মুক্ত গণমাধ্যম সূচকঃ নিপীড়নমূলক আইন আর রাজনীতির কারণে শেষ কুড়িতে বাংলাদেশ

179

মুক্ত সাংবাদিকতা সূচকে বাংলাদেশের আরো অবনতি হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আএসএফ)এর বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশ আরো ২ ধাপ পিছিয়েছে। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৬৫ তম। ১ বছর আগে ছিল ১৬৩ তম।

 

No description available.

 

নিউজ২১ডেস্কঃ বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করছে, এমন সংগঠন রিপোর্টার সঁ ফ্রঁতিইয়ে (আরএসএফ) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যাদের নিশ্চিত করার কথা, সেই রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষই প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরএসএফ-এর বার্ষিক প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স বা মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে দেখা গেছে, যে পাঁচটি বিষয়ের উপর সূচক তৈরি করা হয়, তার মধ্যে রাজনৈতিক সূচকের সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে – সারা বিশ্বে গড়ে ৭.৬ পয়েন্ট।

“রাষ্ট্র এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ক্রমশ সীমিত ভূমিকা পালন করছে,” আরএসএফ-এর সম্পাদকীয় পরিচালক অ্যান বোকান্দে বলেন। “অথচ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগের জন্য সাংবাদিকতা, প্রকৃত অর্থে যেটা সাংবাদিকতা, সেটা একটি প্রয়োজনীয় শর্ত।”

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ)-এর হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের অবস্থা আফগানিস্তানের চেয়েও খারাপ; এই সূচকে গেল ১৫ বছরে বাংলাদেশের ৪৪ ধাপ অবনতি হয়েছে।

 

বাংলাদেশ নিম্নমুখি

 

আরএসএফের হুঁশিয়ারির প্রতিফলন দেখা গেছে বাংলাদেশের অবস্থানে, যা আরও এক ধাপ নিচে গেছে। গত বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৩ কিন্তু ২০২৪ সালে সেটা ১৬৫-তে দাঁড়িয়েছে।

আরএসএফ-এর বার্ষিক সূচক অনুযায়ী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিশ্বের যে ২০টি দেশে সব চেয়ে খারাপ, তার মধ্যে একটি বাংলাদেশ। তার উপরেই আছে আযেরবাইজান, নিকারাগুয়া আর রাশিয়া। বাংলাদেশের ঠিক নিচে অবস্থান করছে সৌদি আরব, বেলারুশ আর কিউবা।

প্যারিস-ভিত্তিক সংস্থাটি প্রতিটি দেশের পাঁচটি বিষয়ের উপর নির্দেশক তৈরি করে – রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইন প্রণয়ন, সামাজিক এবং নিরাপত্তা। এই পাঁচটি বিষয়ে অগ্রগতি বা নিম্নগতির ভিত্তিতে দেশের সার্বিক সূচক তৈরি করা হয়।

 

সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধের দাবীতে ঢাকায় বিক্ষোভ। ফাইল ফটো।
সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধের দাবীতে ঢাকায় বিক্ষোভ। ফাইল ফটো।

আওয়ামী লীগ ও মিডিয়া

 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে রাজনৈতিক সূচক প্রায় ২০ পয়েন্ট কমে ১৯.৩৬ এ দাঁড়িয়েছে। তালিকার শীর্ষে নরওয়ে-এর রাজনৈতিক সূচক ৯৪.৮৭।

“বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের সরকার মিডিয়াকে যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার কোন ব্যতিক্রম নয়,” আরএসএফ-এর রিপোর্টে বলা হয়।

“তাঁর দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা প্রায়ই তাদের অপ্রিয় সাংবাদিকদের সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করেন। কোন কোন সাংবাদিকের মুখ বন্ধ করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে আইনগত হয়রানি চালনো হয় অথবা তাদের সংবাদ মাধ্যম বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়।

“এ’ধরনের বিরূপ পরিবেশে সম্পাদকরা সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং সরকারের বক্তব্য চ্যালেঞ্জ করা থেকে বিরত থাকেন,” রিপোর্টে বলা হয়।

 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

 

