সারা দেশে আসনভিত্তিক প্রার্থী যাচাই-বাছাই এবং জনমত জরিপ শেষে দেখা গেছে, অন্তত ২২০ থেকে ২৩০টি আসনে বিএনপি এককভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত সোমবার এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) তাদের একটি জরিপে জানিয়েছে যে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জিততে পারে ২০৮টি আসন, যা নির্বাচনে দলটির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রায় ৪৬টি আসনে জয়ের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। রয়টার্সসহ দেশি-বিদেশি প্রভাবশালী গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানের জরিপেও বিএনপির বিপুল ব্যবধানে জয়ের সম্ভাবনার আভাস মিলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের জরিপগুলো তৃতীয় পক্ষের আচরণগত বিশ্লেষণ হলেও তা দেশজুড়ে রাজনৈতিক পরিবেশ ও ভোটারদের মনোজগতে বেশ প্রভাব তৈরি করে।

ঢাকাঃ রাত পোহালেই হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জনতার ভোটে কারা সরকার গঠন করবে এ নিয়ে বিগত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি জরিপের ফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি জরিপেই জয়ের পথে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি।
দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) এতে নেই। এক সময়ে উত্তরবঙ্গের প্রভাবশালী জাতীয় পার্টি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত। ২০০১ সালে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন শুরু করেছিল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। আড়াই দশক পর এবার ভোটের মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এমন পরিস্থিতিতে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ভূমিধস জয় পেতে পারে বিএনপি।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রতিবেদকদের পাঠানো মাঠচিত্র ও বড় দল বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ফলাফলের এই পূর্বাভাস তৈরি করেছে টাইমস অব বাংলাদেশ। এতে দেখা যায়, ২০৫টি আসন নিয়ে সহজে সরকার গঠন করতে পারে বিএনপি জোট।
অন্যদিকে, তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর জোট পেতে পারে ৪৮টি আসন। এক সময়ের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা নামতে পারে এক অঙ্কে, বড়জোর ৪টি। বিএনপি ও জামায়াতের দুই জোটের বাইরে ভোটের মাঠে বেশ সরব চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেতে পারে একটি আসন।
অন্যদিকে, বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেতে পারে ২০টি আসন। এ ছাড়া ২০টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করবেন বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থী, এসব আসনে আগাম জয়ের আভাস দেওয়া অসম্ভব। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সর্বশেষ এককভাবে নির্বাচন করেছে ১৯৯৬ সালে, ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিয়েছিল এই দুই দল।
সেবার সারা দেশে ৩৩ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোট নিয়ে ১১৬টি আসনে জয় পেয়েছিল বিএনপি। জামায়াতে ইসলামীর প্রাপ্ত ভোট ছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ, আসন ছিল মাত্র তিনটি। অবশ্য ১৯৯১ সালে এককভাবে নির্বাচন করে জামায়াত পেয়েছিল ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট, আসন পেয়েছিল ১৮টি। অর্থাৎ আগের নির্বাচন থেকে পরের নির্বাচনেই তাদের ভোট কমে গিয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের পর ওই আন্দোলনে মূল নেতৃত্ব দেওয়ার দাবিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে দৃশ্যমান আধিপত্য বিস্তার করেছে তারা। এ ছাড়া গত দেড় দশকে দলকে নীরবে সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী করেছে তারা। ফলে এবারের নির্বাচনে তাদের ভোটবৃদ্ধির প্রবণতাও স্পষ্ট। বিশেষ করে রংপুর ও খুলনা বিভাগে এই দলের বাড়তি ভোট ও প্রভাব বেশ দৃশ্যমান।

এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে ১৮টি পেতে পারে বিএনপি। এগুলো হচ্ছে পঞ্চগড়-১, ২, ঠাকুরগাঁও-১, ২; দিনাজপুর-৩, ৪, ৬; নীলফামারী-২; গাইবান্ধা-৩, ৪; কুড়িগ্রাম-২, ৩, ৪; লালমনিরহাট-১, ২, ৩ এবং রংপুর-৪ ও ৬ আসন।
অন্যদিকে, জামায়াত পেতে পারে দিনাজপুর-১, ২; নীলফামারী-১, ৩, ৪; গাইবান্ধা-১, ২ এবং রংপুর-১, ২ ও ৫ আসন। জাতীয় পার্টি পেতে পারে ঠাকুরগাঁও-৩; কুড়িগ্রাম-১ এবং রংপুর-৩। এ ছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী জিততে পারেন দিনাজপুর-৫ ও গাইবান্ধা-৫ আসনে।
খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ১৭টিতে জিততে পারে জামায়াতে ইসলামী। বিএনপিতে যেতে পারে ১২টি আসন, একটি আসন জিততে পারে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী। বাকি ৬টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, যেকোনো দলের পক্ষে যেতে পারে ফলাফল।
এই বিভাগে জামায়াত পেতে পারে: খুলনা-৫, খুলনা-৬, বাগেরহাট-২, বাগেরহাট-৪, সাতক্ষীরা-২, সাতক্ষীরা-৩, সাতক্ষীরা-৪, যশোর-১, যশোর-২, যশোর-৫, যশোর-৬, চুয়াডাঙ্গা-২, নড়াইল-২, কুষ্টিয়া-২, কুষ্টিয়া-৪, ঝিনাইদহ-৩, মেহেরপুর-২ আসন।
অন্যদিকে, বিএনপি পেতে পারে খুলনা-১, খুলনা-২, খুলনা-৩, খুলনা-৪, বাগেরহাট-৩, যশোর-৩, নড়াইল-১, মাগুরা-১, কুষ্টিয়া-১, কুষ্টিয়া-৩, ঝিনাইদহ-১, মেহেরপুর-১ আসন। ঝিনাইদহ-৪ আসন যেতে পারে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর ঝুলিতে।
সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি ১১টি ও জামায়াতে ইসলামী তিনটি আসন জেতার পূর্বাভাস দেওয়া যাচ্ছে। একটি আসনে জয়ী হতে পারে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী, বাকি তিনটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে কে জিতবে তা বলা যায় না।
বিএনপি জোট যেসব আসন পেতে পারে সেগুলো হচ্ছে সিলেট-১, ২, ৩, ও ৪; সুনামগঞ্জ-১, ২, ও ৫; হবিগঞ্জ-২, ৩, ৪ এবং মৌলভীবাজার-২ ও ৩ আসন। জামায়াত যেসব আসন পেতে পারে সেগুলো হচ্ছে সিলেট-৫, ৬ ও মৌলভীবাজার-১ আসন।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জিততে পারেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী। এ ছাড়া হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে সুনামগঞ্জ-৪, হবিগঞ্জ-১ ও মৌলভীবাজার-৪ আসনে। এই তিনটি আসনেই বিএনপি ও জোটের প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে আছেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী।
ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনের মধ্যে ২৩টিতে নির্বাচন হচ্ছে। জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে স্থগিত আছে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন। নির্বাচন হওয়া ২৩টি আসনের মধ্যে ১৯টি আসনেই জয় পেতে পারে বিএনপি। বাকি চারটি আসন যেতে পারে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দখলে।
যেসব আসনে বিএনপি জয়ী হতে পারে সেগুলো হচ্ছে ময়মনসিংহ-২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ১১; জামালপুর-১, ২, ৩, ৪ ও ৫; নেত্রকোণা-১, ২, ৩, ৪ ও ৫ এবং শেরপুর-১ ও ২ আসন। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ-১, ৩, ৯ ও ১০ আসন দখলে নিতে পারেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী।
রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের মধ্যে ৩০টি আসন পেতে পারে বিএনপি। বাকি ৯টি আসনের মধ্যে দুটিতে জামায়াতে ইসলামী ও একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পেতে পারে। অন্য ৬টি আসনে বিএনপি, স্বতন্ত্র ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
