অভিযান চলবে: এস এম মেহেদী
ভুয়া স্টিকারের দৌরাত্ম:
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একটি মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে। নাটোর জেলার সিংড়া থানার লালোর বাজার এলাকা থেকে দুইটি গাড়িসহ তিনজনকে আটকের পর তাদের কাছ থেকে ২০০ কেজির বেশি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। আর গাড়ি দুইটিতে লাগানো ছিলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার। ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন রাজশাহী বিভাগীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গেয়েন্দা বিভাগের উপ পরিচালক মোহা. জিললুর রহমান। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমরা অভিযানের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ও গাড়ির প্রটোকল, লাইট দেখে কিছুটা ইতস্তত করছিলাম। তারা আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে যাওয়ারও চেষ্টা করে । কিন্তু আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকায় তাদের আটক করে গাঁজা উদ্ধার করতে পারি।”
তার কথা, “শুধু ২০২৩ সালেই আমরা গোয়েন্দা দপ্তর থেকে এক হাজার ৩৫৩ কেজি গাঁজা আটক করেছি। ৪৫০টি মামলার অনেকগুলোতেই অপারাধীরা পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ব্যবহার করেছে। মাদক বহনকারী এমন গাড়িও পেয়েছি যাতে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহার করা স্টিকার ছিলো। গাড়িতে ফ্লাগ স্ট্যান্ডও ছিলো। সাংবাদিক লেখা গাড়িও আমরা পেয়েছি। আমরা সাধারণত সরকারি বা সাংবাদিক লেখা স্টিকার দেখলে সন্দেহ করি না, ছাড় দেই। সেই সুযোগ নেয় অপরাধীরা।”
সাংবাদিক, এমনকি সংবাদ মাধ্যমের নাম লেখা স্টিকার গাড়িতে লাগিয়েও মাদক পাচারের অনেক ঘটনা ঘটছে। ঘটছে পুলিশ ও ডিবি লেখা স্টিকার লাগিয়ে অপরাধ। এই সব ঘটনা বেশি ঘটছে মাদক চোরাচালানের রুট বিশেষ করে সীমান্তের জেলাগুলোতে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এলাকায় টিভি চ্যানেলের স্টিকার লাগিয়ে মাদক চোরাচালানের অনেক ঘটনা গত কয়েক বছরে ধরা পড়েছে। ২০১৯ সালে সীতাকুণ্ড এলাকায় গাড়িতে “গাজী টেলিভিশনের” স্টিকার লাগিয়ে এক হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা পাচারের সময় চার ইয়াবা পাচারকারী আটক হয়।
কিছুটা ইতস্তত করছিলাম: জিললুর
স্টিকারের নিয়ম কী?
গাড়িতে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে স্টিকার ব্যবহারের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই বলে জানান ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার এস এম মেহেদী হাসান। তিনি বলেন,”ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড ব্যবহারের নীতিমালা আছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ির কাগজপত্র যেহেতু গাড়িতে থাকে না, অফিসে থাকে তাই স্টিকার ব্যবহার করা হয়। আর চালকের পরিচয়পত্র থাকে। তবে পেশাগত নিরাপত্তা ও সহযোগিতার জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে স্টিকার ব্যবহারে চল আছে। যেমন সাংবাদিকেরা ব্যবহার করেন।”
তার কথা, “তবে এগুলো ব্যক্তিগত হতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের হতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে স্টিকার থাকতে পারে। কিন্তু কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত গাড়িতে স্টিকার থাকতে পারেনা। তেমনি সংবাদ মাধ্যমের কাজে ব্যবহৃত গড়ির স্টিকার থাকতে পারে। কিন্তু একজন সাংবাদিক তার পরিবারের ব্যবহৃত গাড়িতে তো স্টিকার ব্যবহার করতে পারেন না।”
তার মতে,”স্পর্শকাতর পেশার ব্যক্তিরা যদি ব্যক্তিগত গাড়িতে স্টিকার ব্যবহার করেন তাহলে ট্রাফিক পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সমস্যা হয়। আইনের প্রয়োগে সমস্যা হয়।”
গোয়েন্দা বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান বলেন,”এখন দেখছি ‘জরুরি রপ্তানি কাজে ব্যবহৃত’ স্টিকার গাড়িতে লাগিয়ে চোরাচালান হয়। আর অনেকেই আত্মীয় স্বজনকেও গাড়ির স্টিকার দেন। এক প্রতিষ্ঠানের স্টিকার সুবিধা নেয়ার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে লাগানো হয়।”
তিনি বলেন,”স্টিকারের প্রাধিকার থাকতে পারে। কিন্তু সেটারও নীতিমালা থাকা প্রয়োজন । সেটা না থাকায় এটার অপব্যবহার হচ্ছে। ভুয়া স্টিকার ব্যবহার করে অপরাধ হচ্ছে।”
রাজশাহী বিভাগীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গেয়েন্দা বিভাগের উপ পরিচালক মোহা. জিললুর রহমান। বলেন,”স্টিকার ব্যবহারের নীতিমালা না থাকায় আমরা বিভ্রান্ত হই। এই নীতিমালা থাকা উচিত।”
আগে সচিবালয় থেকে গাড়ির স্টিকার দেয়া হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তা বন্ধ রয়েছে। সাংবাদিকসহ যারা সচিবালয়ে প্রবেশের স্থায়ী কার্ড পেতেন তাদের গাড়ির স্টিকার দেয়া হতো। এখন নির্বাচন কমিশন ভোটের সময় সাংবাদিক এবং ভোটের কাজে নিয়োজিতদের গাড়ির স্টিকার দেয়।
মেহেদী হাসান বলেন, “এই অভিযানের অভিজ্ঞতায় আমরা গাড়ির স্টিকারের ব্যাপারে একটি নীতিমালা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব করব।”
আর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী বলেন,”সাংবাদিকসহ সরকারি বেসরকারি যাদেরই পেশাগত কাজে গাড়ির স্টিকার প্রয়োজন তাদের সেটা ব্যবহার করার অধিকার আছে। কিন্তু যারা সাংবাদিক নন, তারা যেন এটা ব্যবহার করতে না পারেন তার ব্যবস্থা করা দরকার। আর এই স্টিকার ব্যক্তিগত নয় প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া দরকার। সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধ করা উচিত।”





