আন্দোলন দমানোর এ কেমন ‘কৌশল’ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ রক্ষা হবে কি?

187

কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা

 

গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়

সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়

 

ঢাকাঃ বিসিএস পরীক্ষাসহ সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সারা দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছে। ‘বাংলা ব্লকেড’ নাম দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ তারা অবরোধ করেছে।

এটি নিঃসন্দেহে জনদুর্ভোগ বাড়িয়েছে। তবু দেশের বেশির ভাগ মানুষ তাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে। আন্দোলনের শুরুর দিকে ছাত্রলীগও কোটা সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছিল। পরে সরকারের বিভিন্ন মহলের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বক্তব্যও পাল্টাতে থাকে। কিন্তু গত দুই দিনে পরিস্থিতি এত দ্রুত পাল্টে যাবে, এটা বোধ করি কারও ধারণায় ছিল না।

১৪ জুলাই রাতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’, ‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ এ ধরনের স্লোগান দেয়। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এই স্লোগান মোটেও নিজেদের ‘রাজাকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়। বরং এটি এক ধরনের ‘আয়রনি’।

 

রংপুরে সংঘর্ষে মারা যান কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। আহত হওয়ার আগে পুলিশের গুলির সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে পড়েন তিনি।
রংপুরে সংঘর্ষে মারা যান কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। আহত হওয়ার আগে পুলিশের গুলির সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে পড়েন তিনি।

মুশকিল হলো, এই স্লোগানের মধ্যে আলোচনাকে সীমিত রেখে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নৃশংস হামলাকে অনেকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫-১৬ জুলাই এবং এর পূর্বাপরের ঘটনা দেখে মনে হয়, পুরো আয়োজনটি যেন পূর্বপরিকল্পিত।

এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা অতীতের যেকোনো কর্মকাণ্ডকে হার মানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগ হয়েছিল বাইরে থেকে আসা প্রচুরসংখ্যক দলীয় কর্মী, যাদের অনেকের মাথায় হেলমেট ছিল। তারা হকিস্টিক, লাঠি, রড, লোহার পাইপসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ করে। কারও কারও হাতে পিস্তলও দেখা যায়। পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমে এসব ছবি ও ভিডিও রয়েছে।

ঘটনার সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেনি। তবে এখন দেখার বিষয়, যেসব দুর্বৃত্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হলে ঢুকে এমন তাণ্ডব চালাল—তারা যে দলের বা যে পক্ষেরই হোক—তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

আন্দোলন দমানোর কৌশল হিসেবে এমন হামলা এটাই প্রথম নয়। কিন্তু এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলন এই প্রক্রিয়ায় দমনের চেষ্টা করা হবে, এটি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ভাবতে পারেনি। পারলে প্রশাসন অন্তত ন্যূনতম ভূমিকা রাখতে পারত। হয়তো ঘটনা এত দূর ছড়াত না।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, ১৫ জুলাই তিনশর বেশি শিক্ষার্থী আহত বা গুরুতরভাবে জখম হয়েছে। ক্যাম্পাসে ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে রাখায় ঘটনার নৃশংসতা তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের পক্ষেও জানা সম্ভব হয়নি। এমনকি ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের ওপরও হামলা হয়েছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় সারা দেশে পরদিন ১৬ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও আন্দোলন করতে দেখা গেছে। এ দিন আন্দোলনের ভয়াবহতায় সরকার বিভিন্ন জেলায় বিজিবি নামাতে বাধ্য হয়েছে। এই লেখা তৈরির সময় পর্যন্ত সংঘর্ষ ও হামলায় সারা দেশে অন্তত ছয় জন মারা গেছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।

 

 

চট্টগ্রাম নগরে মুরাদপুর এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দিকে গুলি করতে দেখা যায় এক অস্ত্রধারীকে
চট্টগ্রাম নগরে মুরাদপুর এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দিকে এক অস্ত্রধারীকে গুলি করতে দেখা যায়

 

ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ‘লন্ডনে’। ছাত্রদলও ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর এখন দেশের স্কুল-কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

১৫ জুলাই দুপুরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত শিক্ষার্থীদের রাজাকার পরিচয়-সংশ্লিষ্ট স্লোগান আমাদের জাতীয় মৌলিক চেতনার সঙ্গে ধৃষ্টতার শামিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘কোটাবিরোধী কতিপয় নেতা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, এর জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত।’ জাতীয় মৌলিক চেতনার সঙ্গে ধৃষ্টতাপূর্ণ স্লোগান বা বক্তব্যের বিপরীতে কোন শাস্তি দেওয়া যায়, সেটি আদালতে বিচার্য হতে পারে। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল পদে থেকে এভাবে কোনো ছাত্রসংগঠনকে ‘জবাব’ দেওয়ার কথা বলা যায় কি না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি অবশ্যই এড়ানোর দরকার ছিল। সরকারের সব পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখার সময়ে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ওপরে ওঠার প্রয়োজন।

