ব্রিকসের সদস্য হতে না পারা বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা নয়

148

অনলাইন ডেস্কঃ বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে পারেনি৷ দক্ষিণ আফ্রিকায় হয়ে যাওয়া এই সম্মেলনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বেশ বড় একটা দল গিয়েছিল৷ দিন তিনেক অবস্থান করেছেন জোহানেসবার্গে৷ হোটেলে থাকা ছাড়াও সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিটিং করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী৷ আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে দেখলাম ভোট প্রার্থনা করেছেন৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও হয়েছে৷ কিন্তু যে দুটি ‘অব্যক্ত’ লক্ষ্য নিয়ে সেখানে যাওয়া এবং অবস্থান করা, তার একটিও অর্জিত হয়নি৷

আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসের সদস্য হতে চেয়ে আবেদন করা ২২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিলো.

আমার বিবেচনায় লক্ষ্য ছিল দুটি—প্রথমত, ব্রিকসের সদস্যপদ পাওয়া এবং দ্বিতীয়ত, অন্তত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে একটা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করা৷ কেন এই দুটিকেই আমার কাছে প্রধান লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে, সে আলোচনায় একটু পরে আসছি৷ তার আগে বরং বলে নিই, সদস্যপদ না পেয়ে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে বলাটা হলো কী?
দেশে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করলেন৷ সেখানে বললেন, ‘‘আমরা নাকি আসলে সদস্য হতেই চাইনি, সদস্য হওয়ার জন্য কোনো চেষ্টা-চরিত্রও করিনি, কাউকে বলিনি৷ এসব করলে হয়ে যেতাম, কারণ, বিশ্ব প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন অনেক উন্নত হয়েছে৷ এতটাই উন্নত যে, বাংলাদেশ কিছু চাইবে আর সেটা পাবে না, এমন হয় না৷’’
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের একটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে৷ এখানে বেছে বেছে ‘অনুগত’ সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকেন৷ খুবই পরিচিত কিছু মুখ৷ প্রতিটা সংবাদ সম্মেলনে এই মুখগুলোই দেখা যায়৷ আসলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বেছে বেছে এদেরকেই প্রতিটা সংবাদ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়৷ এদের সিংহভাগই খুব সতর্ক থাকে, যেন ‘বেকায়দা’ টাইপের কোনো প্রশ্ন উচ্চারিত না হয়৷ প্রতিটি প্রশ্নের আগে আবার বেশ কিছু বাক্য প্রয়োগ করা হয় প্রশংসামূলক৷ ফলে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া জবাবের প্রেক্ষিতে কোনো সম্পূরক প্রশ্ন আর কেউ করেন না৷ ফলে প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ‘‘আমরা ব্রিকসের সদস্য হতে চাইনি, চেষ্টা করিনি, কাউকে বলিনি,’’ তখন সবাই প্রবল বেগে সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে তার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেন৷
ব্রিকস সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই আমরা সবাই জানতাম যে, ৪০টি দেশ এরই মধ্যে ব্রিকসের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে৷ তার মধ্যে থেকে ২২টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছে৷ এই আবেদন করা ২২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি৷ আমরা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করলাম, তখন আবার ‘হতে চাইনি বা চেষ্টা করিনি’— এসব বলার যৌক্তিকতা কোথায়?
আসলে সত্যটা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে পারেনি৷ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারেনি৷ এই না পারাটা বিরাট কোনো ব্যর্থতা নয়৷ যে ২২টি দেশ আবেদন করেছিল, তারা সবাই তো চেয়েছিল সদস্য হতে৷ এর মধ্যে ১৬টি দেশেরই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি৷ তার মধ্যে বাংলাদেশও একটি৷ এতে লজ্জিত হওয়ার মতো কিছু নেই৷ এই ১৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের চেয়েও প্রভাবশালী, কিংবা ধনবান দেশ রয়েছে৷ তাদের কেউ কি দেশে ফিরে যেয়ে সংবাদ মাধ্যমকে ঘটা করেছে বলেছে যে, ‘‘আসলে আমরা চেষ্টাই করিনি, কারো কাছে তদবিরও করিনি?’’
কিন্তু আমাদের শাসকদের এটা বলতে হয়েছে৷ যে কারণে বলতে হয়েছে, সেটাও কিন্তু শেখ হাসিনা তার প্রেস কনফারেন্সে বলে দিয়েছেন৷ ওই যে বলেছেন, ‘‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ এখন এমন একটা পর্যায়ে আছে যে, বাংলাদেশ কিছু চাইবে কিন্তু পাবে না, এটা ঠিক নয়৷’’ এরকম বলার মাধ্যমে তিনি আসলে তার সরকারের সক্ষমতাটা বোঝাতে চেয়েছেন৷ মানুষের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি করতে চেয়েছেন যে, বাংলাদেশকে তার সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একটা সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছেন৷ উনি যেভাবে বলেছেন, ওঁর মন্ত্রীরা বা দলের নেতারা যেভাবে বলে থাকেন, জনগণও ঠিক সেভাবেই উপলব্ধি করে কি-না, সেটা অবশ্য ভিন্ন বিতর্ক৷ তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের এমন দাবিকে তেমন একটা গ্রাহ্য করে বলে মনে হয় না৷

