বাঙালির ধর্ম ও সংস্কৃতিঃ মনস্তাত্বিক দ্বন্দ-বিভেদ

32
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাঙালি একটি সংকর জাতি। বাঙালি দর্শন বাঙালির ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কযুক্ত।
জীবনের নানা আচার আচরণকে প্রকাশের শৈল্পিক প্রয়াসই সংস্কৃতি নয়, আমাদের জীবনের সকল কিছু মিলেই আমাদের সংস্কৃতি। কালের বিবর্তনে সংস্কৃতি তার রূপ বদল করে। কিন্ত মানুষ বিশেষ কিছু কারণে তার শত সহস্র বছরের পুরনো সংস্কৃতিকে ধারন করে রাখে।
বাঙালির ধর্ম ভিন্ন কিন্ত সংস্কৃতি এক – এই বিষয়টি যদি কেউ প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে কি তিনি ভুল করবেন? তাকে কি মূর্খ বলা যাবে? জ্ঞানহীন বলা যাবে ? মূল সমস্যাই এখানেই। প্রগতিবাদীরা হলেন বড় মৌলবাদি। তাদের ধ্যান ধারনার বাইরে গেলেই আপনি মূর্খ,মৌলবাদি।প্রগতিশীল সভ্য সমাজে মানুষের থাকবে ধর্ম ও সংস্কৃতি পছন্দ অপছন্দের স্বাধীনতা। তাহলে হযরত প্রগতিশীল- আপনার তরিকায় থাকলেই সে ঠিক, আর আপনার তরিকায় না থাকলেই সে বেঠিক! আপনি আপনার ধর্ম্মকম্ম ঠিকই পালন করিতেছেন প্রগতিশীলতার কথা বলিয়া, অন্যজন তাহার ধর্ম পালন করিলে সেখানে আপনার জ্বলে কেন !
একখানা নমুনা প্রদান করিতেছি। পৃথিবীর সবচাইতে বিজ্ঞানমনস্ক বিদ্যাপিঠ বাংলার চারুকলার এক চারুবিজ্ঞানি চারুদা সম্প্রতি একখানি পোষ্ট দিয়েছেন পহেলা বৈশাখের পা হইতে মাথা পর্যন্ত বিষদ বর্ণনা দিয়া। চারুদার কিছু প্রগতিশীল ভক্তরা উহা শেয়ারও করিয়াছেন।

নিম্নে তাহা সম্পর্কে কিছু যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করিলুমঃ

চারুবিজ্ঞানি তাহার বৈশাখি দর্শনের বাহিরের সবাইকে কূপমন্ডূক বলিয়া গালি দিয়েছেন। কূপমন্ডূক অর্থ কুয়োর ব্যাঙ বা সীমিত জ্ঞানের মানুষ। চারুবিজ্ঞানী লক্ষী পেঁচাকে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক বলিয়া তাহার বিজ্ঞানমস্কতা প্রমাণ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন লক্ষী পেঁচা,হাতি,ঘোড়া,সাপ,ব্যাঙ এইসকল হইলো মোটিফ।
মোটিফ কি? মোটিফ হলো নকশা। হাঁড়ির ওপর আঁকা প্রাচীন সংস্কৃতি। পশু পাখি ফুল আঁকা হয় মাটির হাঁড়িতে। যা মূলত একদা একটি বিশেষ ধর্মের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিলো । যাহাকে বাঙালি সংস্কৃতি বলা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, বাঙলা কোন ধর্ম নয়, সংস্কৃতি। ধর্মপ্রভাবিত সংস্কৃতি। কোন ধর্ম ? সনাতন ধর্ম। যদি চারুদা অথবা অন্য কোন প্রগতিশীল আমার সহিত চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেন, আমি তাহাদিগকে নিমন্ত্রণ জানাইলুম, আমার সংগ্রহে অত্র উপমহাদেশের সবচাইতে প্রাচীন গ্রন্থ সমূহ রহিয়াছে, যাহা বাঙলা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিষয়ক। কাঁচের মতো পরিস্কার সেখানে বাঙলা সংস্কৃতির ধর্মপ্রভাব। বলা বাহুল্য ইতিপূর্বে খুব কম গবেষকই এই স্পর্শকাতর বিষয়ে গবেষণার সাহস করিয়াছেন। যাহারা করিয়াছেন তাহাদের গবেষণার সকল তথ্যাদিও আমার নিটক আছে। চাহিলে বিনামূল্যে বিতরণ করিবো।
প্রশ্ন হলো মঙ্গল শোভাযাত্রায় শুধু পেঁচা,বাঘ,টেপাপুতুল আসলো কেন ? টুপী,বোরকা,গাউন,মিনার,গম্বুজ, গামছা,পাজামা, কুলাকুলি,সেমাই, সালামি,পালকি এসব অনুপস্থিত কেন ! এগুলো কি বাঙলায় দেখা যায়নি কখনও?
