কেত উপরে খানিকটা দিয়েছিও। সমস্যা হল, আমরা সৌর ও চন্দ্রের হিসেবকে মিলিয়ে ফেলি। সৌর হিসেবে সৌদি আরবের সাথে আমাদের পার্থক্য মাত্র ৩ ঘণ্টা হলেও চন্দ্রের হিসেবে সৌদি আরব ও আমাদের পার্থক্য ২১ ঘণ্টার! কি, অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ারই কথা। এটা কীভাবে হল, বুঝতে পারছেন না নিশ্চয়ই?
চলুন জেনে নিই বিষয়টা। পৃথিবীর গতির কথা তো জানিই। পৃথিবী নিজের অক্ষের চারিদিকে পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরে চলেছে প্রতিনিয়ত। যার আহ্নিক গতি বলি। গতিটা সহজে বোঝা যাবে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিক বা অ্যান্টি ক্লকওয়াইজ (Anti Clockwise) বললে। চাঁদ তো ধীরে ধীরে আবর্তন করছে। ফলশ্রুতিতে প্রতিদিন পশ্চিম দেশ সবার আগে চাঁদের উন্মোচন দেখতে পায়। আমরা তো জানিই, সূর্যোদয় হয় পূর্ব থেকে? তবে চাঁদের ক্ষেত্রে উল্টো। যদিও চাঁদ পূর্বে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায়, তবুও পশ্চিমারা চাঁদের আলো সবার আগে পায়।
কেন এক দেশে চাঁদ দেখা গেলেও অন্য দেশে দেখা যেতে দেরি হতে পারে। কেননা খালি চোখে চাঁদকে দেখতে হলে চন্দ্র আর সূর্যের মাঝে ১০.৫ ডিগ্রি কোণ থাকতেই হবে এবং যে পরিমাণ দূরত্ব অর্জন করলে এই কোণ তৈরি হবে, সে পরিমাণ যেতে যেতে চাঁদের ১৭ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। এ কারণেই আজ আমেরিকাতে চাঁদ দেখে গেলেই যে বাংলাদেশেও দেখা যাবে, সেটা ভুল ধারণা। যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই কোণ অর্থাৎ ১০.৫ ডিগ্রি অর্জন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাবে না। একই বিষয় সৌদি আরব ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। এই সংকট কোণকে ইলঙ্গেশন (Elongation) বলে। তাই চাঁদের বয়স কত সেটা আদৌ আসল কথা নয়, সেই কোণ হয়েছে কিনা সেটার উপর নির্ভর করে চাঁদ দেখা যাবে কিনা।
ফলে আমরা সৌদি আরব থেকে ৩ ঘণ্টা সূর্যের হিসেবে এগিয়ে থাকলেও, চাঁদের হিসেবে ২১ (২৪-৩=২১) ঘণ্টা পিছিয়ে আছি। ২১ ঘণ্টা প্রায় ১ দিন। অর্থাৎ আমরা প্রায় একদিন পিছিয়ে আছি। সেজন্যই সৌর বছরের হিসেবে একদিন পরে চাঁদ দেখি। তবে চন্দ্র বছরের কথা বললে আমরা সবাই একই দিনেই সব করি। তাই কারো এমনটা ভাবার কিছু নেই যে সবাই ভিন্ন দিনে রমজান বা ঈদ পালন করে। সবাই একই দিনেই পালন করে। কিন্তু সেটা যদি ইংরেজি বর্ষপঞ্জি দিয়ে যাচাই করেন, সেটা নিতান্তই বোকামি হবে। শেষ কথা হল, চন্দ্রবর্ষ অনুযায়ী পুরো পৃথিবীর সকলেই একই দিনে রমজান, ঈদ পালন করে। শুধু টাইমজোন (Timezone) আলাদা বলে এমনটা মনে হয়।
খালি চোখেই চাঁদ দেখতে হবে?
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর সাধারণত প্রতি মাসেই তাদের ওয়েবসাইটে পৃথিবীর সাপেক্ষে চাঁদের স্থানাঙ্ক জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে।
গত বছরের এপ্রিলে হিজরি শাওয়াল মাসের চাঁদের দিনক্ষণ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরদিন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তরফে আরেকটি বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়।
সেই বিজ্ঞপ্তিতে চাঁদ দেখা নিয়ে ‘অগ্রিম, বিভান্তিকর ও এখতিয়ার বহির্ভূত’ সংবাদ প্রকাশে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অনুরোধ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, এই এখতিয়ার শুধু জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের জন্য তারা কেবল মাত্র খালি চোখে চাঁদ দেখার ওপরই নির্ভর করে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশে ঈদের দিন নির্ধারণের জন্য ভূখণ্ড থেকে চাঁদ দেখা কমিটির নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে স্বচক্ষে চাঁদ দেখতে হবে।
কিন্তু যেখানে বৈজ্ঞানিক হিসাব নিকাশের মাধ্যমে দিনটি সম্পর্কে আগেভাগেই নিশ্চিত জোতির্বিজ্ঞানীরা, সেখানে শেষ দিন পর্যন্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা কেন- এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

