সাংবাদিকদের সংবাদ লেখার জন্য গুগলের এআই টুল, শঙ্কায় মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি

244

এবার সংবাদ, নিবন্ধ লিখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স- এআই) টুল আনতে চলেছে গুগল। গুগলের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা এই টুল ব্যবহারের বিষয়ে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনা চলছে। টুলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবাদ, নিবন্ধ লেখার পাশাপাশি সাংবাদিকদের সাহায্য করবে। প্রতিদিন দেশ দুনিয়ায় যা ঘটছে তা বিস্তারিত জানাবে এই রোবট।ছবি: সংগৃহীত

প্রযুক্তি ডেস্ক : সংবাদ লিখতে সহায়তা করতে এবার সাংবাদিকদের জন্য নতুন এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) টুল এনেছে গুগল। যে টুল নানা কাজে সাংবাদিকদের সহায়তা করবে বলে দাবি মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিটির।নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই টুলটি নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও নিউইয়র্ক পোস্ট–এর সঙ্গে আলোচনা চলছে গুগলের। এটি সংবাদের শিরোনামসহ আকর্ষণীয় সংবাদ লিখতে সাহায্য করবে। এতে বাড়বে কর্মোদ্যম ও উৎপাদনশীলতা। বিষয়বস্তুর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবাদ, নিবন্ধ লিখে দেবে এআই টুল। এটিকে জেনেসিস নামে ডাকা হচ্ছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুগল বলছে- এই এআই টুল সাংবাদিকদের হেডলাইন বা ভিন্ন শৈলীতে লিখতে সহায়তা করবে। তবে প্রযুক্তিটি সাংবাদিকদের প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে নয়।

গুগলের মুখপাত্র জেন ক্রাইডার বলেছেন, প্রতিবেদন তৈরি এবং সত্যতা নিশ্চিতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই প্রযুক্তি ছিনিয়ে নিতে পারবে না। নতুন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্দেশ্যও তা নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো- সাংবাদিকদের এই উদীয়মান প্রযুক্তিগুলো এমনভাবে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া, যা তাদের কাজের গতি, লেখার শৈলী ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। লেখালেখির স্টাইলেও ভিন্নতা আনতে সহায়ক হয়।

গুগলের একটি সূত্র জানায়, এআই টুলটি নানাভাবে সংবাদ প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করবে। বিষয়বস্তু, নির্ধারিত পাঠক শ্রেণী ও প্রকাশনা নীতির ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে সাজাতে পারবে এই টুল। বিপুল পরিমাণ তথ্যকে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে যাচাই করতে সক্ষম হবে। ভাষা ও ব্যাকরণগত ভুল সংধোশনের কাজও করবে জেনেসিস। এছাড়া বহু ভাষা নিয়ে কাজ করার সক্ষমতাও থাকবে এটির।

তবে এই বক্তব্যে সাংকাদিকদের শঙ্কা কাটছে না, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্ল্যাটফর্মগুলোর ঝুঁকি ও সুবিধাগুলো সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া এটি ব্যবহারে সাংবাদিকদের সৃজনশীলতাও হয়তো কমিয়ে দেবে। তবে ক্রাইডার বলেন, এই প্রযুক্তি সাংবাদিকদের বিকল্প নয় বা তাদের ভূমিকাও কমাবে না।

এই খবরটি ঠিক তখন সামনে আসে যখন বিশ্বজুড়ে এআই -এর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। বিশেষ করে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বহু মানুষের চাকরি যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুয়ো খবরও তৈরি করা যেতে পারে। এই টুল বা প্রযুক্তি মেইনস্ট্রিমে প্রবেশ করলে তার পরিণতি ভয়ানক হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

পয়েন্টার ইনস্টিটিউটের সাংবাদিকতার নৈতিকতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কেলি ম্যাকব্রাইড মনে করেন, গুগলের আলোচ্য প্রযুক্তি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাপারে সহায়তা করতে পারে। যেমন- জনসভা বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠানের সূচি এবং সেখানে কী হচ্ছে তার বর্ণনা তৈরি করা। ফলে এসব কাজে আর সাংবাদিকদের প্রয়োজন হবে না।

তবে তিনি বলেন, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো যদি নতুন একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করার আগেই এই প্রযুক্তির দ্রুত উত্থান হয়, তাহলে সাংবাদিকদের চাকরি হুমকির মুখে পড়বে। এজন্য নিউজ মিডিয়া গিল্ডের মতো সাংবাদিকদের ইউনিয়নগুলো গুগলের এই প্রযুক্তির বিকাশের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টি রাখছে।

গুগলের এই উদ্যোগে বিশ্বাসযোগ্যভাবে নির্ভুল সংবাদ পাওয়া যাবে কী না, বা ইতোমধ্যে আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যেতে থাকা সাংবাদিকতা খাতে কর্মরত সাংবাদিকদের চাকরি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে কিনা, এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন, এটি ব্যবহারে সাংবাদিকদের সৃজনশীলতা কমিয়ে দেওয়া এবং চাকরিচ্যুতের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

নিউজ মিডিয়া গিল্ডের প্রেসিডেন্ট ভিন চেরউ বলেন, আমরা সবাই এমন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পক্ষে যা রিপোর্টার এবং সম্পাদকদের কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক। কিন্তু তাদের কাজ এআই করে দিক, এটি আমরা চাই না। তিনি বলেন, তাদের চাকরি রক্ষা করা এবং সাংবাদিকতার মানদণ্ড অক্ষুন্ন রাখাটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রোপাবলিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডিক টোফেল বলেন, সংবাদ লেখার যোগ্যতার বাইরেও এই প্রযুক্তির আরও কী কী সম্ভাবনা আছে, সেদিকে নজর দেওয়া উচিত সাংবাদিকদের। ইতিমধ্যে সীমিত সম্পদ থাকা সত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডেটা জার্নালিজম ও ভিন্ন ভাষায় সংবাদ তৈরি করছে। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি তাদেরকে কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা উপেক্ষা করা উচিত হবে না সংবাদমাধ্যমগুলোর।

বিশ্বজুড়েই মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে সংকট চলছে। কারণে প্রিন্ট মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এতে চাকরি হারাচ্ছেন শত শত সাংবাদিক। ২০২৩ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ রুমগুলো থেকে ১৭ হাজারের বেশি চাকরি হারিয়েছেন।

কিছু মিডিয়া সংস্থা ইতিমধ্যেই জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তবে নির্ভুলতা, চুরি ও কপিরাইট নিয়ে উদ্বেগের কারণে, সংবাদ বা প্রতিবেদন লেখার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার ধীরগতিতে আছে। ১৯৯০ এর দশকে যখন ইন্টারনেট আসলো, তখন অনেক সংবাদমাধ্যম ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিল। বিষয়টা অনেকটা সেরকম বলে মনে করেন ডিক টোফেল। তিনি বলেন, প্রযুক্তি অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে, তবে নির্বোধের মতো নয়।

তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে চ্যাটজিপিটি ও বার্ডের দক্ষতা যে মানুষের চেয়ে কম, তা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। দুটি পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে কর্মরত উচ্চপদস্থ সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, সাংবাদিকরা সুনিপুণভাবে লিখতে এবং সঠিক তথ্য হাজির করতে যে শ্রম দেন, তার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে এসব এআই টুলের মাধ্যমে।

পূর্বের খবরআওয়ামীলীগকে একতরফা সমর্থনের ভারতীয় নীতি পাল্টে যাবে : দ্য ডিপ্লোমেট
পরবর্তি খবরআজ মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী মিরা রেজনিক, কাল যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সংলাপ