চারুদা কহিলেন- মঙ্গল শোভাযাত্রার টাকা আসে টেপাপুতুল,পেইন্টিং,মুখোশ এসব বিক্রি করে . . . খুবই হাস্যকর। আমার এক বন্ধু গতবছরের মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনে কত টাকা খরচ হয়েছে তার উপর একটি হিসাব করেছিলো। সে পরিসংখ্যানের ছাত্র। টাকার অংকে যা কোটিরও বেশি! বুঝলাম তার হিসেবে ভুল আছে। ৫০ লক্ষ টাকা তো হবেই ! এখন প্রশ্ন হচ্ছে পুতুল পেন্টিং বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা আয় কি সম্ভব! সম্ভব হইলেও তাহার মধ্য থেকে ৫০% টাকা ঈলবাবা মতিঝিলের দরবারে যাওয়ার কথা। বাকি ২৫ লাখে তো এমন মহাযজ্ঞ সাধন হইবে না ! তাহলে কোটি টাকার উৎস কি ? চারুবিজ্ঞানী কহিলেন- ডোনেশনের কথা। ইয়েস। এই ডোনেশন আসে নির্দিষ্ট কিছু যায়গা থেকে যার পরিমাণ ৩ কোটিরও বেশি ! কি ভাবে বলছি ? চারুকলারই কিছু ঈলবাবা ( সবাই নয় ) জোশ বশত এই তথ্য প্রদান করেছিলো আমার কাছে ! এখন বলবেন ঈলবাবার ভক্তদের কথা কেন বিশ্বাস করিয়াছি ! তাহলে ভৎস শুনিয়া রাখুন- এরাই আয়োজকদের মধ্যে অন্যতম ছিলো। তথাকথিত শাহাবাগীদের একটা বড় অংশ এরা। আমি চারখানা বছর তাহাদের ষ্টাডি করিয়াছি খুব কাছ থেকে।
চারুবিজ্ঞানী আরও বলিয়াছেন – এই শোভাযাত্রার সাথে কোন ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই . . আসলেই !!! অসম্ভব। একটি প্রস্তাবনা রাখছি, আগামী বছর থেকে এর নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা বাদ দিয়ে ‘আনন্দ মিছিল‘ করে দেখান। সকল পুত্তলিকা (মোটিফ) অপসারণ করে দেখান। মোটিফের বদলে বড় বড় ব্যানার ফেষ্টুন নিয়ে আনন্দ মিছিল করেন। কপালে লাল টিপ সিঁদুরের পাশাপাশি ঘোমটা,বোরকা, টুপি সালোয়ার কুর্তি পরেন। পারবেন ! পারবেন না। কারণ একটি বিশেষ ধর্মের অনুসারীরা এর পেট্রোনাইজার। যারা এক ধরনের ফ্যালাসি অনুভব করেন।
প্রিয় চারুদা- ইহা কোন সাম্প্রদায়িক যুক্তি নহে, বরং লেবাসধারি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অপ্রিয় বচন।
যাহারা চারুবিজ্ঞানীর পোষ্ট শেয়ার করিয়াছেন বাঙালি সংস্কৃতি কানে ধরিয়া বুঝাইবার জন্য তাহাদের নিমিত্তে দুটি কথাঃ
