মুসলমানদের চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক যে মসজিদ

184

অনলাইন ডেস্ক:

তিনি লিখেছেন, ‘মগ জলদস্যুরা জলপথে বাংলাদেশের ভুলুয়া, সন্দ্বীপ, সংগ্রামগড়, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, বাকলা, যশোর, ভূষণা ও হুগলি লুণ্ঠন করতো। তারা হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ ও বড়-ছোট-নির্বিশেষে ধরে নিয়ে যেত। হাতের তালু ফুঁড়ে বেত চালিয়ে গরু-ছাগলের মতো বেঁধে নৌকার পাটাতনে ঠাঁই দিতো। মুরগিকে যেভাবে দানা ছিটিয়ে দেওয়া হয়, তাদেরও তেমনি চাউল ছুড়ে দেওয়া হতো খাবার জন্যে। এ অবহেলা ও পীড়নের পরেও যারা বেঁচে থাকতো তাদের ভাগ করে নিতো মগে-পর্তুগীজে।’

এরই ধারাবাহিতায় শাহজাদা সুজার পর তার সব সন্তানাদিকেও হত্যা করে মগ দস্যুরা। ভিনদেশি কারও হাতে ভাইয়ের খুন, নিজ পরিবারের স্ত্রী-সন্তানের সম্ভ্রম লুটকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব। আরাকান রাজার হাতে নিজ ভাইয়ের খুনের প্রতিশোধ নিতে তাই নিজ মামা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচর শায়েস্তা খাঁকে বাংলার সুবেদার করে পাঠান তিনি।

এ অভিযানে প্রধান সেনানায়ক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সুবেদার শায়েস্তা খাঁর সুযোগ্য পুত্র বুজুর্গ উমেদ আলী খাঁ। অভিযানের শুরুতে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে ওলন্দাজদের কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় সন্দ্বীপ দখল করে মোগলরা। তৎকালীন সময়ে মগদের কেন্দ্র ছিল চাটগছার আন্দরকিল্লা। দ্বিমুখী আক্রমণে ১৬৬৬ সালের ২৭ জানুয়ারি পতন ঘটে আন্দরকিল্লার।

বুজুর্গ উমেদ আলী খাঁ আন্দরকিল্লা পতনের পর চট্টগ্রামের নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক চিহ্ন হিসেবে মগদের ফেলে যাওয়া কিল্লার ওপরে ১৬৬৭ সালে নির্মাণ করেন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। মসজিদের দুয়ারে ফারসি ভাষায় লেখা হয় ‘হে জ্ঞানী, তুমি জগতবাসীকে বলে দাও, আজ এ দুনিয়ায় দ্বিতীয় কাবা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার প্রতিষ্ঠাকাল ১০৭৮ হিজরি।’ কালো পাথরের শিলালিপি আজও সাক্ষ্য দেয় সেই ইতিহাসের।

মসজিদের শিলালিপিতে বাংলার মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁন এটি নির্মাণ করেন বলে উল্লেখ আছে। যদিও ধারণা করা হয়, এ মসজিদের প্রকৃত নির্মাতা শায়েস্তা খানের বড় ছেলে ও চট্টগ্রাম বিজেতা উমেদ খাঁন। তবে তার নাম ওই শিলালিপিতে উল্লেখ নেই।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মশিউর রহমান সেলিম তার ‘চট্টগ্রামে মগের মুল্লুকের পতন ও মোগল বিজয়’ শীর্ষক এক লেখনীতে উল্লেখ করেন, ‘মোগলদের এ বিজয় না হলে হয়তো এখন রোহিঙ্গাদের মতো ফেনী নদীর তীরে আমাদেরও দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো।’

সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণমুখী সড়কটি হঠাৎ দুভাগ হয়ে চলে গেছে দু’দিকে। দুটি পথ পরম মমতায় আগলে রেখেছে একটি ছোট্ট পাহাড়। ওই পাহাড়ের গায়েই ৩৫৭ বছরের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ। আসরের নামাজ শেষে বিকেলের রোদ এসে পড়ছিল মসজিদের মিনারে।

চট্টগ্রামে মুসলিম বিজয়ের স্মারক এ ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার আগের সৌন্দর্য আর নেই। কয়েকশ বছর ধরে মূল কাঠামোর চারদিকে এটি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মসজিদের চৌহদ্দির তিন দিকে বিশাল বিপণিকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এতে মসজিদের সৌন্দর্যহানি হয়েছে। সময়ের বিবর্তনে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় মসজিদের বিস্তৃতি ঘটেছে, ঢাকা পড়েছে আদি সৌন্দর্যটুকু।

বর্তমানে এ মসজিদে প্রতি ওয়াক্তে অন্তত আড়াই থেকে তিন হাজার মুসুল্লি নামাজ আদায় করেন। শুক্রবার জুমায় তা ছাড়িয়ে যায় পাঁচ হাজার।

গবেষকরা জানান, প্রাচীন এ মসজিদের সব শিলালিপির সঙ্গে সিরিয়ার ‘রাক্কা নগর’ এর স্থাপত্যকলার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বর্তমানে শিলালিপিটি মূল মসজিদের একপ্রান্তে বসানো অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। সেই সময়ে মসজিদের মূল ইমারতের প্রবেশপথে কালো পাথরের গায়ে খোদাই করা সাদা অক্ষরে লেখা ফারসি শিলালিপিটি বসানো হয়েছিল।

