বিএনপি আরো জনসম্পৃক্ত আন্দোলনের ভাবনায়

85

ঢাকাঃ দীর্ঘ আড়াই মাস পর তালা ভেঙে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করলেও নতুন কোনো কর্মসূচির ঘোষণা আসেনি৷ নেতারা বলছেন, তারা আন্দোলনে আছেন এবং শিগগিরই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে৷ বৃহস্পতিবার সকালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে তালা ভেঙে নয়া পল্টনে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশের করেন৷ এরপর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলটির সিনিয়র নেতারা৷

পাঁচ মাস ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর পর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার গুলশানের বাসায় ফিরেছেন৷ বিএনপির নেতা-কর্মীদের এখন সেদিকেই নজর৷

গত আড়াই মাসে দেখা গেছে, বিএনপি কোনো কর্মসূচির শেষ দিনে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে৷ ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তারা ৯ ও ১০ ডিসেম্বর লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগের কর্মসূচি পালন করে৷ কিন্তু ওই কর্মসূচি শেষ হলেও বিএনপি এখনো নতুন কর্মসূচি দেয়নি৷

বৃহস্পতিবার সকালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে তালা ভেঙে নয়া পল্টনে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করেন৷ তারপর সেখানে সংবাদ সম্মেলন এবং ৭ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র  প্রদর্শন করা হয়৷ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, দলের ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা জয়নুল আবেদিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন৷ তবে তারাও কোনো নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেননি৷

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, ‘‘৭ জানুয়ারি ভুয়া ও প্রশাসনের নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকার সংসদকে নিজেদের ইচ্ছেমতো কুক্ষিগত করে নিয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি৷ আওয়ামী লীগ যত দিন ক্ষমতায় আছে, তাদের অধীনে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে না৷ আজকে বিশ্ববাসীর কাছে আমরা যে আশঙ্কা করেছি, তা সত্যে পরিণত হয়েছে৷”

আবদুল মঈন খান বলেন, ‘‘বিএনপি উদার গণতান্ত্রিক দল৷ বিএনপি জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাস করে৷ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আছে৷ আমাদের উদ্দেশ্য ক্ষমতা নয়, বিএনপি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করে না৷ রাজনীতি করে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য৷ সেই আন্দোলনে আমরা আছি৷ জনগণের অধিকার জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেবো৷”

কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএপি এখন স্বাভাবিক কর্মসূচি দিয়ে দলকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চায়৷   আটক নেতা-কর্মীদের মুক্ত করে মিছিল সমাবেশের ধারায় ফিরে দলকে সংগঠিত করতে চায়৷ দলের তৃণমূলের কর্মীরা যাতে প্রকাশ্যে সভা সমাবেশে যোগ দিতে পারে সেই দিকেই এখন তাদের নজর৷ বৃহস্পতিবার সকালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা তালা ভেঙে নয়া পল্টনে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশের করেন৷ বিএনপি নেতা আবদুল মঈন খান বলেন (বই হাতে), ‘‘বিএনপি উদার গণতান্ত্রিক দল৷ বিএনপি জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাস করে৷ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আছে৷’

নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি বিএনপি৷ তারা চেয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া দেখে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করবে৷  বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া তাদের তেমন পছন্দ হয়নি৷ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘‘তাদের অবস্থান আরো স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল৷ তারা যা বলেছেন নির্বাচনের পরিস্থিতি তার চেয়েও খারাপ হয়েছে৷ তারা বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি৷ আসলে তো নির্বাচনই হয়নি৷”

এর বাইরে বিএনপির মাঠের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে৷ এরই মধ্যে মেরুকরণ শুরু হয়েছে৷ বিএনপির কয়েকজন নেতা মনে করেন, দেশে এবং দেশের বাইরে বিএনপিকে যারা তথ্য দিতেন, তারা সঠিক তথ্য দিতে পারেননি৷ তাই বিএনপি এখন স্বাভাবিক মিছিল-সমাবেশের আন্দোলনেই থাকতে চায়৷ বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা তাদের এ পর্যন্ত আন্দোলন নিয়ে পর্যালোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করবে বলে জানা গেছে৷ আগামী সপ্তাহে তাদের সঙ্গে বিএনপির বৈঠকের কথা আছে৷

 বিএনপির আন্দোলন বাস্তবতা

গত আড়াই মাসে বিএনপি অবরোধ, হরতাল, আদালত বর্জন, গণসংযোগ ও ভোট বর্জনের কর্মসূচি পালন  করেছে৷ তারা সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি- এইসব কর্মসূচি পালন করেছে৷

