ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন সফল ভাবে অগ্রসর হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে এখন চলছে প্রার্থীদের আপিলের শুনানি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বেশির ভাগ আপিলকারী প্রার্থিতা ফিরে পাচ্ছেন। কিন্তু ইসিতে কর্মরত এক শ্রেণীর কর্মকর্তা সূক্ষ্মভাবে ব্যালটে জামায়াতের প্রতীক আগে দিয়েছেন; আর বিএনপির প্রতীক নিচের দিকে দেয়া হয়েছে।

ঢাকাঃ আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রবাসীদের ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে বিদেশে পাঠানো পোস্টার ব্যালট পেপারে রাজনৈতিক দলগুলোর এই ‘প্রতীক’ সাজানো দেখে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। ক্রম অনুসারে প্রতীক সাজানোয় দেখা যায় ব্যালট পেপারে ৫টি কলাম করা হয়েছে। প্রতিটি কলামে ১৪টি করে প্রতীক ছাপা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে আপেল প্রতীক দিয়ে প্রতীক ছাপানো হলেও প্রথম লাইনের সবার উপরে ৫ নম্বর লাইনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক মুদ্রিত হয়েছে। আর একই প্যারার নিচের ৭ নম্বর লাইনের বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক রাখা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনে কর্মরত জামায়াতপন্থী কর্মকর্তারা সুকৌশলে ব্যালটে প্রতীকের এই বিন্যাস করেছেন। শুধু তাই নয়, প্রতীক বরাদ্দের আগে বিএনপিসহ প্রায় সব দল নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত থাকলেও জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এই প্রচারণা নির্বাচনের আচরণবিধির সুস্পষ্ট লংঘন। কিন্তু জামায়াতের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি লংঘনের অভিযোগে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে চলছে তীব্র বিতর্ক। গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জানানো হয়েছে। বিএনপির একজন নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন স্বীকার করেছে অসাবধানতাবশত ব্যালটে এমনভাবে প্রতীক ছাপানো হয়েছে।
গতকাল নির্বাচন কমিশনে পোস্টাল ব্যালটের ক্রম নিয়ে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এ সময় বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিদেশে নিবন্ধিত ভোটারদের কাছে যে ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে সেই ব্যালটে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশেষ রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক প্রথমে রাখা হয়েছে। আর বিএনপির নাম ও প্রতীক রাখা হয়েছে ব্যালট পেপারের ভাজের নিচে। যাতে এটি ভাজ করলে চোখে না পড়ে। এ বিষয়ে বিএনপি ইসির কাছে অভিযোগ করেছে। ইসি জানিয়েছে যে, তারা এই বিষয়টি খেয়াল করেননি। তবে নজরুল ইসলাম খান ইসিকে জানিয়েছে, ব্যালট পেপারটিতে ৫টি কলাম ও ১৪টি লাইন করা হয়েছে। এমনভাবে ব্যালট পেপারের কলাম ও লাইন করা হয়েছে যাতে তিনটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক উপরের দিকে থাকে। কলাম বা লাইন যদি কম-বেশি করা হয় তাহলে কিন্তু তাদের নাম উপরের দিকে থাকে না। যারা এটির দায়িত্বে ছিল তারা এটি ইচ্ছাকৃত বা বিশেষ উদ্দেশে করেছে। তিনি বিদেশে পাঠানো ব্যালট পেপার বা দেশে যাদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হবে সেগুলো সংশোধনের সুযোগ থাকলে সংশোধন করার আহ্বান জানান।
জানা যায়, ২০০৮ সালে সাময়িক নিবন্ধনের পর ধর্মভিত্তিক ও সংবিধানবিরোধী অবস্থান নিয়ে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে জামায়াত। ২০১৩ সালে হাইকোর্ট দলটির নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন ২০১৮ সালে নিবন্ধন বাতিল করে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়া নির্বাচনে প্রতীক নিয়ে অংশ নেয়ার সুযোগ না থাকায় কার্যত জামায়াত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়। এমনকি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। এরপরই আপিল বিভাগে জামায়াতের নিবন্ধন সংক্রান্ত মামলাটি পুনরায় চালু করার আবেদন জানানো হলে রায়ে নিবন্ধন ফিরে পায়। দীর্ঘদিন পর গত বছর দলটি নিবন্ধন ফিরে পেলেও জামায়াতের প্রতীক দাড়িপাল্লা ক্রম অনুসারে সবার উপরে দেয়া হয় এবং বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক যাতে সহজেই ভোটারদের চোখে না পরে সে জন্য কৌশলে ৭ নম্বর সারিতে দেয়া হয়। এটা নির্বাচন কমিশনে কর্মরত জামায়াতি চেতনাধারী কর্মকর্তাদের সূক্ষ্ম কৌশল।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন দুই প্রক্রিয়ায় ব্যালটে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীক সাজাতে পারতো। প্রথমত বাংলা বা ইংরেজি শব্দের ক্রম অনুসারে প্রতীক সাজানো যেত। দ্বিতীয়ত নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের ক্রম অনুসারে। কিন্তু এ দু’টি সিস্টেমের কোনোটিই ফলো করেনি নির্বাচন কমিশন। জামায়াতের প্রতীক দাড়িপাল্লা যাতে সবার আগে ভোটারদের চোখে পড়ে সে জন্যই দলটির প্রতীক প্রথম লাইনে দেয়া হয়। আর বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের নিচে সাত নম্বর লাইনে দেয়া হয়।
প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীকের ক্রম দেখে প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কেউ কেউ ইনকিলাবে ফোন করে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই প্রতিবাদ করেছেন নির্বাচন কমিশনের এমন প্রতীক সাজানোর ক্রম দেখে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন নির্বাচন কমিশনে জামায়াতপন্থীরা প্রভাবশালী হওয়ায় সুকৌশলে ব্যালটে প্রতীকের ক্রম সাজানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রবাসী জানান, পোস্টাল ব্যালট দেখে তাদের ধানের শীষ প্রতীক খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হচ্ছে। তবে দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ নিবন্ধন না থাকা জামায়াতের দাড়িপাল্লা প্রতীক এবারের নির্বাচনে প্রথম সারিতে দেয়ায় ইসির জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের কারসাজি বলে অবিহিত করেছেন।
পোস্টাল ব্যালটে জামায়াতের প্রতীককে অগ্রাধিকার দেয়ার পাশাপাশি সারাদেশে জামায়াত প্রার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী প্রতীক ররাদ্দের আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে পারবে না। এ জন্যই নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফল বাতিল করা হয়। কিন্তু সারাদেশে জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচনী আইন লংঘন করে প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন জেলার স্থানীয়রা বলছেন, জামায়াতের প্রচারণা চললেও জেলা প্রশাসন নীরবতা পালন করছেন। তবে অন্যান্য দলের প্রার্থীদের কেউ প্রচারণা করলে তাদের সতর্ক করা হচ্ছে এবং জরিমানাও করা হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে কাজ করেন এমন একাধিক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এনসিপির সহায়তায় প্রশাসনে জামায়াতিকরণ করা হয়। সচিবালয়ের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে ডিসি, এসপি, ইউএনও থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ পদে জামায়াত অনুসারীদের বসানো হয়। তারা নির্বাচনে সুকৌশলে জামায়াতের পক্ষ্যে থাকায় দাড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীদের আচরণবিধি লংঘন করে প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। নির্বাচন কমিশনের জামায়াতি কর্মকর্তাদের এমন পক্ষপাতিত্ব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আসন্ন নির্বাচনের ব্যাপক প্রভাব পড়বে। যা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য হবে অন্তরায়।