তাছাড়া কোন কৌশলে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে দমন করা যেত, সেটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বসে পরিকল্পনার দরকার ছিল। দরকার ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গেও বসা, আলাপ করা। কারণ, দিনের পর দিন জনদুর্ভোগ তৈরি করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অধিকার নিশ্চয় কোনো পক্ষকে দেওয়া হয়নি।

সরকারের তরফ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, কোটা সংস্কারের ব্যাপারটি আদালতের ব্যাপার, আদালতেই সমাধান হতে হবে। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা দেশের নির্বাহী বিভাগের কাছ থেকে সমাধান চেয়েছে। কোটা বহাল রেখে তা বাড়ানো-কমানোর এখতিয়ার সরকারের হাতে দিয়েছেন আদালত।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়তো আরও ধৈর্য ধরার প্রয়োজন ছিল। শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত আসে সেটি তারা দেখতে পারত। প্রয়োজনে তখন নতুন করে আন্দোলন জমাতে পারত। তবে একই সঙ্গে বলতে হয়, সরকারি চাকরিতে বারবার কোটা সংস্কারের সুপারিশ করা হলেও সরকার কেন তা বিবেচনায় নেয়নি, সেটি জনমনে জিজ্ঞাসা।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী কিংবা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কোটা নিয়ে কোনো পক্ষের বিরোধ নেই। মূল বিরোধ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি কিংবা তাঁদের নাতি-নাতনি কোটা নিয়ে।

এক মুক্তিযোদ্ধার বিপরীতে কত প্রজন্মের কতজনের জন্য কোটার সুবিধা রাখা হবে, সেটি এখন নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপার। কারণ, একাত্তর সালের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার যদি চারজন সন্তান থাকেন, তবে সেই চারজনের ঘরে এখন অন্তত আটজন নাতি-নাতনি আছে ধরা যায়। তবে মানতে হবে, কোটা থাকলেও সবাইকেই কয়েক ধাপের পরীক্ষা দিয়ে চাকরির সুযোগ পেতে হয়।

হামলা-সংঘর্ষের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আরও বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, কেউ বলতে পারে না। সরকারকে এই মুহূর্তে দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। কারণ, সংবাদমাধ্যম থেকেই আমরা দেখছি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমানোর কৌশল হিসেবে ছাত্রলীগ-যুবলীগকে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যদি ছাত্র সংগঠন বা দলীয় নেতাকর্মীর হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কী হবে, সেটিও স্পষ্ট করা দরকার।

 

 

শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ রক্ষা হবে কি

 

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পর একজন শিক্ষার্থীর প্রধান কাজ হলো ‘পড়াশোনা’ করা, বিশ্বমানব হিসেবে নিজেকে মেলে ধরার জন্য ‘প্রস্তুতি’ গ্রহণ করা। কিন্তু আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কাজটি করতে এসে ক্লাস-পরীক্ষা বাদ দিয়ে রাস্তায় নেমে কখনো সরকারি চাকরিতে ‘বয়স বাড়ানোর’ সংগ্রাম করতে হচ্ছে, আবার কখনো কোটা সংস্কারের আন্দোলন। আর এসব করতে গিয়ে কখনো তাঁদের শরীরে রক্ত ঝরছে, আবার কখনো মানসিক নির্যাতন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার পরিবর্তন (সংস্কার) চেয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। শেষ পর্যন্ত তা ‘রক্তপাতে’ গড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকেরা রাতের আঁধারে মারধরের শিকার হয়েছেন। আহত হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন অনেকেই।

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর, দেশের উচ্চশিক্ষালয়ে এই চিত্রের যে পরিবর্তন হয়নি, তার দায়দায়িত্ব যে–ই নিক না কেন, আমাদের বাচ্চাদের মনে যে ঘৃণাবোধ জন্ম নিচ্ছে, তার দায় অন্তত এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকারকে নিতেই হবে।

 

 

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর তিন অস্ত্রধারীর গুলি। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর তিন অস্ত্রধারীর গুলি

 

 

যদিও এই সব রক্তপাত-সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে ‘দাবি’ আদায়ের ‘কৌশল’ বহু পুরোনো; কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্বের এই সময়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের যেখানে দেশ নিয়ে ভাবার কথা, বৈশ্বিক ক্ষেত্রে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার লড়াই করার কথা, সেখানে এই শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে হচ্ছে, সেটা ভাবতেই কষ্ট লাগছে। তরুণ প্রজন্মের মনটা বিষিয়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হবে? কেন আমাদের ছেলেমেয়েদের বারবার রাজপথে নামতে হবে?

