টঙ্গীর বিশ্ব এস্তেমার  ময়দানে ও শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে লাখ লাখ মুসল্লি, দেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত দিনাজপুরে

171

প্রতি বছরের মতো এবারেও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে লাখ লাখ মুসল্লি সমবেত হয়। এছাড়া অনেকদিন পর আবারও ঈদুল ফিতরের জামাত বড়  টঙ্গীর ঐতিহাসিক বিশ্ব এস্তেমার  ময়দানে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এবার দেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত দিনাজপুরে ঐতিহাসিক গোর-এ শহীদ ময়দানে সম্পন্ন হয়েছে ।

No description available.

টঙ্গীর বিশ্ব এস্তেমার  ময়দানে ঈদুল ফিতরের বিশাল জামাতের আয়োজন

 

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ শহীদ ময়দানে সম্পন্ন হয়েছে ঈদুল ফিতরের জামাত। এবার বৃহৎ এই ঈদগাহে স্মরণকালের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মুসল্লীর সমাগম ঘটেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও এই জামাতে এবার অংশ নিয়েছে পাশের দেশের বেশ কিছু মুসল্লী। আয়োজকদের দাবি, এবার প্রায় ৬ লাখ মুসল্লী একসাথে নামাজ আদায় করেছে এই জামাতে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সুষ্ঠু ও শান্তিপুর্ণভাবে বৃহৎ এই জামাতে নামাজ আদায় করতে পেরে খুশি দিনাজপুরসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মুসল্লীরা।

বৃহৎ এই ঈদগাহে বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) ভোর থেকেই সমবেত হতে শুরু করেন মুসল্লীরা। সকাল সাড়ে ৯টা বাজাতে না বাজতে পরিপূর্ণ হয়ে যায় ২২ একর আয়তনের গোর-এ শহীদ ময়দানের বেশিরভাগ অংশ। সকাল ৯টা বাজার পরপরই শুরু হয় নামাজ। বৃহৎ এই জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা শামসুল আলম কাশেমী। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা করে করা হয় মোনাজাত। বৃহৎ এই জামাতে সুষ্ঠু ও শান্তিপুর্ণভাবে নামাজ আদায় করতে পেরে খুশি মুসল্লীরা।

এখানে নামাজ আদায় করেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মুসল্লীরাও। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে নামাজ আদায় করতে পেরে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মুসল্লীরা।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করায় শান্তিপুর্ণভাবে বৃহৎ এই জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। দিনাজপুরের পুলিশ সুপার শাহ ইফতেখার আহমেদ জানান, সুষ্ঠু ও শান্তিপুর্ণভাবে নামাজ সম্পন্নের জন্য চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ সম্পন্ন হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি।

ািব

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক শাকিল আহমেদ জানান, এবার কানায় কানায় মুসল্লীর সমাগম হয় এই ঈদগাহে। সার্বিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক মুসল্লী শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ আদায় করতে পেরে খুশী তিনি।

বৃহৎ এই জামাতের প্রধান উদ্যোক্তা জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি জানান, স্মরণকালের মধ্যে এবার বিপুল সংখ্যক মুসল্লী নামাজ আদায় করেছেন ঐতিহাসিক গোর এ শহীদ ময়দানে। এবার প্রায় ৬ লাখ মুসল্লী একসাথে নামাজ আদায় করেছেন বলে জানান তিনি। শেষ পর্যন্ত সফলভাবে ঈদের জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন তিনি। মুসল্লীদের জন্য দুটি স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান হুইপ ইকবালুর রহিম।

এই জামাতে নামাজ আদায় করেন, সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি, জেলা প্রশাসক শাকিল আহমেদ, পুলিশ সুপার শাহ ইফতেখার আহমেদ, দিনাজপুর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র আবু তৈয়ব দুলালসহ বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের জনতা।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ঈদগাহ দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ শহীদ ময়দান। ২২ একর আয়তন বিশিষ্ট এই ঈদগাহে ১৯৪৭ সাল থেকে ঈদের জামাত হলেও আধুনিক নির্মাণশৈলীতে এই ঈদগাহে বৃহৎ পরিসরে ঈদের জামাত শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকে। বৃহৎ এই জামাতে অংশ নেয়ার সুবিধার্থে এবারও বাংলাদেশ রেলওয়ে ব্যবস্থা করে দুটি স্পেশাল ট্রেনের। ঈদগাহে মুসল্লীদের জন্য স্থাপন করা হয় শৌচারগার, ওজুর ব্যবস্থা। বসানো হয় মেডিক্যাল টিম। পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে নেয়া হয় চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে পাঁচ লাখের বেশি মুসল্লি

শোলাকিয়ায় লাখো মুসল্লির সমাগমে আদায় করা হয় ঈদুল ফিতরের নামাজ।বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায়
বৃহস্পতিবার সকাল শোলাকিয়ায় লাখো মুসল্লির সমাগমে আদায় করা হয় ঈদুল ফিতরের নামাজ।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ আশরাফ আলী। বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা এলাকায়। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ ও মোনাজাত শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিনি বলছিলেন, তাঁর বয়স ৯১ বছর। ১৯৪৯ সালে চাচার মমরুজ আলীর সঙ্গে প্রথম শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়তে আসেন। সেই থেকে শুরু। এরপর প্রতিবারই তিনি শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ আদায় করছেন।

