গত বছরের ২৯ মে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করেছিল শান্তি স্থাপন কমিটির আহ্বায়ক ও বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা’র নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের কমিটি। ক্য শৈ হ্লা ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমরা তাদের এই আচরণে হতাশ। তারা কেন সমঝোতা ভঙ্গ করলো তা আমরা বুঝতে পারছি না। ব্যাংকে হামলার পর আমরা তাদের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা ও সমঝোতা স্থগিত করেছি।”
আর শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির মুখপাত্র এবং কমিটির সদস্য সচিব কাঞ্চন জয় ত্যাংচঙ্গা বলেন, “আমরা গত বছরের ৫ মে প্রথম বৈঠক করি। এরপর গত মাসের ৫ তারিখে আরো একটি বৈঠক হয়। তাদের মধ্যে কোনো অসন্তোষ তখন দেখিনি। আর চলতি মাসের ২০ তারিখে আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।”
তিনি বলেন, চার দফা সমঝোতার মূল বিষয় ছিল চাঁদাবাজি ও আক্রমণ না করা, শান্তি বজায় রাখা ইত্যাদি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরাও বিস্মিত হয়েছি যে, তারা পরপর ব্যাংক ও থানায় আক্রমণের এত শক্তি কোথায় পেল? তারা এখন আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে না। আর আমরাও তাদেরকে যোগাযোগ করে পচ্ছি না।”
রুমা ও থানচির তিনটি ব্যাংকে ডাকাতি এবং পরে থানচি ও আলীকদম থানায় আক্রমণের পর পুরো বান্দরবান এলাকায় এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। রুমা সোনালী ব্যাংকের অপহৃত ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনকে শুক্রবার উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং-এর পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে বান্দরবানে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, কেএনএফের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, “সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ এই অভিযান কেএনএফ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত চলবে। সন্ত্রাসীদের দমনে পাহাড়ে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মতো সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হবে।”
এদিকে পুরিশ সদর দপ্তর থেকে বান্দরবানের সব থানাকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
আমরাও বিস্মিত, তারা পরপর ব্যাংক ও থানায় আক্রমণের এত শক্তি কোথায় পেল: কাঞ্চন জয় ত্যাংচঙ্গা
কেএনএফ আলোচনায় আসে ২০২২ সালে। পুলিশ ও র্যাব তখন তাদের বিরুদ্ধে অভিয়ান চালায়। সেনাবাহিনীসহ যৌথ অভিযানও পরিচালনা করা হয়। পুলিশ তখন জানায়, সমতলের জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের জন্য বান্দরবানের কেএনএফের সঙ্গে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া নামে একটি জঙ্গি সংহঠন অর্থের বিনিময়ে চুক্তি করেছে। এর পর অভিযানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গহীন জঙ্গল থেকে জঙ্গি ও কেএনএফের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।
কেএনএফ মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংগঠন। কেএনএফ পার্বত্য তিন জেলার প্রায় অর্ধেক আয়তনের অঞ্চল তথা লামা, রুমা, আলীকদম, থানচি, রোয়াংছড়ি, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকলসহ আশপাশের এলাকায় তৎপর রয়েছে গত চার-পাঁচ বছর ধরে। কেএনএফ প্রধান হলেন নাথান বম। তারা কথিত ‘কুকিল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের একটি ম্যাপও আছে কথিত ওই কুকিল্যান্ডের।
বম বা কুকি সম্প্রদায়ের লোকজন ভারতের মনিপুর ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারে রয়েছে। ওই দুই দেশেও তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে।
কেএনএফ দাবি করে, ২০২১ সাল থেকে তাদের প্রশিক্ষিত দলটি কাজ শুরু করে। তার আগে তারা কাচিনে প্রশিক্ষণ নেয়। বান্দরবানে হামলার পর থেকে তারা তাদের ফেসবুক পেজে নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ বলেন, “কেএনএফ একটি ক্রস বর্ডার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী। তারা ভারতের মনিপুর ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারে সক্রিয়। ওইসব এলাকায় এই সময়ে যে অস্থিরতা চলছে, তারই প্রভাবে কেএনএফ ফের তৎপর হতে পারে। তবে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে বান্দরবান এলাকার নিরাপত্তায় যে ঢিলেঢালা ভাব চলে এসেছিল তাতে আমি বিস্মিত।”