বাংলাদেশে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরও অবনতি দেখা গেছে – ২০২৩ সালের ৩৫.২২ পয়েন্ট থেকে নেমে ২০২৪ সালে ৩১.৩২।

“ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা ডিএসএ সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বে সবচেয়ে কঠোর আইনের মধ্যে অন্যতম। এই আইন কোন পরওয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার বা তল্লাশি এবং যে কোন কারণে সাংবাদিকের সূত্রের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা অনুমোদন করে,” রিপোর্টে বলা হয়েছে। “এ’ধরনের আইনগত পরিবেশে, সম্পাদকরা নিয়মিত নিজেদের সেন্সর করেন।”

 

বাংলাদেশের ঢাকার একটি আদালতের বাইরে কার্যক্রম কভার করছেন সাংবাদিকরা। ৩ মে, ২০১৬। (ফাইল ফটো)
বাংলাদেশের ১টি আদালতের বাইরে কার্যক্রম কভার করছেন সাংবাদিকরা।

মিডিয়া মালিক ব্যবসায়ী

 

অর্থনৈতিক সুচকে বাংলাদেশ ৩৬.১১ থেকে ২৭.৮৩ পয়েন্টে নেমেছে। তালিকার শীর্ষে নরওয়ের অর্থনৈতিক সূচক ৮৯.৮৪।

কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন জন্ম দিয়েছে নতুন এক ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর, যারা গণমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

“বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাঝে যেসব বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান উঠে এসেছে, তারা দেশের বেশির ভাগ ব্যক্তিমালিকানাধীন মিডিয়ার মালিক,” আরএসএফ বলছে।

“তারা মিডিয়াকে নিজেদের প্রভাব এবং মুনাফা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখে, এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে সরকারের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখাকে অগ্রাধিকার দেয়।”

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উন্নতির তেমন লক্ষণ নেই, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় দুই পয়েন্ট কমে ২০২৪-এ দাঁড়িয়েছে ২৭.০৬। তবে সার্বিক ভাবে নিরাপত্তার অবস্থা বোঝা যায় তালিকার শীর্ষে থাকা নরওয়ের সাথে তুলনা করলে – যার পয়েন্ট সংখ্যা ৯৪.৯৭।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি

 

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর হিসাবে গত বছর বাংলাদেশে ৩৬৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। হত্যার শিকার হয়েছেন দুইজন। এ ছাড়া ৫৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১১ জন। দেশের ১২টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের তথ্য অনুসন্ধানী ইউনিটের তথ্যের ভিত্তিতে তারা ওই তথ্য প্রকাশ করে।

আর আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, ২০২৩ সালে ২৯০ সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। নির্যাতনের শিকার এ সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৮ সংবাদকর্মী। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারির মাধ্যমে লাঞ্চিত ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় বাধা প্রদানের শিকার হয়েছেন ২২ সাংবাদিক।

আরএসএফ বলছে, “বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা ডিএসএ সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বে সবচেয়ে কঠোর আইনের মধ্যে অন্যতম। এই আইন কোনো পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার বা তল্লাশি এবং যে কোনো কারণে সাংবাদিকের সূত্রের গোপনীয়তা লঙ্ঘন অনুমোদন করে৷”

“এই ধরনের আইনগত পরিবেশে, সম্পাদকরা নিয়মিত নিজেদের সেন্সর করেন,” বলছে আরএসএফ। আর গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৪৫১ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)-তে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯৭ জনকে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক  ড.আলী রীয়াজ ‘দ্য অর্ডিল: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পাঁচ বছর’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে  গত মঙ্গলবার এমন তথ্য তুলে ধরেন। তিনি ওয়েবিনারের মাধ্যমে তুলে ধরা এই গবেষণা পত্রে বলেন, “তাদের মধ্যে ২৫৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের লেখা রিপোর্টের জন্য। আর গ্রেপ্তার হওয়া ৯৭ জন সাংবাদিকের মধ্যে  ৫০ জন স্থানীয় সাংবাদিক (জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের)।”

 

বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার ‘প্রতিপক্ষ’

 