তাদের এই আন্দোলর ও ভোট বর্জনের মধ্যেই ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে৷ বুধবার সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন৷ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে৷ শেখ হাসিনা টানা চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন৷

বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ড নিয়ে নির্বাহী আদেশে কারাগারের বাইরে আছেন৷ কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা অনেক দিন ধরেই ভালো না৷ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওয়ান ইলেভেনের সময় দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেননি৷ তিনিও একাধিক মামলায় দণ্ডিত৷ আর দলের সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাঠে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও ২৮ অক্টোবরের পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন৷ বুধবার তিনি ৯ মামলায় জামিন পেয়েছেন৷ কারাগার থেকে বের হতে হলে তার আরো দুটি মামলায় জামিন দরকার৷

গত সাড়ে চার মাসে বিএনপির দেড় হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মীকে দণ্ড দিয়েছেন আদালত৷ এক দিনে ১১৯ জনকে সাজা দেয়ারও নজির আছে৷ তাদের প্রধানত ২০১৩-১৪ সালের মামলায় সাজা দেয়া হয়৷ সাজার মেয়াদ ছয় মাস থেকে আড়াই বছর৷

বিএনপির দাবি ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মহাসমাবেশের চার-পাঁচ দিন আগে থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে ২৫ হাজার ৪৩৯ জনেরও বেশি নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে৷ মামলা দেয়া হয়েছে ৭৭০ টিরও বেশি৷ আহত হয়েছেন চার হাজার ২৭৫ জনের বেশি নেতা-কর্মী৷

২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর দিন থেকে বিএনপি হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে৷ ২৯ অক্টোবর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ এরপর গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত থাকে৷ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই এখন কারাগারে৷

গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের দিনসহ পাঁচ দফায় সাত দিন হরতাল করেছে বিএনপি ও তাদের সমমনারা৷ এছাড়া ১২ দফায় ২৩ দিন সারা দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে অবরোধ কর্মসূচিও পালন করেছে তারা৷

২০ ডিসেম্বর থেকে তারা অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে আটদিন গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করে৷  ৭ জানুয়রি নির্বাচনের দিন ও তার আগের দিন তারা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল পালন করে৷ নির্বাচনের পর ৯ ও ১০ জানুয়ারি লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগের কর্মসূচি পালন করে দলটি৷ এদিকে ১ জানুয়ারি থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত আদালত বর্জনের কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা৷

বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) সকালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে আড়াই মাস পর  তালা ভেঙে নয়া পল্টনে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন৷

নতুন আন্দোলন কেমন হবে?

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘‘আমাদের আন্দোলনের এত বড় সম্ভাবনা থাকার পরও কেন নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনাকে বিদায় করতে পারলাম না, আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোথায় ত্রুটি ছিল কিনা, নেতৃত্বের কোনো দুর্বলতা ছিল কিনা তা আমরা পর্যালোচনা করছি৷ আমরা সামনের সপ্তাহে বিএনপির সঙ্গে এই বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠকে বসবো৷’’

তার কথা, ‘‘আমরা আন্দোলনকে এখন পুনর্গঠন করবো৷ বিএএনপি তাদের অফিস খুলেছে৷ এখন তারা জেলায় জেলায় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করবে৷ আমরা চাইছি, আরো মানুষ যাতে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় সেই ধরনের কর্মসূচি নেবো৷’’

সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্রুটি, নেতৃত্বের দুর্বলতা ছিল কি না তা পর্যালোচনা করছি: সাইফুল হক

আর বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক  সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘‘আমরা অবশ্যই এই পর্যন্ত আমাদের আন্দোলনকে পর্যালোচনা করে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবো৷ আমাদের নেতৃত্বসহ কোথাও কোনো ভুল আছে কিনা তা-ও আমরা দেখবো৷ আমাদের অনেক নেতা-কর্মী জেলে আছেন৷ দুই হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলায় কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে৷ তাদের কিভাবে কারাগারের বাইরে আনা যায় সেটা নিয়ে আমরা ভাবছি৷’’

তার কথা, ‘‘আমরা আন্দোলনেই আছি৷ দেশে-বিদেশে এটা স্পষ্ট যে, ক্ষমতায় থাকার জন্য এই সরকার একটি ভুয়া নির্বাচন করেছে৷ আমরা এটা ধরেই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবো৷ সারা দেশে সভা-সমাবেশের কর্মসূচি দিয়ে আরো মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করবো৷’’

পূর্বের খবরপ্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পেলেন ৬ জন
পরবর্তি খবরবঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ব্যারিস্টার সুমনের শ্রদ্ধা