নতুন চাঁদ
বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মোহাম্মদ রুহুল আমীনের মতে, হাদীস অনুযায়ীই খালি চোখে চাঁদ দেখাকে প্রাধান্য দেয়া হয় ধর্মীয় উৎসব নির্ধারণের ক্ষেত্রে।
“নিজের চোখে দেখে রোজা রাখা শুরু করা এবং ঈদ উদযাপন করার উপদেশ দেয়ার স্পষ্ট হাদীস রয়েছে। আরও বলা হয়েছে কোনো কারণে চাঁদ দেখা না গেলে – যেমন, চাঁদ উঠলো কিন্তু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় দেখা গেলো না– সেক্ষেত্রে ত্রিশ দিন মিলিয়ে ঈদ পালন করতে।”
তবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইয়েদ আব্দুল্লাহ-আল-মারুফ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “খালি চোখে দেখার নির্দেশনা যখন দেয়া হয়েছিল সেই সময় মুসলমানরা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিলেন। সেখানকার কেউ শাওয়াল চাঁদ দেখলে সেই তথ্য ঘোড়ায় চেপে যতদূর প্রচার করা যেত সেই এলাকা পর্যন্ত ঈদ উদযাপিত হতো।”
এখন ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বব্যাপীই ছড়িয়ে আছেন। প্রযুক্তির বদৌলতে যেকোনো জায়গায় বার্তা পৌঁছে দেয়াও সহজতর হয়েছে। এসব কারণ উল্লেখ করে অধ্যাপক মারুফ বলছেন, সর্বত্র একদিনে চাইলে ঈদ করা যেতে পারে।

কোন পদ্ধতি সঠিক
কোন পদ্ধতি সঠিক, তা নিয়ে মুসলিম দেশগুলোয় বিতর্ক রয়েছে। অনেক দেশে মুসলমানদের মধ্যে দুই ধরনের রীতি অনুসরণ করতে দেখা যায়।
তবে বেশিরভাগ মুসলিম দেশে ঈদের তারিখ সরকারিভাবে নির্ধারিত হয়।
অনেক দেশে চান্দ্র বর্ষপঞ্জি আগে থেকে নির্ধারিত করা থাকে। ফলে ঈদের তারিখটি আগে থেকেই জানা যায়।
২০১৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছিল তুরস্কের উদ্যোগে। সেখানে তুরস্ক, কাতার, জর্ডান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরোক্কোসহ ৫০টি দেশের ধর্মীয় পণ্ডিত এবং বিজ্ঞানীরা অংশ নেন।
ইন্টারন্যাশনাল হিজরি ক্যালেন্ডার ইউনিয়ন কংগ্রেস নামে পরিচিত এই সম্মেলনে হিজরি ক্যালেন্ডার নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মধ্যে যে বিভক্তি সেটা নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সেখানে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই বিশ্বের মুসলিমদের একটি বর্ষপঞ্জি মধ্যে নিয়ে আসার পক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। আর সেটি হলে রোজা যেমন একই দিন থেকে শুরু হতো তেমনি ঈদও একই দিন পালন করা সম্ভব হতো। কিন্তু সব মুসলিম দেশ সেটা কার্যকর করেনি।

বাংলাদেশে বহু ধর্মীয় নেতা এখনো পর্যন্ত নিজ দেশে খালি চোখে চাঁদ দেখা যাওয়ার ওপরই নির্ভর করতে চান।কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কুরআন ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম আকবর হোসেন বলছেন, ঈদের বিষয়ে যে শরিয়াহ বোর্ড সরকারকে পরামর্শ দেয় তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হলে জনমনে বিভ্রান্তি হবে না বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের পদার্থবিজ্ঞানী এবং ইসলাম ও বিজ্ঞান বিষয়ক বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক ড. শমসের আলী।
ড. আলীর বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ধর্মীয় উৎসবের তারিখ নির্ধারণের জন্য ইসলামে যে বিধান আছে, তার সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই। কাজেই আধুনিক জ্যোর্তিবিজ্ঞান প্রয়োগ করে খুব সহজেই বলে দেয়া সম্ভব কখন হিজরি সনের নতুন চান্দ্র মাস শুরু হচ্ছে।”

‘সারা পৃথিবীতে ঈদ হচ্ছে সে হিসেবে আমরাও আজ উদযাপন করছে কেউ কেউ’
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অনুসরণে ঢাকায় পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করছেন ঢাকার কিছু মানুষ। পান্থপথে ঈদের জামাতেও শামিল হয়েছেন তারা। বুধবার (১০ এপ্রিল) পান্থপথের একটি কনভেনশন সেন্টারে ঈদ-উল-ফিতরের নামাজ পড়েন তারা।
এদিন সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত ঈদ জামাতে অংশ নেন নারী-শিশুসহ বেশকিছু মুসল্লি। নামাজ শেষে তারা পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। এতে অংশ নেন দেশে অবস্থানরত কয়েকজন বিদেশি মুসলমানরাও।
পান্থপথে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের ভাষ্য, ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখো, চাঁদ দেখে ঈদ করো। সারা পৃথিবীতে ঈদ হচ্ছে সে হিসেবে আমরাও আজ উদযাপন করছি। এর আগেও এভাবে ঈদ করেছি।’
সরকারিভাবে বাংলাদেশে ঈদ-উল-ফিতর বৃহস্পতিবার নির্ধারিত। তবে চাঁদপুর, দিনাজপুর, মৌলভীবাজার, ফরিদপুর ও বরিশালের কোথাও কোথাও এক দিন আগেই ঈদ উদযাপন হচ্ছে। বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে মিল রেখে দেশের মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের একাংশ ঈদ উদযাপন করে আসছেন।


সৌদির সঙ্গে মিল রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে উদযাপিত হচ্ছে ঈদ