এত সবেরবিপরীতে যে প্রশ্নটি উচ্চারিত হতেই পারে, সেটি হচ্ছে— ব্রিকসের সদস্য হওয়াটা আমাদের জন্য কি আসলেই খুব জরুরি? এই জোটটি কি আমাদের জন্য খুবই উপকারী? ব্রিকস কিন্তু খুব পুরোনো কোনো জোট নয়৷ এরই মধ্যে এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও কিছু প্রশ্ন ওঠেছে৷ প্রথমত, পাঁচটি দেশ নিয়ে জোটটি গঠিত হলেও এর কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, সেটা নিয়ে এরই মধ্যে কিছুটা হলেও টানাপোড়েন শুরু হয়ে গেছে৷ রাশিয়া, চীন, ভারত—এই তিন দেশই ব্রিকসের নেতা হতে চায়৷ সদস্য সংখ্যা বাড়লে তখন এই প্রতিযোগিতাটা আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে৷ এবার সম্মেলনের শুরুর আগেই তার কিছুটা নমুনা দেখা গেছে৷ কোন নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে এয়ারপোর্টে কে গিয়েছেন, এটাকেও অনেকে যার যার সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করেছে৷ এই যে ছয়টি দেশকে সদস্য করা হলো, কে কার সুপারিশে হয়েছে, সেটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে৷ চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জানিয়েছেন চীন নাকি সদস্য হতে বাংলাদেশের নাম বলবে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেরকম কিছু হয়েছে কি-না বলা কঠিন৷ আবার ভারত ও চীনের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের পুরানো বিরোধ, সেক্ষেত্রে চীন আমাদেরকে সমর্থন দিলে সেটা ভারতের কাছে ভিন্ন অর্থ হিসাবে আবির্ভূত হতে পারে৷ এই সম্মেলন শুরুর আগেই ভারতের একাধিক মিডিয়ায় এ নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে৷ একটি রিপোর্টে দেখেছিলাম, বাংলাদেশে চীনের বিপুল বিনিয়োগ ভারতকে কিছুটা হলেও সতর্ক করে তুলেছে৷ তাই বাংলাদেশের প্রতি আগের সেই ‘চোখ বন্ধ করে সমর্থন’ দেওয়া হয়তো আর থাকবে না৷  তাহলে এই রিপোর্টেরই প্রতিফলনই কি আমরা দেখলাম এবার ব্রিকসে সদস্যপদ না পাওয়ার মধ্যে?

যে কথাটা বলছিলাম, ব্রিকসে সদস্যপদ পাওয়াটা কি আমাদের জন্য খুব জরুরি ছিল? সদস্য হতে না পারাতে কি আমাদের বিশাল কোনো ক্ষতি হয়ে গেল? আমার কিন্তু সেটাও মনে হয় না৷ আমরা তো আরো অনেক আন্তর্জাতিক জোটের সদস্য, দু-একটা জোটের আবার আমরাই ছিলাম উদ্যোক্তা৷ যেমন সার্ক, কিংবা বিমসটেক৷ কী অবস্থা সেগুলোর? সার্কের মূল উদ্যোক্তা বাংলাদেশ৷ বেশ ঘটা করেই এটা গঠন করা হয়েছিল৷ শীর্ষ সম্মেলনগুলোও হতো বেশ জাঁকজমক করে৷ কিন্তু ফলাফল কী? শুরুতে সদস্যদেশগুলোর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃ্দ্ধির প্রত্যাশা নিয়েই এই জোটটি গঠিত হয়৷ কেউ কেউ ভেবেছিলেন- ধীরে ধীরে এটা হয়তো সহযোগিতার ব্যাপ্তি আরও বাড়াবে৷ কিন্তু হলো উল্টোটা৷ সদস্য দেশ অবশ্য বেড়েছে৷

