ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন দুর্বল সরকার পেয়ে জামায়াত সহ কোনো কোনো রাজনৈতিক দল দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কোন রাজনৈতিক দল যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দুর্বল পেয়ে যা ইচ্ছা তাই আদায় করে নিতে চায় কিংবা জনগণের দ্বারা বিএনপির বিজয় ঠেকাতে চায় বা কোন অপকৌশল গ্রহণ করে তবে জনগণকে নিয়ে তা প্রতিরোধ করবো।

তারেক রহমান বলেন, রাজপথের সেই সঙ্গীদের প্রতি আহ্বান, যারা পরিস্থিতি ঘোলটা করছেন বা করার চেষ্টা করছেন দয়া করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করবেন না। স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা প্রিয় দেশবাসী বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিরোধী চক্রান্ত নস্যাৎ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে সংগঠিত সিপাহী জনতার বিপ্লব উপলক্ষে আজকের আয়োজিত এই আলোচনায় আমি স্বাধীনতার ঘোষকের একটি কথা আবার উচ্চারণ করতে চাই, ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। এরপরই তারেক রহমান শ্লোগান ধরেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।

গতকাল বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপির উদ্যোগে ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমানের কর্মময় জীবনের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করেছে। এখন সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা কি একটি রাজনৈতিক দলের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করবে নাকি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনকেই অগ্রাধিকার তারা দেবে।
তিনি বলেন, রাজপথের আন্দোলনের সকল সঙ্গীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, উত্তর কোরিয়ার সংবিধানে লেখা রয়েছে- ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়া। সংবিধানে লেখা থাকলেই সবকিছু কী নিশ্চিত হয়ে যায়? হয়তো হয়ে যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাস কিন্তু তাই বলে কম-বেশি। আসলে সবার আগে প্রয়োজন রাষ্ট্র রাজনীতি সম্পর্কে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতার, প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মানসিকতার, সর্বোপরি প্রয়োজন দেশপ্রেম এবং জাতীয় ঐক্য।
জাতীয় ঐক্যে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশ এবং জনগণের স্বার্থে, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং জনসমর্থিত দল হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার ব্যাপারে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে, এটি কথার কথা নয়, এটি প্রমাণিত। দুই এবং দুই যেমন চার হয়, এটিও প্রমাণিত। আমরা যদি কাগজপত্রগুলো দেখি তাহলে দেখবো বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য কমিশনের প্রতিটি দফা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বিএনপি অধিকাংশ পয়েন্টে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে। আমাদের বক্তব্য একদম পরিষ্কার।