তার মতে, “কেএনএফ একটি ত্রিদেশীয় সংগঠন । তারা এক দেশের শক্তি অন্যদেশে ব্যবহার করতে পারে। তাদের অবস্থান তিন দেশের সীমান্ত এলাকায়। ভূরাজনৈতিক কারণে কোনো দেশ তাদের মদত দিচ্ছে কিনা সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। ভারতে মনিপুরে যে সংকট, সেটা এখানকার কুকিদের প্রভাবিত করতে পারে। আমরা এর আগে দেখেছি, কোনো দেশ তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে তারা পাশের দেশে আশ্রয় নেয়।”
তার মতে, “এটা ক্রস বর্ডার সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হওয়ায় তারা অস্ত্র এবং অর্থের বিনিময় করে।”
মেজর জেনারেল ( অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার মনে করেন, “বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার তিন দেশেই কুকি-চীনরা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাচ্ছে। ফলে তাদের একটা ত্রিদেশীয় শক্তি এবং যোগাযোগ আছে। ভারতের মনিপুরে যে ঘটনা ঘটেছে, তার ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আবার আগের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।”
তার কথা, “এরা উচ্চমূল্যে অস্ত্র ক্রয় করে। আবার পরস্পরকে সহায়তা করে। আমার মনে হয়েছে, তাদের অর্থের প্রয়োজন। তারা সেই কারণেই ব্যাংকে হামলা চালিয়েয়েছে।”
তবে তিনি এ-ও মনে করেন, কেএনএফের পোশাক পরে অন্য কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এটা করেছে কিনা তা-ও দেখা প্রয়োজন। কারণ, ওই এলাকায় এখনো অনেক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়।
রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করা হলো না, এটা মেনে নেয়া যায় না: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রশিদ
নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে বিস্ময়
মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শহীদুল হক বলেন, “তারা তিনটি গাড়িতে করে এসে রুমা সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি করেছে। পরের দিন থানচির দুই ব্যাংকে হামলা ও ডাকাতি করেছে। রাতে থানচি ও আলীকদম থানা এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এইসব ঘটনায় আমরা বিস্মিত। কারণ, পাহাড়ি এলাকা এবং ওই ধরনের গোষ্ঠী যেখানে তৎপর থাকে, সেখানে নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকে, গোয়েন্দা তৎপরতা থাকে। সেখানে আমি বলবো, আমরা পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। মিয়ানমারের রাখাইনে যুদ্ধ চলছে। তার সীমান্তে আলীকদম। আমাদের কোনো হিসাব থাকবে না?”
তার কথা, “এই কুকি-চীনরা বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার এবং চীনের সঙ্গে যুক্ত। তাদেরকে হালকাভাবে নেয়া হয়েছে। আমার মনে হয়, এই অঞ্চলে মিয়ানমার ও ভারতের মিজোরাম ও মনিপুরে যে সংকট চলছে, তার কোনো সূত্র বান্দরবানে হামলার সঙ্গে থাকতে পারে।”
তিনি মনে করেন, “টাকার জন্য তাদের ব্যাংক লুট করতে হয় না। ওই এলাকায় যে পরিমাণ চাঁদা ওঠে, তাই যথেষ্ট। একটি উপজেলার ব্যাংকে কত টাকা থাকতে পারে তা তাদের জানা। তারা আমার মনে হয় শক্তির মহড়া দিচ্ছে। তারা পাশের দেশগুলোকেও শক্তির জানান দিতে চায়।”
মেজর জেনারেল ( অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, “রুমায় ব্যাংকে পুলিশ ছিল। থানচিতে ব্যাংকের পাশেই পুলিশ ও বিজিবির ক্যাম্প ছিল। কিন্তু কোথাও আমরা প্রতিরোধের কোনো খবর পাইনি। এতে স্পষ্ট যে, যারা ওখানে ছিলেন, তাদের মধ্যে সেই ধরনের মনোবল ছিল না। ফলে তারা কোনো বাধা দেয়নি। তাদের অস্ত্র লুট করেছে, ব্যাংক লুট করেছে, আর রুমায় ডাকাতি হওয়ার পর পুরো জেলার ব্যাংকেই তো নিরাপত্তা জোরদার করার উচিত ছিল।”
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রশিদ বলেন, “একটি সমঝোতা করার পর সব নিরাপত্তা ঢিলেঢালা করে দেয়া হলো। রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করা হলো না, এটা মেনে নেয়া যায় না।”
এই তিন জনই মনে করেন, পাহাড়ে কুকি-চীনের এই তৎপরতায় অন্য সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোও উৎসাহিত হতে পারে। জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমার সঙ্গে শাস্তি চুক্তি হলেও পাহাড়ে এখনো কমপক্ষে পাঁচটি বড় গ্রুপ সক্রিয়। আর কুকি-চীনদের ব্যাপারে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ করা উচিত বলেও মনে করেন তারা।
সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফ-এর শক্তি আসলে কতটা?

বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে দুটি ব্যাংকের তিনটি শাখায় ডাকাতির ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসা সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফ-এর বিরুদ্ধে শুক্রবার থেকেই সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা দিয়ে এলিট ফোর্স র্যাব বলেছে সে অভিযানে ‘পাহাড়ে জঙ্গি বিরোধী অভিযানের মতো সব ধরনের কৌশল’ প্রয়োগ করা হবে।
স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে যে তারা মনে করছে থানচিতে প্রকাশ্য দিবালোকে বাজার ঘিরে দুটি ব্যাংকের শাখায় হামলাকারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা থানারই দেড় থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করে থাকতে পারে।
তবে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আলীকদম উপজেলায় যে গোলাগুলির খবর এসেছে সেটি কোনো চেকপোস্টে হামলার ঘটনা ছিল না বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
২০২২ সালে পার্বত্য এলাকায় ‘জঙ্গি বিরোধী’ একটি সমন্বিত অভিযান চালিয়েছিলো নিরাপত্তা বাহিনী। তখন কেএনএফ বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি সংগঠন’ জামাতুল আনসার ফিল হিন্দিল শারক্বীয়া সদস্যদের দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছিলো। ওই অভিযানের পর কেএনএফ এর সশস্ত্র তৎপরতা খুব একটা দৃশ্যমান ছিল না।
এদিকে, মঙ্গলবার রাতে রুমায় সোনালী ব্যাংকে ও বুধবার দুপুরে থানচি বাজারে সোনালী ও কৃষি ব্যাংকের শাখায় হামলার ঘটনার পর শুক্রবার অনেক মানুষকেই থানচি ছাড়তে দেখা গেছে। রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি বাড়ানো হয়েছে।
তবে থানচি গিয়ে চট্টগ্রাম পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি সঞ্জয় সরকার মানুষজনকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, এখন যে পরিস্থিতি আছে তা সামাল দেয়ার সক্ষমতা পুলিশের আছে।
ওদিকে ব্যাংকে হামলা, কর্মকর্তা অপহরণ ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় রুমা ও থানচি থানায় শুক্রবার মোট ছয়টি মামলা হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

কেএনএফ কতটা শক্তিশালী
রুমা ও থানচিতে হামলার ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ওই ঘটনার জন্য কেএনএফকে অভিযুক্ত করেছেন। তবে কেএনএফ এর দিক থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য আসেনি।
কেএনএফ বা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন’ হিসেবেই বিবেচনা করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী।
থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন শুক্রবার সন্ধ্যায় বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তাদের ধারণা থানচিতে হামলাকারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা থানার দেড়-দুই কিলোমিটারের মধ্যেই অবস্থান করছে।
“পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে যা বুঝতে পারছি তাতে আমাদের মনে হয় আশেপাশের পাহাড়েই তারা আছে। তবে তাদের এমন কোনো শক্তি নেই যে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে। একটা পরিস্থিতি হয়েছে সেটি মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
কিন্তু তারপরও হুট করে ব্যাংকে হামলা করে টাকা ও অস্ত্র লুটের ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে কেএনএফ এর শক্তি আসলে কতটা এবং তারা কোনো ধরনের আঞ্চলিক আশীর্বাদ পাচ্ছে কি না।
বান্দরবানে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেছেন তারা মনে করেন, গত কয়েক দিনে ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনার দুইটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
“প্রথমত, টাকা লুটপাট ও অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া এবং দ্বিতীয়ত নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করা”।