আগে ছিল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রী লঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান৷ পরে এতে নতুন যুক্ত হয়েছে আফগানিস্তান৷ সদস্য বাড়লেও কর্মকাণ্ডে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা৷ সার্কের এই অচলাবস্থার জন্য দায়ী কে? এর জন্য দায়ী আসলে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বৈরিতা৷ কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের মধ্যেকার বিরোধ, সম্ভাবনাময় এই জোটকে একেবারেই অকার্যকর করে দিয়েছে৷

মাসুদ কামাল, সাংবাদিক
মাসুদ কামাল, সাংবাদিক

বিমসটেকেরও সদস্য বাংলাদেশ৷ কেবল সদস্যই নয় এই আঞ্চলিক জোটের সদর দপ্তরও ঢাকাতে৷ বিমসটেক এর পুরো নাম বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন৷ বেশ গালভরা নাম৷ এর বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের বহুজাতীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ৷ এই জোটের সদস্য দেশগুলো হচ্ছে—বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান৷ আসলে বিমসটেকের কাজটা কী? এ থেকে আমার এত বছরে কী পেয়েছি? খুব কি লাভবান হয়েছি? এসব প্রশ্নের সম্ভাব্য সকল জবাবই অস্পষ্টতায় ঢাকা৷ জোটটি গঠনের সময় লক্ষ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে৷ কতটুকু কী হয়েছে বলা কঠিন৷ যদি কোনো একটি দেশের সঙ্গে অপর দেশের এ ধরনের কোনো সহযোগিতামূলক কাজ হয়েও থাকে, সেটা ঠিক এই জোটে থাকার কারণেই হয়েছে— এমন কথাও বলা কঠিন৷ বহুদিন ধরে বলা হচ্ছিল, একটা বিমসটেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে৷ সেটার এখনো কোনো কিছু হয়নি, সবকিছুই রয়ে গেছে পরিকল্পনার মধ্যেই৷
অথবা যদি বলি ওআইসি’র কথা৷ অনেক বড় এবং অনেক পুরানো একটা জোট৷ এই জোটের বয়স অর্ধশত বছরেরও বেশি৷ এর সদস্য দেশগুলোর চরিত্রের মৌলিক একটা মিল রয়েছে—সবগুলোই মুসলিম অধ্যুষিত দেশ৷ ৫৭টি দেশ এর সদস্য৷ এই ৫৭টি দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ কোটি৷ এই বিশাল এবং ঐতিহ্যবাহী একটা জোট, কী কাজে লাগছে এটি? কী কাজে লাগে আমাদের? এ পর্যন্ত এই জোটটি কি তার কোনো একটা সদস্য রাষ্ট্রের বড় কোনো সমস্যার সমাধানে কিছুমাত্র ভূমিকা রাখতে পেরেছে? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া কঠিন৷ এটা বরং এখন আরব বিশ্বের প্রাধান্য সংবলিত একটা সংগঠনে পরিণত হয়েছে৷ এই জোটটি গঠিত হয়েছিল ইসরায়েল কর্তৃক আল আকসা মসজিদে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে৷ তখন জোটের সবাই ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন করেছিল৷ কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি কি আগের মতো আছে?

কদিন আগে দেখা গেল সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন বেশ একটা সখ্য সম্পর্ক স্থাপন করেছে ইসরায়েলের সঙ্গে৷ তাহলে আর ওআইসি’র সেই লক্ষ্যটি বজায় থাকলো কিভাবে? এই জোটের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত, শিয়া-সুন্নির বিরোধকে প্রশমিত করতে না পারা৷ সিরিয়া যে বলতে গেলে চোখের সামনেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি ওআইসি৷ ইয়েমেনের ওপর সৌদি সরকারের লাগাতার নির্যাতনের বিরুদ্ধেও কিছু করতে পারেনি এরা৷ আবার সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কারণেও ঐক্যবদ্ধভাবে এরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি৷ যেমন ধরা যাক, কাশ্মীর সমস্যা৷ সেখানে মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে৷ পাকিস্তান চায় এই বিষয় নিয়ে ওআইসি সোচ্চার হোক, ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ করুক৷ কিন্তু আবার যখন চীনের উইঘুরে মুসলিম নির্যাতনের প্রসঙ্গ ওঠে, পাকিস্তান তখন চুপ থাকে৷ তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না৷ উইঘুরের মুসলিমদের কষ্টের চেয়ে তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয় চীন সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটি৷

