বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিচার কার কথায়, কার কথায় কারাগার?

55
 ঢাকাঃ নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপির আটক নেতা-কর্মীদের ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব এবং দেশ সচল রাখার জন্য বিএনপির ২০ হাজার নেতা-কর্মীকে আটকের কথা বলে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। আর এই কথায় এখন প্রশ্ন উঠেছে সরকারের ইচ্ছায় যদি ধরা আর ছাড়া হয় তাহলে পুলিশ ও বিচার বিভাগের কাজ কী? আর বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, যেসব মামলায় সাজা দেয়া হচ্ছে তার ভিত্তিই বা কী? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য নেতারা এটা কৃষিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত মতামত বলে সমালোচনার জবাব দেয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন তাতে তো আর সত্য আড়াল হয় না।

‘এতে প্রমাণ হলো রাজনৈতিক কারণে মামলাগুলো করা হয়েছে’

গ্রেপ্তারের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মির্জা আব্বাসকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে (ফাইল ফটো)
গ্রেপ্তারের পর মির্জা ফখরুল ও মির্জা আব্বাসকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

কী বলেছেন কৃষিমন্ত্রী:

চ্যানেল টুয়েন্টি ফোর রোববার কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের একটি সাক্ষাৎকার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, দেশকে স্থিতিশীল রাখতে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জেলে রাখা হয়েছে বিএনপি নেতাদের। আর  বিএনপিকে নির্বাচনে আনার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে, তারা রাজি হয়নি। নির্বাচনে এলে তাদের সব নেতাকে এক রাতে মুক্তিরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছি। আব্দুর  রাজ্জাক প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তার সাক্ষাৎকারে সরাসরি বলেন,”২০ হাজার নেতা-কর্মীকে (বিএনপির) গ্রেপ্তার না করলে এই যে হরতালের দিনে গাড়ি চলছে সেটা চলত? এছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর ছিল না। কোনো অল্টারনেটিভ ছিল না। যেটা করেছি আমরা চিন্তা ভাবনা করে করেছি।” তিনি নির্বাচন নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন,”বার বার বলা হয়েছে এই নির্বাচন কমিশন থেকে তারা যদি নির্বাচনে আসে নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া হবে। এবং পিছিয়ে দেয়া নয়, বলা হয়েছিলো তাদের সবাইকে জেল থেকে ছেড়ে দেয়া হবে।”

No description available.

 

বিএনপি যা বলছে:

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “কৃষিমন্ত্রীর এই স্বীকরোক্তির মাধ্যমে প্রমাণ হলো রাজনৈতিক কারণে মামলাগুলো করা হয়েছে। এই মামলাগুলোর অপরাধের কোনো ভিত্তি নাই। আর এক রাতে বিএনপি নেতাদের জেল থেকে ছেড়ে দেয়ার যে প্রস্তাবের কথা বলেছেন তাতে প্রমাণ হয় বিচার বিভাগ তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। যত বিচার হচ্ছে, সাজা হচ্ছে তা সরকারের নির্দেশে হচেছ তা  একজন মন্ত্রী সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকার করলেন। আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যে এটা আদালত অবমাননার শামিল। আর তার কথা সত্য হলে বিচার বিভাগ প্রশ্নবিদ্ধ।”

তিনি যোগ করেন,”যেহেতু মন্ত্রী স্বীকার করে নিয়েছেন যে মামলাগুলো রাজনৈতিক তাই যাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হোক। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের ছেড়ে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। সরকার বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন সবাইকে এক করে ফেলেছে  নির্বাচনের জন্য। এটা কোনো নির্বাচনই নয়। আওয়ামী লীগই সব ঠিক করে দিচ্ছে কে কত আসন পাবে। কোনো বিরোধী দল নেই। এই নির্বাচন দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে।”

তারা যেভাবে চালায় সেভাবে চলে:

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির(সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন,”মিস্টার রাজ্জাক তার কথার মধ্য দিয়েই প্রমাণ করলেন আইন আদালত ওনারা যেভাবে চালান সেইভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। তার সহজ সরল স্বীকারোক্তি  দিয়ে প্রমাণ করলেন যে ওনারা আইন আদালত সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। ওনাদের কথায়ই সব কিছু পরিচালিত হয়। এটা একটা স্বাধীন দেশের জন্য খুবই লজ্জাজনক, অবমাননাকর এবং যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের ফ্যাসিবাদী  রূপের একটি নতুন প্রকাশ।”

তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন,”তার কথায় প্রমাণ হয়েছে ভাঙচুর বা নাশকতার  কারণে বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। তারা যাতে রাজপথে না নামতে পারে, আন্দোলন না করতে পারে সেজন্যই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