কিন্তু এই সক্ষমতা বলতে কেএনএফের শক্তি বা সামর্থ্যের কথা বোঝানো হলে এই প্রশ্নও আসে যে প্রকৃত অর্থে কতটা শক্তিশালী এই কেএনএফ।
গত প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বান্দরবানের শান্তি আলোচনা বিষয়ে কেএনএফ এর বিভিন্ন সূত্রের সাথে যাদের যোগাযোগ হয়েছিলো তাদের কয়েকজন ধারণা দিয়েছেন যে কেএনএফ এর সামরিক শাখার সদস্য সংখ্যা সাড়ে তিনশ থেকে চারশোর মতো হতে পারে।

একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে শুরু করা কেএনএফ ২০২২ সালের শেষ দিকে বেশ সক্রিয় ছিল ফেসবুকে। তখন ফেসবুকে ও ইউটিউব পোস্টে কেএনএফ তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়াও শুরু থেকেই সরকার ও জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়েছিলো।
তারও আগে তারা ফেসবুকে জানিয়েছিলো যে তাদের একটি কমান্ডো দলও আছে যার নাম – হেড হান্টার কমান্ডো টিম।
ওই বছরের জুলাই মাসে ফেসবুকে কেএনএফ জানায়, তাদেরে একদল কমান্ডো মিয়ানমারের কাচিন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসেছে। এরপর অগাস্টে সামরিক পোশাক পরিহিত একদল ব্যক্তির ছবি দিয়ে কেএনএফ দাবি করে এরা তাদের কমান্ডো।
পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) এমদাদুল ইসলামের।
মি. ইসলাম বিবিসিকে বলছেন কেএনএফের শক্তি ও সমর্থন খুব একটা আছে তেমনটা তিনি মনে করেন না।
“তবে আমার মনে হয় তাদের যথাযথ গুরুত্ব না দেয়ায় তারা একটু বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। পরে জঙ্গি ইস্যুটি সামনে আসার পর কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে এসেছে। আবার কেএনএফ আলোচনায় আসায় হয়তো আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগেই এবারের ঘটনা ঘটেছে”।
তবে কেউ কেউ আবার মনে করেন বান্দরবানের শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সাথে আলোচনায় আসার কারণে কেএনএফ-এর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও এবারের হামলার একটি কারণ হতে পারে।
“বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে এটা দেখা যায় বিশ্বজুড়েই। মূল নেতৃত্ব সরকারের সঙ্গে আলোচনায় যেতে চাইলে পরবর্তী ধাপ বা অন্য স্তর থেকে আঘাত আসে। তারা হয়তো ভাবে সমঝোতা হয়ে গেলে তাদের আর অর্জন কী থাকলো,” বলছিলেন মি. ইসলাম।
তার মতে রুমা ও থানচির ঘটনায় সেটিও একটি কারণ হতে পারে।
বান্দরবানের শান্তি আলোচনার সাথে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে তাদের ধারণা এই শান্তি আলোচনাকে ঘিরে কেএনএফ এর সামরিক ও রাজনৈতিক শাখার মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে। তবে এরও কোনো প্রমাণ নেই।

আঞ্চলিক আশীর্বাদ থাকতে পারে কি না?
কেএনএফ এর সাথে ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারের কুকিদের সাথে যোগসূত্রের কথা শোনা গেলেও তার দৃশ্যমান প্রমাণ খুব একটা দেখা যায় না। আবার আরাকান আর্মির সাথেও কেএনএফ এর সখ্য সহজ নয় কারণ ঐতিহাসিকভাবেই কুকি ও মগদের মধ্যে বন্ধুত্বের চেয়ে সংঘর্ষই হয়েছে বেশি।
মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) এমদাদুল ইসলাম বলছেন, মিজোরামে বম জনগোষ্ঠীর অবস্থান আছে তবে কেএনএফ তাদের আশীর্বাদ পাচ্ছে, বাংলাদেশে এসব করার জন্য, তেমনটা মনে হয় না।
“মিজোদের সাথে এখানকার বমদের মিল আছে। কেএনএফের শীর্ষস্থানীয় কেউ কেউ সেখানেও যেতেও পারেন। আবার মিয়ানমারের আরাকান আর্মিও তাদের ব্যবহার করতে পারে বা যোগসূত্র তৈরি করতে পারে। কিন্তু এগুলো এখনো নিছক ধারণাই,” বলছিলেন তিনি।
তবে বান্দরবানের কয়েকটি সূত্র বলছে, কেএনএফ এর মূল কেন্দ্র হলো বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের সীমান্ত ট্রায়াঙ্গল।
সেখানেই জিরো পয়েন্টে তাদের অবস্থান এবং তারা বাংলাদেশের ভেতরেই সক্রিয় থেকে কাজ করে বলে দাবি করেছে এমন কয়েকটি সূত্র।