২০২০ সালের এপ্রিলে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে সেই সময়ের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভিনের নির্দেশে মাদক দিয়ে আটক করে নির্যাতন ও ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে শাস্তি দেয়া হয়। তার ‘অপরাধ’ ছিল জেলা প্রশাসক সরকারি টাকায়  সরকারি পুকুর সংস্কার করে নিজের নামে ‘সুলতানা সরোবর’ নাম দিয়েছেন- এমন একটি প্রতিবেদন করা।  আরিফুলকে সাজা দেয়ার খবরে তখন সারাদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে আরিফুল জেলা প্রশাসক সুলতানাসহ প্রশাসনের চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। আরিফুল জানান, “আমি যে মামলা করেছি তার এখন পর্যন্ত তদন্তই শেষ হয়নি। তারা ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়ার পরও কখনোই আদালতে হাজির হননি এবং জামিন নেননি। উল্টো তাদের সবার পদোন্নতি হয়েছে। তারা প্রশাসনে এখনো চাকরি করছেন।”

যারা তথ্য গোপন করতে চায়, তারাই প্রধান বাধা: বুলবুল

তার মতে,” দেশের জেলা ও থানা পর্যায়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে প্রধান বাধা পুলিশ ও প্রশাসন। নানা আইনে মামলা করে সাংবাদিকদের  হয়রানি করা হয়। মালিক পক্ষও সাংবাদিকদের পক্ষে দুই-একটি ব্যাতিক্রম ছাড়া অবস্থান নেন না। আর সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো রাজনৈকিভাবেক বিভক্ত হয়ে তাদের ব্যক্তি স্বার্থে কাজ করে, সাংবাদিকদের জন্য নয়।”

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)-র সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল মনে করেন,” যারা তথ্য গোপন করতে চায়, তারাই স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে প্রধান বাধা। তারা সরকার হতে পারে, রাজনৈতিক দল হতে পারে, কর্পোরেট হাউজ হতে পারে, সরকারি কর্মকর্তা হতে পারে। আরেকটি হলো তার চাকরির নিরাপত্তা। তৃতীয়ত হলে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলেই স্পষ্ট হবে কারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা।”

বিএফইউজের মহাসচিব দীপ আজাদ বলেন, “কোনো সরকার, সেটা যে-কোনো দেশেই হোক তারা যে সাংবাদিকবান্ধব হবে তা আমি মনে করি না। আর সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে দুঃস্থ সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তা করেও সাংবাদিকবান্ধব হওয়া যায় না। সুস্থ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য সরকার কী করছে সেটাই সরকার স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে কিনা তার মাপকাঠি।”

তার কথা,” সাংবাদিকদের ইউনিয়গুলো  রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হওয়ার কারণে সাংবাদিকরাই আবার অনেক তথ্য প্রকাশ করে না। যে কথা বলা দরকার তা বলে না। আর যারা সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ তারাও এর সুযোগ নেয়।”

মনবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ফারুক ফসাল বলেন,” বাংলাদেশে এখন মুক্ত গণমাধ্যমের পথে প্রধান অন্তরায় সরকার। তারপরে সরকারে প্রনয়ণ করা নানা ধরনের আইন। তৃতীয় হলো সংবাদমাধ্যমের কর্পোারেট মালিকানা। ”

তার কথা, ” সাংবাদিকরা এখন ভীতার সাংস্কৃতির শিকার। এই কারণে তারা ভয়ে অনেক কিছু প্রকাশ করেন না। আবার এখন দলীয় লেজুড়বৃত্তি করা সাংবাদিকও আছেন। তারা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিপক্ষে কাজ করেন। আবার সংবাদমাধ্যমের মালিকরা সাংবাদিকদের ঠিকমতো বেতন দেন না । ফলে কোনো সাংবাদিক অর্থনৈতিক অসততায় জড়িয়ে পড়েন। এটাও স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষতি করে।”

তবে আজকের পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান মনে করেন,” বাংলাদেশে যে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, তা কিন্তু মনে হয় না। তবে এখানে এক ধরনের সেল্ফ সেন্সরশিপ কাজ করছে।  আরপরও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সেই মানদণ্ডে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। কিন্তু তারা যে প্যারামিটারের ভিত্তিতে এটা করে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।”

মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, “এই সময়ের কথা বললে যে স্বাধীনতা আছে তা সংবাদমাধ্যমের মালিকদেরই স্বাধীনতা। এখন মালিকরা মনে করেন, আমি কিছু সাংবাদিক নিয়োগ করবো এবং তারা আমার ভাষায় কথা বলবেন। আগে সরকার বলেন, ক্ষমতাধর বলেন, তারা পেশাদার সাংবাদিকদের সাথেই সব বিষয়ে কথা বলতেন। এখন মালিকদের সঙ্গেই যোগাযোগ করে। আগে পেশাদার সম্পাদক ছিলেন। মালিক বিনিয়োগ করতেন। এখন মালিকরা যেমন সম্পাদক হন, তেমনি সম্পাদকরাও মালিকানার অংশীদার। ফলে মালিক সম্পাদক এক হয়ে গেছেন। সাংবাদিকের স্বাধীনতা নাই।”

প্রতিবেদনেও ভুল আছে: আরাফাত

দীপ আজাদ বলেন,” এখন মালিকরা সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেন  তার আর ১০টা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ছাতা হিসেবে। তারা গণমাধ্যমকে আলাদা পেশাদার ব্যবসা হিসাবে দেখেন না। ফলে তারা তাদের স্বার্থে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করেন।” “শুধু যে সরকারের চাপ তা নয়, যারা নিউজ ম্যানেজার তাদের এখন নানা ধরনের যোগাযোগ থাকে, স্বার্থ থাকে। ফলে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে,” বলেন তিনি।

আর ফারুক ফয়সাল বলেন,”এখানে যা পরিস্থিতি, তাতে এখন আর সাংবাদিকের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। যা আছে তা হলো মালিকের স্বাধীনতা, প্রকাশকের স্বাধীনতা এবং সরকার ও সরকারি দলের স্বাধীনতা।”

অধ্যাপক গেলাম রহমান মনে করেন,” স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে যে বাধা-বিপত্তি, তার চেয়ে সংবাদমাধ্যমের ম্যানেজার, পরিচালক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিকদের মনোভাবের কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়।”

সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু মনে করেন,” নানা কমতি , ঘাটতি, আইন০কানুনের কিছু অপব্যবহার, অপপ্রয়োগের পরেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম কাজ চলার মতো স্বাধীনতা ভোগ করছে।” তার কথা, “যদি স্বাধীন গণমাধ্যম যে-কোনো ধরনের আক্রমণের মুখে পড়ে, সেটা রাষ্ট্রের দিক থেকে হোক, আইনের দিক থেকে হোক, কার্পোরেট গ্রুপের দিক থেকে হোক, তার আমি অবসান চাই। তবে গণমাধ্যমের সূচক যারা প্রকাশ করে, তাদের স্বচ্ছতা ও যথার্থতা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। আমি তথ্যমন্ত্রী থাকাকালে দেখেছি তারা একপেশে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।”  তিনি মনে করেন, “বাংলাদেশে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা বিষয়ে সংবাদমাধ্যম তথ্য প্রকাশ করে, করতে পারে। তবে কর্পোরেট পুঁজির সংবাদপত্র মালিকরাই তাদের স্বার্থে সাংবাদিকদের তথ্য প্রকাশ করতে দেন না। তাদের মালিকরা ঠিকমতো বেতন না দেয়ায় কিছু সাংবাদিকের নৈতিক বিচ্যুতি ঘটে।”

আর তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ডয়চে ভেলেকে বলেন,”ওরা যে সূচক তৈরি করে, তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। ওরা ভুল তথ্য ও ম্যাথোডলজি দিয়ে সূচক তৈরি করে। তারা যে ভুল তথ্য দেয়, তার প্রমাণ আমরা দিয়েছি। গত বছর ওরা বলেছে বাংলাদেশে ছয়জন আটক হয়েছে তা ভুল ছিল। আমরা তথ্য দেয়ার পর তারা সেই তথ্য সরিয়ে ফেলে।  এবারের প্রতিবেদনেও ভুল আছে আমরা তা জানাবো।”

