যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের ডি-ফ্যাক্টো শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান এটিকে ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে তুলে ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে একাধিকবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন সৌদি যুবরাজ। এসব আলোচনায় তিনি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে তুলে ধরে, কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখেন।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ দৃঢ়ভাবে নাকচ করেছে সৌদি সরকার। তাদের দাবি, দেশটির সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, সংঘাত শুরুর আগেই সৌদি আরব সবসময় এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানকে সমর্থন করে এসেছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের অবস্থান প্রকাশ্যে কিছুটা দোদুল্যমান। কখনও তিনি দ্রুত সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, আবার কখনও সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ হয়েছে এবং একটি ‘সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত সমাধান’ নিয়ে অগ্রগতি রয়েছে। তবে তেহরান এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
খামেনিকে হত্যার পরিকল্পনার পরই ইরান অভিযানে ট্রাম্পের অনুমোদন: রয়টার্সের প্রতিবেদন

তবে নতুন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকের সময় শনিবার রাত থেকে এগিয়ে শনিবার সকালে আনা হয় বলে জানা যায়। এই ফোনালাপের বিষয়টি আগে কখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
ফোনালাপের সময় পর্যন্ত ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর ধারণায় অনুমোদন দিলেও, কখন বা কোন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়াবে, তা চূড়ান্ত করেননি বলে সূত্রগুলো জানায়।
এরই মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলে উপস্থিতি জোরদার করছিল, যা প্রশাসনের অনেকের কাছে ইঙ্গিত দেয়—শুধু সময়ের অপেক্ষা, কখন প্রেসিডেন্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগে খারাপ আবহাওয়ার কারণে একটি সম্ভাব্য তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
নেতানিয়াহু যুক্তি দেন, এই অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প ইতিহাস গড়তে পারেন; ইরানি নেতৃত্ব পশ্চিমা বিশ্ব ও বহু ইরানির কাছে দীর্ঘদিন ধরেই ঘৃণিত।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি সরাসরি ফোনালাপ নিয়ে কিছু বলেননি। তবে তিনি জানান, এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা, নৌবাহিনী অকার্যকর করা, প্রক্সি শক্তিগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা এবং ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় বা জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে টেনে এনেছে, এমন দাবি ভুয়া খবর’। তিনি বলেন, ‘কেউ কি সত্যিই মনে করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কেউ বলে দিতে পারে কী করতে হবে?’
ট্রাম্পও প্রকাশ্যে বলেছেন, হামলার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ তার নিজস্ব।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেননি। তবে তিনি অত্যন্ত কার্যকরভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন এবং ইরানের সেই নেতৃত্বকে হত্যার সুযোগ, যারা ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টায় জড়িত ছিল বলে অভিযোগ—এই বিষয়টি ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মার্চের শুরুতে বলেন, প্রতিশোধ এই অভিযানের একটি উদ্দেশ্য ছিল। তিনি বলেন, ‘ইরান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, আর শেষ হাসিটা হেসেছেন ট্রাম্প।’
জুনের হামলা ও পরবর্তী পরিকল্পনা
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা বলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবতে শুরু করেন।
প্রথম হামলা হয় জুনে, যখন ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালায় এবং কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রও এতে যোগ দেয়। ১২ দিনের সেই যৌথ অভিযান শেষে ট্রাম্প দাবি করেন, তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করেছে।
তবে কয়েক মাস পর আবার নতুন হামলার পরিকল্পনা শুরু হয়, যার লক্ষ্য ছিল অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ধ্বংস করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা।
ইসরায়েল খামেনিকে হত্যার পক্ষেও ছিল, যাকে তারা দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে। হামাস ও হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন প্রক্সি শক্তিকে সমর্থনের জন্যও তাকে দায়ী করা হয়।
ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের মার-আ-লাগো এস্টেটে সফরে গিয়ে নেতানিয়াহু জুনের অভিযানে সন্তুষ্ট নন বলে জানান। ট্রাম্প আরেকটি হামলার ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও, কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া দুটি ঘটনা
দুটি ঘটনা ট্রাম্পকে আবার হামলার দিকে ঝুঁকতে প্রভাবিত করে। প্রথমত, ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের মার্কিন অভিযান, যেখানে কোনো মার্কিন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এই ঘটনা দেখিয়েছে বড় সামরিক অভিযানে ঝুঁকি কম হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইরানে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ এবং তা দমনে আইআরজিসির কঠোর পদক্ষেপ।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে গোপন বৈঠকে যৌথ পরিকল্পনা জোরদার হয়।
ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন সফরে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফ করেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পরিণতি
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে অনেক মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তা মনে করছিলেন, ইরানের ওপর হামলা খুবই সম্ভাব্য।
ট্রাম্পকে জানানো হয়, সফল হামলা হলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা সম্ভব। তবে পাল্টা হামলার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়।
এই আশঙ্কাই পরে সত্যি হয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, হাজারো বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়, তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়।
ট্রাম্পকে আরও জানানো হয়েছিল, খামেনিকে হত্যা করলে তেহরানে নতুন সরকার আসতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী হতে পারে। তবে সিআইএ মনে করেছিল, এতে আরও কট্টরপন্থি নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি।
বর্তমানে যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইরানে এখনও রেভল্যুশনারি গার্ডরা রাস্তায় টহল দিচ্ছে এবং জনগণের বড় অংশ ঘরে অবস্থান করছে। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স