এদিকে মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্র্বাহী পরিচালক ফারুখ ফয়সাল বলেন,” বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থা খুবই দুর্বল অবস্থায় আছে। যারা ক্ষমতায় আছে তাদের হুকুমে বিচার চলে বলে মনে হয়। এবং তাদের প্রাণে যা চায় তারা তাই করে। তারা  ফখরুল সাহেবের সঙ্গে বিএনপির আরো এক নেতাকে ধরেছেন। তাকে জামিন দিয়ে এখন নির্বাচনে নমিনেশন দিয়েছেন। এখানে আইনশৃঙ্খলা নাই, বিচার ব্যবস্থা করায়ত্ব এবং নির্বাচন কমিশনও নিরপেক্ষ নয়। সুতরাং এখানে সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ এখন নাই।”

তার মতে,”যে মামলা হয়েছে তার ভিত্তি নাই। আর যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে তার যথার্থতা কতটা তা প্রমাণিত হয়নি। এখন আবার দেখলাম অনেক আগের মামলায় ফের গ্রেপ্তার শুরু হয়েছে। এইগুলো করা হচ্ছে কারণ  সরকার একটি রাজনৈতিক দলকে হয়তো চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছে। তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে এসব করা হচ্ছে।”

‘কৃষিমন্ত্রীর কথা তার ব্যক্তিগত মতামত’

আর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন,”রাজ্জাক সাহেব মিথ্যা বলার লোক নয়। দেশের মানুষও তার কথা সত্য বলে ধরে নিয়েছে। তার মতো দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর এই কথার পরে  আমাদের রাষ্ট্র ব্যস্থায় রুল অব ল বলে আর কিছু বাকি আছে কী না আমার জানা নাই। আর বার বার মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলেছে, রাজনৈতিক প্রসিকিউশনের কথা বলেছে। কৃষিমন্ত্রী  সেটা স্বীকার করে নিলেন।”

“আমরা তার কথার প্রমাণও দেখেছি । যেমন সরকারের প্রস্তাবে রাজি হওয়ায় ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরকে এক রাতেই জামিন দিয়ে নির্বাচনে মনোনয়নও দেয়া হয়েছে। আমাদের বিচার বিভাগ যদি ন্যূনতম স্বচ্ছতা বা তার ভগ্নাংশ রক্ষায় এগিয়ে আসে আসে তাহলে মন্ত্রীর বক্তব্য কগনিজেন্স-এ নেয়া উচিত। আর সরকার যদি মনে করে মন্ত্রী ঠিক বলেননি তাহলে সরকারের উচিত মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।”

এবিষয়ে  জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, “কৃষিমন্ত্রীর কথার ব্যাখ্যা আমরা দেব কেন? তার কথার জবাব তিনিই দেবেন। তার ওটা ব্যক্তিগত মতামত। এর সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নাই। দল এধরনের কথা বলতে পরে না। এটা দলের কথা হতে পারে না।”

রাজ্জাক ও ওবায়দুল কাদের সোমবার যা বললেন:

সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকরে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেন,”আমি যা বলেছি এটা অবশ্যই দলের বক্তব্য নয়, এটা আমি ব্যক্তিগতভাবে দিয়েছি। আমার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। তাদের আমরা নির্বাচনে আনতে চাই। কিন্তু আমাদের সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমার বক্তব্যের মূল কথা ছিল, আওয়ামী লীগ অন্তরিকভাবে নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ চেয়েছে। এই কথাটি বলতে গিয়ে আমি সেদিন কিছু কথাবার্তা বলেছি।”

আর সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন,” তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা তার ব্যক্তিগত মন্তব্য। আওয়ামী লীগ কোনো দেউলিয়া দল নয়। দলীয় নিয়ম নীতি ভঙ্গ করে এ ধরনের উদ্ভট প্রস্তাব বিএনপিকে দেবে, এটা সঠিক নয়। এ ধরনের কোনো প্রস্তাব আমাদের সরকারও দেয়নি, আমাদের দলও দেয়নি।”

তিনি বলেন, “বিএনপির ২০ হাজার নেতাকর্মী জেলে আছে-আমরা তা স্বীকার করি না। আর যারা পুলিশ পিটিয়েছে, হত্যা করেছে, প্রধান বিচারপতির বাড়িতে হামলা করেছে, হাসপাতালে হামলা করেছে তাদের তো আইনের আওতায় আসতেই হবে। কাউকে ক্ষমা করে নির্বাচনে আনার চিন্তা আমাদের নাই।”

আওয়ামী লীগের শীর্ষ ওই নেতার বক্তব্যের বিষয়ে দল কোনো ব্যবস্থা নেবে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “দলই সিদ্ধান্ত নেবে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা, আর কীভাবে ব্যবস্থা নেবে সেটাও দলের বিষয়। ”

পূর্বের খবরবাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য বড় পরীক্ষা: একদিকে ভারত-চীন-রাশিয়া, অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রঃ ইন্ডিয়া টুডে
পরবর্তি খবরবিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩০ ব্যক্তির দুর্নীতির জন্য ওপর মার্কিন ভিসা বিধিনিষেধ