ভোটের বিতর্ক যেটাই হোক, সংবিধানের ধারাবাহিকতায় এই দেশে ‘সংসদ’ সচল রয়েছে। সাড়ে তিন শ সংসদ সদস্য দেশের আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু কখনোই তাঁরা আমাদের তরুণ প্রজন্মের দুঃখের কথা, দুর্দশার কথা সংসদে গিয়ে বলেন না। সেখানে গিয়ে তাঁরা দাবি তোলেন না যে চাকরিব্যবস্থায় আমাদের একটি ‘আদর্শিক-দৃঢ়’ নীতির প্রয়োজন। কোনো সংসদ সদস্যই শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি সেজে তাঁদের আক্ষেপগুলো সংসদে শোনাতে পারেননি, সরকারকে সম্পৃক্ত করাতে পারেননি।

জনগণের করের টাকায় চলা সংসদের তাহলে কী নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত? বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে, আন্দোলন-সংগ্রাম না করলে কোনো যৌক্তিক দাবিই পূরণ হয় না। আর এসব দাবি পূরণে তাই সরকারপ্রধানের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। এবারও সেটাই ঘটেছে।

 

 

নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা
নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

কোটা সংস্কারের দাবিতে ছয় বছর আগে শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, সেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার ক্ষতি করে দাবি আদায় করেছিলেন, সেই দাবিটিকে অসাড় করে দিয়ে ফের কেন তাঁদেরকে রাস্তায় নামতে হলো? শিক্ষার্থীরা তো কোটা বাতিল চাননি। কোটা বাতিল হয়েছিল সরকারপ্রধানের নির্বাহী আদেশে। সেই আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। সেখান থেকেই নতুন করে জটিলতার শুরু।

বাস্তবতা হচ্ছে, কোটাব্যবস্থার যে একটি সংস্কার প্রয়োজন, এ নিয়ে খুব মতভেদ আছে বলে মনে হয় না। এখন কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় তা করা হবে, সেই পরিকল্পনা ও চিন্তাভাবনা নীতিনির্ধারকদের থাকা উচিত। আমাদের মনে রাখা উচিত ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সরকারের ভোটের একটি বড় অংশ ছিল ‘তরুণ’। এই তরুণেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ, এই তরুণেরা জাগ্রত থেকে ২০১৩ সালে রাজাকার-আলবদরের ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার ছিল। এই তরুণেরা এখন দেশের বিভিন্ন দায়িত্বে। ক্রমেই এই তরুণেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাওয়ার কথা।

নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কিন্তু ‘চাক্ষুষ-বৈষম্যের’ জাঁতাকলে পড়া এখনকার তরুণদের নিজেদের ‘রাজাকার’ ট্যাগ লাগানো, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা কিংবা ‘পক্ষ’ বানিয়ে ফেলার দায় তাহলে কার? এই তরুণদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলা কতটা জরুরি ছিল?

মনে রাখতে হবে, আজকে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে রাস্তায় নেমেছেন মূলত ‘বেকারত্ব’ ঘোচানোর জন্য।

সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করতে একটি ঐক্য তৈরিতে তাঁরা সফল হয়েছেন, এই বিষয়টি আমাদের শাসকগোষ্ঠীর মানা উচিত। এই শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বোঝার সক্ষমতা সরকারের থাকা উচিত।

বিরোধী দলের মতো শিক্ষার্থীদের যে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করা উচিত নয়, সেই বোধ থাকা দরকার।

প্রজন্মের এই রূপান্তরে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের’ শক্তিশালী করার দায়িত্ব যদি সরকার নিয়ে ফেলে, তাহলে মনে রাখতে হবে, আমাদের মহান স্বাধীনতার স্বপ্ন তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বা দিচ্ছে। জাতিগত বিভেদ আর আদর্শিক বিভেদের মতো তফাতটা আমাদের জানতে হবে।

 

 

কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলা। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলা। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ক্ষমতাসীনেরা যদি মনে করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মানের জন্য যদি তাঁদের নাতি-পুতিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে, ‘স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি’ শক্তিশালী হবে, তা হলে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী চাকরিক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নামতেন না।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যে শক্তিশালী করা যাবে না, সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। এর বদলে তাঁদের যোগ্যতাভিত্তিক (মেধা শব্দটি বেমানান) সরকারি চাকরির সম–অধিকার ফেরাতে কোটা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা জরুরি।

কোটা সংস্কারের জন্য কমিশন করুন, আলোচনা করুন। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আর নারীদের অবস্থান নিশ্চিত করে কোটা সংস্কার জরুরি, তা মস্তিষ্ক দিয়ে বিচার করুন।

মনে রাখতে হবে, বল প্রয়োগে যে ক্ষয় হবে বা হচ্ছে, তাতে কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীরা বলবান হচ্ছে। এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের হাতে, আপনারা রক্তপাত করে তরুণদের মনকে আরও বিষিয়ে তুলতে চান, নাকি তাঁদের চিন্তাচেতনায় সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশকে রাখতে চান।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

    ই–মেইল: nadim.ru@gmail.com

পূর্বের খবরকোটা সংস্কার আন্দোলন: ছাত্রলীগ–পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে নিহত ৬
পরবর্তি খবরHSC, equivalent exams on Thursday postponed