প্রতিহিংসা নয়; রাজনৈতিক পরিবেশ হোক সম্প্রীতির –রোদেলা নীলা

341

ঢাকাঃ যুগে যুগে প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক দেশে ভিন্ন মতের জনগণ থাকবে, তাদের চাওয়া গুলো ভিন্ন হবে কিংবা ক্ষমতায় গিয়ে নিজের আসন পোক্ত করবার জন্যে বিরোধী দল সৃষ্টি করবে। সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে এই দু’টো মতামতকে পাশাপাশি প্রাধান্য দিয়ে একটি স্বৈরাচার বিরোধী রাষ্ট্র তৈরি হবার কথা থাকলেও বিগত প্রায় ষোল বছর বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামীলিগের মতো বড় দলের ভয়াবহ আগ্রাসন দেখে এসেছে। পরপর চারবার ভোট নাটক মঞ্চস্থ করে সেই ফ্যাসিবাদীরা সরকার গঠন করেছেন এবং তাদের মুখ্য রানী হয়েছেন শেখ হাসিনা, এই বিষয়টি সবারই জানা। সে সময় মানুষের বাক স্বাধীনতার ওপর এতোটাই খড়গ চলছিলো যে আওয়ামী সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবেন বা লিখবেন তেমন ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিক – ব্লগার অথবা সাধারণ মানুষ, পরিনতিতে নিশ্চিত মৃত্যু অথবা জেলে বসে নিজের নিঃশ্বাসের আওয়াজ গোনা ছাড়া বিকল্প কিছু ছিলো না।  যখন তখন বেগম খালেদা জিয়া এবং ডক্টর ইউনুসকে টুপ করে পদ্মা সেতুতে ফেলে দেবার ইচ্ছের কথা শেখ হাসিনা প্রায়ই বলতেন, এতোটাই প্রতিহিংসায় মেতে উঠেছিলেন তিনি। চারপাশে উস্কানীদাতা ছিলেন জনা কয়েক তেলবাজেরা, আওয়ামী নেতারা এবং কতিপয় অভিনয় শিল্পীরা; তোষামোদ করতে করতে জননেত্রী-দেশনেত্রী বলে সম্বোধন করতেন তাকে এবং তিনি দ্বিগুণ আগ্রহ পেতেন; যখন যা মুখে আসতো সেটাই গড়গড় করে ক্যামেরার সামনে বলে যেতেন। তার দাম্ভিকতা , প্রতিহিংসা পরায়ণতা তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলো।

শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে জামাত ইসলামেরর সাথে জোট করে ক্ষমতায় এসেছিলেন এক প্রকার প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়েই, তার বিশ্বাস ছিলো- – বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তার প্রয়াত বাবা শেখ মুজিবকে বেঁচে থাকতে দেন নি। আমরা তখন স্কুলে পড়ি, কোন এক সংবাদ মাধ্যমে পড়েছিলাম, তিনি বলছেন ; যে দেশের মানুষ আমার বাবাকে শান্তিতে বাঁচতে দেয় নি, আমিও তাদের বেঁচে থাকতে দেবো না। কথাটা অনেকটা এরকম ছিলো যে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে সবাইকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়বেন। তার মনের এই অন্ধকার আকাঙ্ক্ষার কথা জেনেও যারা তাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন তারা নিঃসন্দেহে প্রতিহিংসা পরায়ণের দোসর এবং ফ্যাসিবাদের অভিভাবক। ক্ষমতায় আসবার তিন মাসের মাথায় তিনি ভারতের র এর সাথে আতাত করে বাংলাদেশ সেনাবাহীনীর চৌকশ দক্ষ অফিসারদের বাংলাদেশ রাইফেলস ব্যাটালিয়নে একই সাথে পোস্টিং দিয়ে বীভৎসভাবে খুন করালেন এবং সমগ্র দোষ চাপিয়ে দিলেন সৈনিকদের ওপর। ধীরে ধীরে তার প্রতিহিংসার কুৎসিত চেহারা আরো প্রকাশ্য হতে থাকলো, তিন বারের প্রধানমন্ত্রী শহীদ প্রেসিডেন্টের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার সেনাবাহিনীর বাড়ি থেকে রীতিমতো অপমান করে উচ্ছেদ করে দিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের প্রবাস থেকে আনিয়ে ফাঁসি কার্যকর করলেন ,কথিত আছে মধ্যরাতে শেষ হাসিনা মৃতদের লাশের ওপর পা দিয়ে মারাতেন। এতোটাই প্রতিহিংসায় লিপ্ত ছিলেন তিনি।

দিনের পর দিন লেখক সাংবাদিকদের ওপর অত্যাচার বাড়তে থাকলো, নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর রুনি’র হত্যাকান্ডের পেছনে যে সামিট গ্রুপের নাম উচ্চারিত হয় তাদের সাথে আওয়ামীলিগের অনেক বিপথগামী নেতার নাম জড়িত আছে। তাদের দলকে নিয়ে সামান্যতম সমালোচনা করলেই সাথে সাথে তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামক কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো। ২০১৩ সালে মাদ্রাসার ছাত্রদের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে অকথ্য অত্যাচার করে তাদের লাশ গুম করে ফেলা তারই প্রতিহিংসার আর এক রূপ। আওয়ামীলিগের ভাষ্যমতে, কারো কোন বিকল্প মতামত থাকতে পারবে না, তারা যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই সঠিক।