কেবল ওআইসি, সার্ক বা বিমসটেকই নয়, এরকম আরও অনেক আন্তর্জাতিক জোটের অকার্যকারিতার উদাহরণ দেওয়া যায়৷ এসব জোট আসলে সুবিধা বয়ে নিয়ে আসে জোটের অভ্যন্তরে থাকা ক্ষমতাধর দু-একটি দেশের জন্যই৷ ব্রিকসেও সেরকম কিছু হওয়ারই কথা৷ যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিশ্ব, ডলারের আধিপাত্যকে রুখতেই বিকল্প জোট হিসাবে ব্রিকসের জন্ম৷ কিন্তু এই জোটে চীন, রাশিয়া বা নতুন সদস্য ইরান যতটা সোচ্চার থাকবে সেই আধিপাত্যের বিরুদ্ধে ততটা কি সরব হবে ভারত? মনে হয় না৷ আবার চীনের সঙ্গে ভারতের যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিরোধ, সেটা কি কেবল একই জোটের সদস্য হওয়ার কারণেই সহজে মিটে যাবে? সেরকম কিছু প্রত্যাশা করাটাও যৌক্তিক হবে না৷

আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক জোটগুলোর এই যে টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হওয়া, এ কারণেই আমার মনে হয় ব্রিকসের সদস্যপদ না পাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য খুব বড় কোনো ব্যর্থতা নয়৷ আবার যদি প্রথমবারেই সদস্যপদ পেয়ে যেতো, সেটাও বড় কোনো সাফল্য হতো না৷ এই সদস্যপদ পাওয়া না পাওয়ার বিষয়টিকে বড় চেহারা দিয়েছে আসলে খোদ আমাদের সরকারই৷ তারা আসলে একটু বেশি আশাবাদী ছিল সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে৷ সামনে আমাদের জাতীয় নির্বাচন৷ সরকারি দল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নানা পরিকল্পনা করছে৷ সেইসব পরিকল্পনার অনেক কিছুকেই হয়তো নৈতিকতার বিচারে গণতান্ত্রিক বলা যাবে না৷ সেই বিষয়গুলো নিয়ে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে৷ সেসব প্রশ্ন নিয়ে সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের পাত্তা না দেওয়ার মনোভাব৷ সরকারপ্রধান প্রকাশ্যেই বলছেন— অ্যামেরিকা থেকে কিছু না কেনার কথা, সেখানে না যাওয়ার কথা৷ বলছেন— যুক্তরাষ্ট্র নাকি তার সরকারের পতন ঘটাতে চায়৷ এই সবকিছুরই সম্মিলিত নেতিবাচক ফল হচ্ছে—পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বৃদ্ধি৷
এরকম বাস্তবতায় সরকার হন্যে হয়ে খুঁজছিল বিকল্প কোনো আশ্রয়৷ চীনের কাছ থেকে কিছু অফার যে ছিল না, তা নয়৷ কিন্তু সেটা গ্রহণ করতে গেলে যু্ক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভারতকেও চটিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা থাকবে৷ এমন ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে দৃশ্যমান সমাধান ছিল ব্রিকসের সদস্য হতে পারা৷ সেটা হতে পারলে চীন-ভারত দুদেশকেই কাছে পাওয়া হতো, আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরকেও একটা জবাব দেওয়া যেতো৷ পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও জনগণের সামনে এমন কথা বলার সুযোগ থাকতো যে, ‘অ্যামেরিকা নেই তো কী হয়েছে, আমাদের সঙ্গে চীন ভারত রাশিয়া তো রয়েছে৷’ কিন্তু দুর্ভাগ্য আওয়ামী লীগ সরকারের, চীন-ভারত দুজনকেই কাছে পেতে যেয়ে ব্রিকসের ক্ষেত্রে দুজনের কেউই বাংলাদেশকে বিশ্বস্ত মনে করতে পারলো না৷

এখন সামনে রয়েছে জি-২০ সম্মেলন৷ কদিন পরেই ভারতে অনুষ্ঠিত হবে এই শীর্ষ সম্মেলন৷ এটি নিয়ে অবশ্য বড় কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নেই৷ তারপরও যদি সেখানে মোদীর সঙ্গে একটা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও হয়, হয়তো দেশে ফিরে সরকারের জন্য বলার মতো কিছু একটা থাকবে!

পূর্বের খবরদেশে কসমেটিকস ব্যবসার তদারকি করবে ঔষধ প্রশাসন
পরবর্তি খবরবাংলাদেশী আমলা-পুলিশের যুক্তরাষ্ট্রে ২৫২ বাড়ি!