শুধু স্থাপত্য নিদর্শনই নয়, স্থাপত্য অনন্য শৈল্পিক দিক থেকেও মসজিদটি এ অঞ্চলের এক অনন্য পুরাকীর্তি হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদের আদলে মোগল স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী তৈরি হয়েছে। মসজিদের বিশাল আঙিনা, কারুকার্যখচিত খিলান আর গম্বুজ দেখলে পারস্যরীতির স্থাপত্যশৈলীর কথাও মনে পড়বে। দিল্লি জামে মসজিদের আদলে বড় বড় পাথর ব্যবহার করে নির্মিত বলে এই মসজিদকে ‘পাথরের মসজিদ’ও বলা হয়ে থাকে।

সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট ওপরে ছোট একটি পাহাড়ের ওপর এর অবস্থান। মূল মসজিদের নকশা অনুযায়ী এটি ১৮ গজ (১৬ মিটার) দীর্ঘ। প্রস্ত ৭ দশমিক ৫ গজ (৬.৯ মিটার)। প্রতিটি দেয়াল প্রায় ২ দশমিক ৫ গজ (২.২ মিটার) পুরু। পশ্চিমের দেয়াল পোড়া মাটির তৈরি, নান্দনিক টেরাকোটা সমৃদ্ধ এবং বাকি তিনটি দেয়াল পাথরের তৈরি। মসজিদটির পূর্বে তিনটি ও উত্তর এবং দক্ষিণে একটি করে মোট ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদটিতে তিনটি মেহরাব থাকলেও সাধারণত মধ্যখানের ও সর্ববৃহৎ মেহরাবটিই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মসজিদটির ছাদে তিনটি গম্বুজ মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চারটি অষ্টভুজাকৃতি বুরুজের মধ্যে পেছন দিকের দুটি এখনো টিকে আছে।

নির্মাণের পর থেকেই চট্টগ্রামের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে আন্দরকিল্লার এ মসজিদ। কিন্তু ১৭৬১ সালে নবাব মীর কাসিম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান মেদিনীপুর জেলাসহ বর্তমান চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব ইংরেজদের হাতে ছেড়ে দেন। ইংরেজরা চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার পর আন্দরকিল্লা মসজিদকে অস্ত্রাগার ও আস্তাবলে পরিণত করে। ১৭৬১ সাল থেকে ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯৪ বছর তারা এ মসজিদে কোনো ধরনের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতে দেয়নি মুসলমানদের। পরবর্তীতে এর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন তৎকালীন ব্রিটিশ রাজের অধীনস্থ রাজস্ব কর্মকর্তা খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খান। তার এ আন্দোলনের মুখে ১৮৫৬ সালে আন্দরকিল্লা মসজিদ পুনরায় চালু হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে মসজিদটির দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

আন্দরকিল্লা মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম আনোয়ার হোসাইন আল আজহারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাড়ে তিনশত বছর ধরে চট্টগ্রামের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবেই বিবেচিত এ মসজিদ। তখন থেকে দীর্ঘকাল রোজা, ফিতরা এবং ঈদের চাঁদ দেখার প্রশ্নে এ মসজিদের ফয়সালা চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ মেনে চলছেন। প্রতি জুমার দিনে চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা এসে নামাজ আদায় করেন। পবিত্র মাহে রমজানের শেষ জুমায় কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকেও মানুষের সমাগম হয়।’

এ মসজিদের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- শত বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আওলাদে রাসূলরা। মসজিদে সংরক্ষিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, আওলাদে রাসূলদের মধ্যে সর্বপ্রথম দায়িত্ব পালন করেন হযরত সাইয়্যেদ আব্দুল্লাহ মিরদাদ (র.)। ছয় প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে মসজিদে খতিবের দায়িত্বে আছেন সাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী আল মাদানি।

তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০১ সাল থেকে ২৪ বছর ধরে এখানে আয়োজন করা হচ্ছে ধনি-গরিবের বৈষম্যহীন সুবিশাল ইফতার আয়োজন। বর্তমানে রমজানের শেষ দশকে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার রোজাদারের ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে। ধনি-গরিবের বৈষম্যহীন ইফতারে নগরীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। সেখানে সৃষ্টি হয় সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য পরিবেশ। এ মসজিদটি কেন্দ্র করে প্রকাশ পায় এ অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আবেগ-ভালোবাসা।

মুসলমানদের চট্টগ্রাম বিজয়ের এ স্মৃতিচিহ্ন মসজিদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ধসে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে। প্রায় দশ বছর ধরে বন্ধ আছে মসজিদের ওই অংশের নামাজ আদায়। বর্ষাকালে মসজিদটির মূল অংশে পানি ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপরও নানা কারণে থমকে আছে মসজিদটির সংস্কারকাজ।

চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সদস্য মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন বলেন, ‘এত পুরোনো ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় মসজিদের উন্নয়ন হচ্ছে না, এটা চট্টগ্রামবাসীর জন্য আক্ষেপের বিষয়। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদকে প্রত্ন আইনে সংস্কার করে প্রত্নসম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করে এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশ্ব ইতিহাসে তুলে ধরা সময়ের দাবি।’

পূর্বের খবরবিএনপির ৮০ শতাংশ নেতা-কর্মী নির্যাতনের শিকারঃ মির্জা ফখরুল
পরবর্তি খবরচট্টগ্রামে জুতার কারখানায় আগুন