বিএনপি কেন নির্বাচনের আগমুহূর্তে অনিশ্চয়তার মুখে?

251

অনলাইন ডেস্ক:

বিএনপি চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হৃদপিণ্ড, যকৃত এবং ফুসফুস-সম্পর্কিত গুরুতর জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে লড়াই করছেন। চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা থেকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে দলের কার্যত নেতা, তার ছেলে তারেক রহমান— হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার ফিরে আসার প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও— স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়ে গেছেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্ব সংকট আসন্ন ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে দলটির সুবিধা ম্লান করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি আছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিযোগিতায় থাকা সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কারণ দলটির শীর্ষ দুই ব্যক্তিত্বের একজন মারাত্মক অসুস্থ আর অপরজন বিদেশে আটকে আছেন।

 

 

 

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, নেতৃত্বের এই শূন্যতা বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোতে এর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারে। প্রতিযোগিতা থেকে হাসিনার আওয়ামী লীগের বাদ পড়ার মাধ্যমে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, দলটির তা কাজে লাগানোর ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। তারেক রহমানের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে ক্ষতিকর কারণ তিনি দলের মূল সমর্থকদেরকে চাঙ্গা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে থাকেন।

 

 

 

ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “তার মা যখন অসুস্থ তখন তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফিরে আসার এর চেয়ে ভালো সময় আর কী হতে পারত।” তিনি উল্লেখ করেন যে, তাকে মিডিয়া সাক্ষাৎকারেও বিশেষভাবে দেখা যায়নি।

 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত আগস্টে তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফিরে আসার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কারণ আগের প্রশাসনের দায়ের করা দুর্নীতির মামলাগুলো বাতিল হয়ে গেছে। যার ফলে তার দেশের ফিরে আসার আগের বাধাগুলো দূর হয়েছে।

 

 

 

৬০ বছর বয়সী বিএনপির এই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ২০০৮ সাল থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনে আছেন। তিনি বলেছেন, ফিরে আসার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরিভাবে তার নিজের নয় এবং এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। তবে, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, তার ফিরে আসায় তাদের কোনো আপত্তি নেই।

 

দত্ত বলেন, “বিএনপির বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে শক্ত ঘাঁটি রয়েছে এবং তার দেশে ফেরা ভোটের হারে পার্থক্য গড়ে দিত। তিনি একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা।”

 

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা অসম্ভব ছিল। কারণ এর অর্থ হবে নির্বাচনে টিকে থাকা একমাত্র মূলধারার দলটিকে কার্যত বাদ দেওয়া।

 

প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে আশা করা প্রধান দলগুলো হলো বিএনপি, ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মাধ্যমে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবং ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপির মূলত হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা বিক্ষোভে সহায়ক ভূমিকা পালনকারী ছাত্রদের মাঝে সমর্থন রয়েছে। তাদের ভোটারদের মধ্যে তেমন বিস্তৃত ভিত্তি নেই। অন্যদিকে জামায়াতেরও সীমিত সংখ্যক অনুসারী রয়েছে।

 

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনকে রমজান মাসের আগে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, ভোট আয়োজনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে।

 

সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলি নিয়ে জনমত নেওয়া হবে, যার মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্য মেয়াদের সীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে বিষয়ক লন্ডনের লেখক প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেন, হাসিনার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকা সত্ত্বেও তারেক রহমানের বাংলাদেশে ফিরে আসতে অনিচ্ছা রহস্যজনক।

 

“এর মানে কি এই যে তিনি এখনও ভয় পাচ্ছেন যে বাংলাদেশে ফিরলে তাকে গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে?”

দেবসরকার বলেন, বিএনপির এমন একজন বিশিষ্ট নেতার অনুপস্থিতি এই প্রশ্ন তুলেছে যে, জামায়াত বা এনসিপি কি বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়কেই ছাড়িয়ে যাবে কিনা।

 

 

হাসিনার আওয়ামী লীগকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। তবে দলটি বিক্ষোভ করার এবং নির্বাচন রুখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

 

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনে কোনো সম্ভাব্য বিলম্ব আওয়ামী লীগের জন্য সহায়ক হতে পারে এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের উপর চাপ দেওয়ার উপায় ও মাধ্যম খুঁজে বের করতে তাদের আরও সময় দিতে পারে।

রাজনৈতিক পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের একটি বিশেষ আদালত গত মাসের শেষে অবৈধ জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে ব্রিটিশ সংসদ সদস্য টিউলিপ সিদ্দিককে তার অনুপস্থিতিতে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।

 

তাকে ৮২০ মার্কিন ডলার জরিমানা করারও আদেশ দেওয়া হয়েছে, যা দিতে ব্যর্থ হলে তার কারাদণ্ডের মেয়াদে আরও ছয় মাস যোগ করা হবে। একই মামলায় সিদ্দিকের খালা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে পাঁচ বছর এবং তার মা ও হাসিনার বোন শেখ রেহানাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

 

এর আগে, একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র বিক্ষোভকারীদের উপর নৃশংসতার জন্য হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।দেবসরকার বলেন, এই রায়গুলি ছাত্র নেতাদের কাছে আবেদনময়ী হতে পারে। অন্যদিকে টিউলিপের বিরুদ্ধে রায় তার যেকোনো সম্ভাব্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জকে প্রতিহত করতে সাহায্য করতে পারে।

পূর্বের খবরইসলামী আন্দোলন ছেড়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন মুফতি হাবিবুর রহমান
পরবর্তি খবর‘বাংলাদেশ সীমান্তে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি হচ্ছে’, বিএসএফকে মমতা