গণভোটের অর্থ ব্যয় চেয়ে আলু চাষী ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের রাজনীতি কাদের জন্য। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আমার কিছু উপলব্ধির কথা বলতে চাই। দেশে এবার এক কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। আলু উৎপাদন করে খুব সম্ভবত আলু কৃষকরা বিপাকে পড়ে গিয়েছেন, কারণ আলুর যে উৎপাদন খরচ এবং আলুর উৎপাদিত আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখতে হবে। প্রতি কেজি আলুর পেছনে খুব সম্ভবত খরচ পড়ছে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ টাকার মতো। অথচ আলুর চাষীরা কিন্তু এখনো অর্ধেক দামেও উৎপাদিত আলু বাজারে বিক্রি সম্ভবত করতে উনারা পারছেন না। আলু চাষ করে আলু চাষীরা এবার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার মতো লোকসান তারা আশঙ্কা করছেন। অপর দিকে আমরা দেখি যে, দু’একটি রাজনৈতিক দলের আবদার মেটাতে গিয়ে কথিত গণভোট যদি করতে হয় রাষ্ট্রকে আলু চাষীদের যে তিন হাজার কোটি টাকা পরিমাণের গচ্চা, এই কথিত গণভোট করতে হলে প্রায় সমপরিমাণের টাকা গচ্চা দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে লোকসানের মুখোমুখি এইসব আলু চাষীদের কাছে এই সময় গণভোটের চেয়ে মনে হয় আলুর ন্যায্য মূল্য পাওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই ভাবে পেঁয়াজের উৎপাদনের বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা বা যে পরিমাণ উৎপাদন হয় আমাদের কৃষকদের কম বেশি মোটামুটি সক্ষমতা রয়েছে যদি তাদেরকে সহযোগিতা করা হয়। পেঁয়াজ সংরক্ষণ সুষ্ঠভাবে সংরক্ষণ করার কোন ব্যবস্থা সেভাবে না থাকায় অর্থাৎ কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় আমাদেরকে প্রতিবছর পেঁয়াজের জন্য আমদানির ওপরে নির্ভর করতে হয়। আমার কাছে মনে হয়েছে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কথিত গণভোট করার চেয়ে সেই টাকায় পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজ যদি স্থাপন করা হয় এটা বোধহয় কৃষকদের কাছে গণভোটের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। তবে সবচেয়ে কষ্টদায়ক ব্যাপার হচ্ছে পেঁয়াজ কৃষক বলুন বা অন্য যেই কৃষকের কথাই বলুন না কেন তাদের কথাগুলো যেরকম তাদের বলার জায়গা নেই ,এই মুহূর্তে তাদের হয়ে কথাগুলো তুলে ধরারও বোধ হয় কোন জায়গা নেই।
দেশের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, গার্মেন্টস শিল্প বন্ধে বেকার কর্মহীন শ্রমিকদের দুরাবস্থা, শিক্ষা খাতে দুরাবস্থা, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার সর্বনি¤œ ফলাফল প্রভৃতি বিষয়গুলো তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এসব বিষয়ে এখন গণভোটের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
গত কয়েকদিনের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবখাতে এই রকম দুরাবস্থা। আমরা দেখছি নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল,আজকে যারা আমরা রাজপথের সঙ্গীরা বসে আছি। কেউ হয়তো রাজপথের সঙ্গী ছিল সেরকম কিছু দলকে আমরা দেখছি বর্তমানে বিভিন্ন শর্ত দিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান বাধা সৃষ্টি করতে চাইছে। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি অর্থ একদিকে নির্বাচন না করে হয়ত রাষ্ট্রের খবরদারীর সুযোগ গ্রহণ করা, অপরদিকে রাজনৈতিকভাবে যদি বলতে হয় পরিষ্কারভাবে পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচারের পুনর্বাসনের পথকে সুগম করে দেওয়া। পলাতক স্বৈরাচারী সহযোগিতায় গত কয়েকদিনে আমরা দেখছি, খোদ রাজধানী ঢাকায় যেভাবে আগুন সন্ত্রাস চালিয়েছে, ফ্যাসিবাদ বিরোধী শক্তির করণী সম্পর্কে এটা একটা সতর্ক বার্তা হতে পারে বলে আমার কাছে মনে হয়।
বর্তমান সংকট উদ্দেশ্যেমূলক মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশে এই যে একটা সংকট তৈরি হয়েছে এটা একটা অপ্রয়োজনীয় সংকট, এই সংকট সৃষ্টির কোন প্রয়োজন ছিল না। এই সংকটটা তৈরি করা হয়েছে। অত্যন্ত উদ্দেশ্যমূলকভাবে অর্থাৎ বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক উত্তরণ যে পথ সেই পথকে বাধাগ্রস্ত করা, বাংলাদেশের সত্যিকার অর্থে সংস্কারের জন্য যে নির্বাচন হওয়া দরকার সেই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা, জনগণের ভবিষ্যৎকে একটা অনিশ্চিত অবস্থায় ফেলা। আসুন আজকে আমরা সবাই এই জায়গা থেকে এক মত হয়ে কাজ করি।
বিএনপি মহাসচিবের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মাহবুবউল্লাহ বক্তব্য রাখেন।
এছাড়া জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, গণঅধিকার পরিষদের রাশেদ খান প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।