যেসব আসনে বিএনপি জয় পাবে সেগুলো হচ্ছে রাজশাহী-২, ৩, ৪, ৫ ও ৬; নাটোর-২, ৩ ও ৪; বগুড়া-১, ৪, ৫, ৬ ও ৭; নওগাঁ-২, ৪ ও ৫; সিরাজগঞ্জ-১, ২, ৩, ৪, ৫ ও ৬; পাবনা-২, ৩, ৪ ও ৫; জয়পুরহাট-১ ও ২; চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ ও ৩ আসন।
এ ছাড়া বগুড়া-৩ ও পাবনা-১ আসনে জামায়াত জিততে পারে। এ ছাড়া হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে রাজশাহী-১; বগুড়া-২, নওগাঁ-১ ও ৩; নওগাঁ-৬; নাটোর-১ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে।
ঢাকা বিভাগের ৭০টি আসনের মধ্যে ৪৮টি আসনে বিএনপি, ৮টি আসনে জামায়াত-জোট এবং ৯টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেতে পারেন। বাকি ৭টি আসনের মধ্যে ৬টিতে বিএনপি ও স্বতন্ত্র এবং একটিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।
বিএনপির সম্ভাব্য জয় পাওয়া আসনগুলো হচ্ছে টাঙ্গাইল-১, ২, ৫, ৬; মানিকগঞ্জ-১, ২, ৩; গাজীপুর-১, ২, ৩; ঢাকা-১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১১, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০; মুন্সীগঞ্জ-২, ৩; নারায়ণগঞ্জ-১, ৩, ৫; নরসিংদী-১, ২, ৪; কিশোরগঞ্জ-১, ২, ৩, ৪, ৬; ফরিদপুর-২, ৩, ৪; মাদারীপুর-১, ২, ৩; শরীয়তপুর-১, ২, ৩; গোপালগঞ্জ-৩ এবং রাজবাড়ী-১ ও ২। জামায়াত ও জোটের সম্ভাব্য আসনগুলো হচ্ছে গাজীপুর-৩; ঢাকা-৭, ১২, ১৩, ১৪, ১৫; ফরিদপুর-১ এবং গোপালগঞ্জ-২।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেতে পারেন টাঙ্গাইল-৩, ৪, ৮; নারায়ণগঞ্জ-২, ৪; ঢাকা-৯ এবং কিশোরগঞ্জ-৫ আসন।
বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ১৬টি, জামায়াত দুটি, জাতীয় পার্টি একটি, ইসলাম আন্দোলন একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী একটি আসনে জয় পেতে পারেন। বাকি দুটির একটিতে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলন এবং একটিতে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করবেন।
বিএনপি ও জোটের সম্ভাব্য আসনগুলো হচ্ছে বরিশাল-১, ২, ৪, ৫, ৬; পটুয়াখালী-১, ২, ৩; ভোলা-১ (বিজেপি), ২, ৩, ৪; বরগুনা-১, ২ এবং ঝালকাঠি-১, ২।
পিরোজপুর-১ ও ২ আসনে জামায়াত, বরিশাল-৩ আসনে জাতীয় পার্টি, পিরোজপুর-৩ আসনে ইসলাম আন্দোলন এবং পটুয়াখালী-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জিততে পারেন।
চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৮টি আসনের মধ্যে ৫০টি আসনেই জয় পেতে পারে বিএনপি জোট। এর বাইরে জামায়াত জোট ৬টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দুটি আসন পেতে পারেন।
বিএনপি জোটের সম্ভাব্য আসনগুলো হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ৩, ৪, ৫, ৬; কুমিল্লা-১, ২, ৩, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০; চাঁদপুর-১, ২, ৩, ৫; লক্ষ্মীপুর-১, ২, ৩, ৪, ৫; নোয়াখালী-১, ২, ৩, ৪, ৫; ফেনী-১, ২, ৩; চট্টগ্রাম-১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৬; কক্সবাজার-১, ৩, ৪ এবং বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি।
জামায়াত জোটের সম্ভাব্য আসন কুমিল্লা-৪, ১১; নোয়াখালী-৬ (এনসিপি); চট্টগ্রাম-১৪ (এলডিপি), ১৫ এবং কক্সবাজার-২। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী জিততে পারেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও চাঁদপুর-৪ আসনে।
সারা দেশে বাকি ২০টি আসনের কোথাও দ্বিমুখী, কোথাও ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। সেখানেও অর্ধেক আসনে লড়াই হবে বিএনপির সঙ্গে একই দলের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর। বাকি ১০ আসনে বিএনপির সঙ্গে তুমুল লড়াই গড়ে তুলবে জামায়াতে ইসলামী।