তার কথা, “আগের তুলনায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অবস্থা অনেক ভালো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে মুক্ত করে রেখেছেন। যে কারণে বাংলাদেশে এত গণমাধ্যম। গণতন্ত্রের সূচকে মরিশাশ কিন্তু অনেক উপরে। কিন্তু সেখানে একটি সরকারি গণমাধ্যম ছাড়া আর কোনো গণমাধ্যমই নেই। ভুটানেও তিনটি গণমাধ্যম। অথচ এখানে অনেক প্রাইভেট গণমাধ্যম। সরকারের নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা থাকলে তো এত গণমাধ্যমের অনুমতি দিতো না।” তিনি বলেন, “এখানে একটা সিন্ডিকেট আছে। যারা ভুল ও মিথ্যা তথ্য পাঠায়, তার ভিত্তিতে ওরা প্রতিবেদন তৈরি করে।”

Bangladesch | Protets vor Nationalem Presseclub in Dhaka

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা : সূচকেও পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত

 

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে৷ সাংবাদিকদের ওপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ আছে, সংবাদ প্রকাশের কারণে অনেকে হামলা ও ফৌজদারি মামলার শিকার হচ্ছেন৷ বাংলাদেশে দমনের রাজনীতি ও সাংবাদিকতা প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, একটি গণতান্ত্রিক দেশের মহা গুরুত্বপূর্ণ উপযোগ৷ অথচ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে যা দেখছি সেটা বলা বা প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার স্বাধীনতা আসলেই আছে কী? কিংবা এভাবেও বলা যায়, কখনো ছিল কী?

 

হুমকির মুখে নারী সাংবাদিক

 

কিন্তু এই দৃশ্যত উন্নয়নশীল নিরাপত্তা পরিবেশ সাংবাদিকদের রক্ষা করছে না। তারা পুলিশ, রাজনৈতিক কর্মী, জিহাদি সংগঠন এবং অপরাধ চক্রের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন প্রতি নিয়ত।

কিন্তু, আরএসএফ বলছে, “বাংলাদেশের সাংবাদিকরা আরও বেশি দুর্বল এবং অসহায়, কারণ তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার কোন বিচার হয় না।”

নারী সাংবাদিকরা বিশেষভাবে হুমকির মুখে।

“যে পেশা এখনো পুরুষতান্ত্রিক, সেখানে নারী সাংবাদিকদের বহু পুরনো হয়রানির সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তারা যখন নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে তখন তাদের অনলাইনে নোংরা প্রচারণার কবলে পড়তে হয়,” রিপোর্টে বলা হয়েছে।

 

লেবাননে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে নিহত রয়টার্স-এর সাংবাদিক ইসাম আব্দাল্লাহ'র বোন আবির (মাঝে) তাঁর ভাইয়ের জানাজায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। আরএসএফ বলে, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করেই গোলাবর্ষণ করা হয়েছিল। ফটোঃ ১৪ অক্টোবর, ২০২৩।
লেবাননে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে নিহত রয়টার্স-এর সাংবাদিক ইসাম আব্দাল্লাহ’র বোন আবির (মাঝে) তাঁর ভাইয়ের জানাজায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। আরএসএফ বলে, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করেই গোলাবর্ষণ করা হয়েছিল।

 

গাজায় সাংবাদিক হত্যা

 

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিষ্কার অভাব ছিল বলে আরএসএফ মনে করছে।

“গত বছরের অক্টোবরের পর থেকে, গাজার যুদ্ধে সাংবাদিক এবং মিডিয়ার বিরুদ্ধে রেকর্ড সংখ্যক সহিংসতা হয়েছে,” রিপোর্টে বলা হয়েছে।

“ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে ১০০র বেশি ফিলিস্তিনি রিপোর্টার নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ২২জন মারা গেছেন তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময়।”

আরএসএফ-এর ২০২৩ সূচকের প্রথম ১০টি দেশ ইউরোপীয় মহাদেশের, যার মধ্যে নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস আর ফিনল্যান্ড রয়েছে শীর্ষ ৫ স্থানে।

সূচকের অপর প্রান্তে, ইরান, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান, সিরিয়া আর এরিত্রিয়া রয়েছে শেষ পাঁচটি স্থানে।

পূর্বের খবরজয়দেবপুর জংশনের স্টেশন মাস্টারসহ তিনজন বরখাস্ত
পরবর্তি খবরদেশের অধিকাংশ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই, নষ্ট হচ্ছে ওষুধের মান