এসব সূত্রের দাবি ২০২২ সালে পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর থেকে কেএনএফ বড় ধরনের অর্থ সংকটে পড়ে যায়। সে কারণেই সংগঠনটির একটি অংশ ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা করে থাকতে পারে।
তা না হলে অন্য কোনো বিষয়ে অসন্তোষ থাকলে সেটি কেএনএফ এর দিক থেকে আগামী ২২শে এপ্রিল তৃতীয় সরাসরি আলোচনায় তুলে ধরার সুযোগ ছিল।

আলীকদমে রাতে কী হয়েছিলো
বৃহস্পতিবার রাতে প্রথমে থানচি বাজার এলাকায় কেএনএফের সাথে এক ঘণ্টার মতো গোলাগুলির খবর নিশ্চিত করেছিলো পুলিশ। পরে রাত একটার দিকে আলীকদমে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে হামলার খবর আসে।
পরে প্রশাসন থেকে বলা হয় চেকপোস্টে হামলা হয়নি এবং এটি একটি ভুল বুঝাবুঝির ঘটনা।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউল গণি ওসমানি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বৃহস্পতিবার রাতে থানচি আলীকদম সীমান্তের আলীকদম সড়কের ব্যারিকেড এলাকায় একটি বালু পরিবহনের ট্রাককে কেন্দ্র করে গুলির ঘটনা ঘটে।
“ট্রাকটি সেখান দিয়ে যাচ্ছিলো। চেকপোস্টে হামলা বা আলীকদমে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। উঁচু সড়কের ওই স্থানে বাঁশের ব্যারিকেড ছিল। ব্যারিকেড অতিক্রম করলে পুলিশ গুলি করে। এছাড়া আর্মি, পুলিশ ও বিজিবি মুভ করার পর আর কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
যদিও ওই সময় কয়েকশ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা গেছে বলে খবর এসেছে এবং পুলিশের পজিশন নেয়ার ছবি সামাজিক ও গণমাধ্যমে এসেছে।
কেউ কেউ ধারণা করছিলো যে তিন্দু হয়ে রেমাক্রির দিকে যাওয়া কিংবা পাহাড় থেকে নেমে লামার দিকে যাওয়ার জন্যই থানচিতে হামলাকারী বন্দুকধারীদের একটি অংশ থানচি আলীকদম সীমান্তের ওই চেকপোস্টের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলো।
থানচি আলী কদম সড়কটি মূলত নির্জন পাহাড়ের ওপর দেশের সবচেয়ে উঁচুতে তৈরি করা সড়ক। আর সেই পথ হয়ে গেলে রেমাক্রি বা লামার দিকে দুর্গম পাহাড়ের ওই অংশে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সাধারণত কম থাকে।
মি. ওসমানী বলছেন আলীকদম উপজেলাকে তারা এখন পর্যন্ত নিরাপদ বলেই মনে করছেন।
আলীকদম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তবিদুর রহমান বলছেন আলীকদমের যে ভৌগলিক অবস্থান তাতে এ ধরনের হামলার সুযোগ সেখানে খুব একটা নেই বলেই আমরা মনে করি।
“একটা গাড়ি এসেছিলো। চেকপোস্টের ব্যারিকেডে পড়েছিলো। আবার থানচির দিকে চলে গেছে,” বলছিলেন তিনি।
সর্বশেষ পরিস্থিতি কেমন
বৃহস্পতিবার রাতের গোলাগুলির পর থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনও মনে করছেন যে বন্দুকধারীরা থানচি এলাকাতেই অবস্থান করছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন থানচি বাজারে আজও লোকজন দেখা যায়নি খুব একটা। অনেকে পরিবারের নারী ও শিশুদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিচ্ছেন এমন দৃশ্য দেখা গেছে। সকালে থানচিতে সেনা টহল দেখা গেছে। এছাড়া বিজিবিকেও টহলরত দেখা গেছে।
এর মধ্যেই সব দোকানপাট খুলেনি।
থানচি বাজারের ২/৩শ গজের ভেতরেই রয়েছে থানচি থানা, একটি বিজিবি ক্যাম্প এবং বাজারের শেষ মাথায় রয়েছে সেনাবাহিনীর একটি চেকপোস্ট।
থানচিতে গিয়ে শুক্রবার পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি সঞ্জয় সরকার বলেছেন লোকজনের ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
“এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশের সক্ষমতা আছে। তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই,” সাংবাদিকদের বলছিলেন তিনি।
পাশাপাশি দুপুরেই বান্দরবানে সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব জানায় যে আজ থেকেই কেএনএফ এর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করবে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ।