এ রকম অসংখ্য মুসল্লির সমাগমে ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো এবারের ঈদুল ফিতরের নামাজ। এই ঈদগাহে নামাজ আদায় করতে এক দিন আগেই অনেক মুসল্লি চলে আসেন। ভোর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলাসহ দূরদূরান্ত থেকে আসা ও স্থানীয় লাখো মুসল্লির সমাগম ঘটে ঈদগাহে। নামাজ শুরুর এক ঘণ্টা আগে সকাল ৯টার দিকে মাঠ কানায়-কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

নামাজ শুরু হয় সকাল ১০টায়। শোলাকিয়ায় এবার ছিল ১৯৭তম ঈদুল ফিতরের জামাত। জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের ইমাম মাওলানা শোয়াইব বিন আবদুর রউফ নামাজের ইমামতি করেন। প্রায় ৭ একরের মূল মাঠ ছাড়িয়ে পাড়া-মহল্লায় দাঁড়িয়েও শোলাকিয়ার ঈদের জামাতের সঙ্গে শরিক হয়েছেন অনেকে।

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, শোলাকিয়ায় প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। লাখ লাখ মুসল্লি স্বস্তিতে নামাজ আদায় করেছেন। স্থানীয় লোকজনের বরাত দিয়ে আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত ১০ বছরে শোলাকিয়ায় এত মুসল্লি হয়নি। এবার ৫ লক্ষাধিক মুসল্লির সমাগম হয়েছে। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনায় মোনাজাত হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, ভোর থেকে মুসল্লিরা আসতে শুরু করেন। সকাল ৯টার দিকে মাঠ কানায়-কানায় ভরে যায়। শোলাকিয়া মাঠের রেওয়াজ অনুযায়ী, বন্দুকের ফাঁকা গুলির মাধ্যমে সকাল ১০টায় জামাত শুরু হয়। মুসল্লিদের ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে মুখর ছিল ময়দান।

৭৫ বছর বয়সী হারুন অর রশিদ এসেছেন নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার লেবুতলা এলাকা থেকে। তিনি বলেন, ‘বড় মাঠে দোয়া কবুল হয়, সেই বিশ্বাসেই ১০ বছর বয়স থেকে এলাকার লোকদের সঙ্গে প্রথম শোলাকিয়া নামাজ পড়তে আসি। এখনো আসছি। আল্লাহ যত দিন বাঁচিয়ে রাখে, তত দিনই আসব। সেই ছোট্টবেলা থেকেই এ মাঠে লাখো মুসল্লির সমাগম দেখে আসছি। দিন দিন যেন এ সংখ্যা বেড়েই চলছে।’

দেশের সবচেয়ে বড় এই ঈদের জামাত নির্বিঘ্নে করতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসনের। মোতায়েন করা হয়েছিল র‍্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ), পাঁচ প্লাটুন বিজিবি এবং জেলা পুলিশের সহস্রাধিক সদস্য।

কিশোরগঞ্জে ঐতিহাসিক 
শোলাকিয়ায় এবার পাঁচ লক্ষাধিক মুসল্লির সমাগম হয়েছে বলে দাবি আয়োজকদের।
কিশোরগঞ্জে ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় এবার পাঁচ লক্ষাধিক মুসল্লির সমাগম হয়েছে বলে দাবি আয়োজকদের।ছবি: প্রথম আলো

মাঠের ভেতর ও বাইরে ছিল অর্ধশতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা, পুরো মাঠ পর্যবেক্ষণের জন্য ছিল বেশ কয়েকটি ড্রোন। ছয়টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের মাধ্যমে আগত ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ ছাড়া মাঠের ভেতর-বাইরে পুলিশ বাহিনীকে সহায়তায় ছিল বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবক দল। নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে ছাতা বা কোনো ধরনের ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শুধু পাতলা জায়নামাজ নিয়ে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। মুসল্লিদের যাতায়াতে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বিভিন্ন বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়ায় বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হজরত খাঁ কিশোরগঞ্জের জমিদারি প্রতিষ্ঠার পর এ ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে মাঠের জমির পরিমাণ আরও বাড়ানো হয়। শোলাকিয়া ওই অঞ্চলের তৎকালীন জমিদারের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ ছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়।

এ ছাড়া শোলাকিয়া মাঠ নিয়ে দুটি জনশ্রুতির বর্ণনা রয়েছে। এর একটি হলো, মোগল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা। মানে এক কোটি টাকা। কালের বিবর্তনে শ লাখ থেকে বর্তমান শোলাকিয়া হয়েছে। আরেকটি বর্ণনায় আছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকে এটি শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের কাছে পুলিশ সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা। এ সময় পুলিশের দুই সদস্য, স্থানীয় এক নারী, পুলিশের গুলিতে একজন সন্ত্রাসীসহ সেদিন চারজন নিহত হয়েছিলেন। সেই থেকে ঈদের জামাতে এ মাঠে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

পূর্বের খবরঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত
পরবর্তি খবরসপরিবারে নিহত মুক্তা ছিলেন গর্ভবতী