সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে রোববার ঢাকা ও বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে বহু হতাহত হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে আগামী তিনদিন আবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার ঢাকামুখী লং মার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আন্দোলনকারীরা। রক্তাক্ত এক রোববার পার করছে বাংলাদেশ৷ হামলা, সহিংসতায় সারাদেশে অন্তত ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ কারফিউ জারি করেছে সরকার৷ ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন৷

নিউজ২১ডেস্কঃ সিরাজগঞ্জে ১৮ জন, ঢাকায় ১৩ জন, ফেনীতে আটজন, লক্ষ্মীপুরে আটজন, নরসিংদীতে ছয়জন, বগুড়ায় পাঁচজন, রংপুরে চারজন, সিলেটে চারজন, মাগুরায় তিনজন, কিশোরগঞ্জে তিনজন, মুন্সিগঞ্জে তিনজন, কুমিল্লায় তিনজন, শেরপুরে তিনজন, পাবনায় তিনজন, কক্সবাজারে একজন, জয়পুরহাটে দুইজন, বরিশালে একজন, ভোলায় একজন, হবিগঞ্জে একজন নিহত হয়েছেন।

রোববারও সারাদেশে বিক্ষোভ চালিয়ে যান আন্দোলনকারীরা৷ আজ থেকে সর্বাত্মক অসহযোগের ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন৷ প্রতিবাদ মিছিল কর্মসূচি পালন করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা৷ আগামীকাল ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন৷

স্থানীয় সময় দুপুরে আবারও কারফিউ জারির ঘোষণা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা ৬টা থেকে আবারো কারফিউ জারি করেছে বাংলাদেশের সরকার৷ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকাসহ সব বিভাগীয় সদর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, শিল্পাঞ্চল, জেলা সদর এবং উপজেলা সদরে কারফিউ বলবৎ করা হয়েছে৷’’

এনায়েতপুর থানার ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত
অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে সিরাজগঞ্জ জেলার এনায়েতপুর থানায় ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।

লক্ষীপুরে নিহত ৮
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে অন্তত আটজন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন৷ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সোহেল রানা দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন৷ প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে সংবাদ মাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, লক্ষ্মীপুরের উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু ও তার অনুসারীরা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে অনবরত গুলি করতে থাকেন৷ মো. সোহেল রানা বলেন, ‘‘একেএম সালাহ উদ্দিন টিপুর বাসার সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়৷ এসময় গোলাগুলি হয় ও হতাহতের ঘটনা ঘটে৷’’

নরসিংদীতে ছয় আ. লীগ নেতাকে হত্যা: মাধবধীর পৌর মেয়র
নরসিংদীতে ছয় আওয়ামী লীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন মাধবধীর পৌর মেয়র৷ রোববার দুপুর ১টার দিকে নরসিংদীর মাধবধী পৌর ভবনের পাশে বড় মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

উত্তাল ঢাকা
এদিকে প্রতিবাদকারী ও সরকার পক্ষের অবস্থানে উত্তাল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা৷
উত্তরায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম নিহত হয়েছেন। ঢাকার ধানমন্ডি, গুলিস্তান ও ফার্মগেট এলাকায় সংঘর্ষে শিক্ষার্থীসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন৷ আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে নিহত হয়েছেন দুইজন। সব মিলিয়ে ঢাকায় মোট ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে৷
বেলা ১১টার দিকে শাহবাগ এলাকায় বিক্ষোভকারীরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া দেন৷ সকাল সাড়ে ১০টার পরে তাঁরা পুরান ঢাকার দিক থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে আসেন৷ প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘‘সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সামনের দিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন৷ তবে পুরান ঢাকার দিক থেকে আসা মিছিল থেকে তাঁদের ধাওয়া দেওয়া হয়৷ তারা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে যান৷ সেখান থেকে ইটপাটকেল ছোড়া হচ্ছিল৷
তখন বিক্ষোভকারীরা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের খুঁজতে থাকেন৷ এ সময় হাসপাতালের প্রাঙ্গণে থাকা প্রায় ২০টি গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স এবং ১৫টির মতো মোটরসাইকেলে ভাঙচুর করা হয়৷ কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়৷”
সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে যান বিক্ষোভকারীরা৷ তারা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন৷ শাহবাগ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মিছিল করেছেন আন্দোলনকারীরা৷
এদিকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যানবাহনের চাপ ছিল কম৷

সারা দেশে সহিংসতায় নিহত অন্তত ৮০ জন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে সহিংসতায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ৮০ জন নিহত হয়েছেন।
রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকার সমর্থক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে তারা মারা গেছেন। অনেক স্থানে বাড়িঘর ও গাড়ি ভাঙ্গচুর- আগুন দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।
নিহতদের অনেকে শরীরে গুলির আঘাত রয়েছে। আবার অনেককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি সিরাজগঞ্জে। সেখানে অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৩ জনই পুলিশ বলে নিশ্চিত করেছেন বাহিনীর কর্মকর্তারা।
আর ঢাকায় মারা গেছেন কমপক্ষে ছয় জন, যাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন নেতা রয়েছেন। এছাড়া সাভারে একজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া ফেনীতে আটজন, নরসিংদীতে ছয়জন, লক্ষ্মীপুরে আট জন, ভোলায় একজন, রংপুরে চার জন, মুন্সিগঞ্জে তিনজন, মাগুরায় চার জন, বগুড়ায় চার জন, জয়পুরহাটে দুই জন, পাবনায় তিনজন, শেরপুরে তিন জন, সিলেটে দুই জন, কিশোরগঞ্জে তিনজন, কুমিল্লায় দুইজন, কক্সবাজারে এক জন এবং বরিশালে একজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি বাংলা।