একটি উন্নয়নশীল দেশকে এগিয়ে নেবার জন্যে যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল তার অনেকটাই তারা নিয়েছিলেন বলা যায়, পদ্মা সেতু- এলিভেটর এক্সপ্রেস – মেট্রোরেল, পতেঙ্গা টানেল, এগুলো বাংলাদেশের জন্যে অতি আবশ্যক ছিলো। মানুষ উপকৃত হয়েছে এই ব্যাপারে কোন দ্বিমত  ত্থাকবার কথা না, কিন্তু প্রাসাদের রানী আমি একাই থাকবো আর কেও মাথায় মুকুট পড়তে পারবে না; শেখ হাসিনার এমন ছেলে মানুষী চিন্তাটাই তাকে দিনের পর দিন প্রতিহিংসাপরায়ণ করেছে। তা না হলে একজন শান্তিতে নোবেল জয়ী ডক্টর ইউনুসকে যে সন্মান তিনি দিতে পারতেন সেট না করে তার বিরুদ্ধে কোটি টাকার মামলা করাটা ছিলো বোকামী। বিরোধী দল থেকে শূরু করে অন্যান্য পার্টির সকল নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় পুলিশ করেছে নয়তো আওয়ামীলীগের কোন নেতা, এটা ছিল চোখে লাগার মতো অন্যায়। যতোদূর জানি , বিএনপি বা অন্যান্য সংগঠনের এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর যাকেই আয়নাঘরে রাখা হয়েছে তাদের সাথে শেষ হাসিনা সরকারের ব্যক্তিগত আক্রশ ছিলো অর্থাৎ যতো উন্নয়নমূলক কাজ দেখিয়ে পয়সা কামিয়ে নিক না কেন , তাদের প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক চিন্তা তাদেরকে দিনের পর দিন জনগণের কাছে অসহিষ্ণু করে তুলেছিলো তারই ফলাফল ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট।

সব কিছুর শুরুও যেমন আছে, শেষটাও তেমন আছে। শুরুটা যেহেতু আক্রশ দিয়ে তাই আওয়ামীলীগের সমাপ্তি ঘটেছে জনতার আক্রশের মধ্য দিয়ে। মানুষের প্রতি কথায় কথায় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য বক্তব্য – হেয় করার যে নগ্ন মানসিকতা তারা বছরের পর বছর দেখিয়েছেন তারই বিরুপ প্রভাব পড়েছে সাধারন মানুষের মনে। তাইতো ছাত্রদের কোটা আন্দোলন নিমিষে হয়ে গেল জাতির মুক্তির আন্দোলন, যে স্বাধীনতা আমরা এতো বছর পর নতুন করে পেয়েছি ; সেই স্বাধীনতা কি প্রতিহিংসার জন্যে আবার আমরা হারিয়ে ফেলতে পারি? অবশ্যই না, তাইতো প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শরিফুল আলম যে ডাস্টবিনে ময়লা ফেললেন, যে ডাস্টবিন নিয়ে সমন্বয়ক সারজিস আলম ভিডিওগ্রাফি করলেন সেই শেখ হাসিনার চেহারাযুক্ত ডাস্টবিন অমর একুশে গ্রন্থমেলায় কেন স্থাপন করা হলো সাধারন জনতা হিসেবে আমার প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে। আমরা কি পুনরায় প্রতিহিংসার রাজনীতির বীজ বপন করছি? আমরা কি আবার একজন আর একজনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অন্ধ অহংকার দেখানোর চেষ্টা করছি? আমরা কি ভুলে গেছি – কোটি মানুষ যদি বিরক্ত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে তাহলে যে কোন সরকারের চেয়ার নড়ে যেতে বাধ্য? মানুষ এক হয়ে রাস্তায় নেমে এলে বর্তমান অস্থায়ী সরকার টিকিয়ে রাখাও কঠিন হবে।

মোদ্দা কথা, সকল রাজনৈতিক দলকে বিগত সরকারের ন্যাক্কারজনক পতন থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। যথেচ্ছা করে কখনো বাংলাদেশে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না , জনগণের সাথে সরাসরি সম্প্রীতির বন্ধন রচনা করে রাখাটা খুবই গুরত্বপূর্ণ। যতো উন্নয়নমুলক কাজ হোক, বেলা শেষে নিজেদের অবস্থান নিয়ে দম্ভ করলে সেই অহংকারের আগু্নে নিজেরাই পুড়ে মরতে বাধ্য। সাধারন মানুষের কথা শোনা, তাদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপটুকু নিয়ে নিলে অন্তত তাদের আস্থার জায়গাটাতো পাওয়া যাবে। পৃথিবীর কোন দেশই জনতার ইচ্ছেয় চলে না, রাষ্ট্র পরিষদের সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত হয়, তবে তাদের মতামত না দিতে দেওয়াটা হবে বড় বোকামী। আর সেই বোকামীটা পরিবর্তী নির্বাচির সরকার করবেন না সেটাই প্রত্যাশা। পরিশেষে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় বলতে চাই-

কুকুর আসিয়া এমন কামড়

দিলো পথিকের পায় ,

তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে

মানুষের শোভা পায়?

মানুষ কুকুর হবে নাকি মানুষ

সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসে গেছে।।

 

 

পূর্বের খবরএনসিপি মধ্যপন্থার দল হতে চায়, দাবি ও বাস্তবতার মিল কতটা?
পরবর্তি খবরবিএনপি কি সঠিক পথে এগুচ্ছে!