অন্যের বিশ্বাসকে তাচ্ছিল্য করা, অন্যের বিশ্বাসকে মূর্খতা বা সীমিত জ্ঞান ভাবেন যাহারা – তাহারাই বড় মূর্খ। বড় মৌলবাদি। প্রতিটি বিশ্বাসকে সম্মাণ করতে জানাই উদারতা ও জ্ঞানের পরিচায়ক। নিরপেক্ষতার নির্দেশক। চারুবিজ্ঞানই বাঙালী দর্শন ও আদর্শের অক্সফোর্ড নহে। চারুকলাই বাঙালিয়ানার নির্ধারণ-কর্তা নহে। বাঙালি সংস্কৃতি এক জটিল মৌল তথাপি মিশ্র সংস্কৃতি। যাহার ব্যপ্তি সহস্র বছরের। পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়টি প্রাচীন সংস্কৃতি রয়েছে তাহার মধ্যে অন্যতম। আপনি কতদূর জানিয়া এই বিষয়ে লম্ফঝম্প করেন ! অন্যের ধার করা পোষ্ট পড়িয়া শিহরিত হইয়া শেয়ার করিয়া নিজেকে জ্ঞানী,প্রগতিশীল,উদারমনা প্রকাশের পূর্বে ভাবিয়া দেখেন- আপনি নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কতোটা জ্ঞাত বা অজ্ঞাত।
পরিশেষঃ
কথাগুলো ধর্মীয় উস্কানি নহে। মৌলবাদিতাও নহে। অতিব অপ্রিয় সত্যি ও বাস্তবতা। তথ্য প্রমাণ ব্যতিরেকে এই বান্দা কোন কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে না। যাহাদের আঁতে ঘা লাগিয়াছে তাহাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ – আসেন তথ্য প্রমাণ নিয়ে যান। খোলা আহবান রহিলো। আমিও বাঙালি, আমিও সাংস্কৃতিক কর্মী – তবে অসাম্প্রদায়িকতা প্রগতিশীলতার নামে নিজে মৌলবাদিতাকে আকঁড়ে ধরে রাখবেন, অন্যের অনুভূতিকে অসম্মাণ করিবেন তাহা মানিবো না বিধায় এই পোষ্ট।
কোন সংস্কৃতিই ধর্মনিরপেক্ষ নহে। সার্বজনীন নহে। আপনার নামের সাথে ইসলাম,আলী,হোসেন অথবা চক্রবর্তী,কুমার বদলাইবার স্পর্ধা কি আপনার আছে! অঞ্জন দত্তের সেই বিখ্যাত লাইনটি বলতে হয় – ধর্ম আমার আমি নিজে বেছে নেইনি . . . জ্বী। ধর্ম পেয়েছেন আপনি পরিবার থেকে। নিজে বেছে নেন নাই। ধর্মীয় রীতি সংস্কৃতির সাথে মিশাইবার অপচেষ্টা করিবার পূর্বে দেখে নিন আপনি প্রভাবিত ? নাকি উদাসীন।
ধর্ম ও সংস্কৃতি দুটি ভিন্ন বিষয় হলেও অভিন্ন। প্রতিটি ধর্মের যেমন সংস্কৃতি রয়েছে তেমনি প্রতিটি সংস্কৃতিও কোন না কোন ভাবে ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত। এই সত্য অস্বীকার করলে আপনি শতভাগ মৌলবাদি। তবে সংস্কৃতির মাধ্যমে যে নিরপেক্ষতার কথা বলা হয়, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হয়, নিরতপক্ষে তাহা উদ্দেশ্যমূলক। কারণ চারুবিজ্ঞান দর্শনে আবিষ্ট চারুদা বৈশাখ নিয়া যে পক্ষপাতদৃষ্ট পোষ্ট করিয়াছেন, তাহার ফেসবুক ওয়ালে মা দূর্গার ছবি দেখিতে পাইবেন। এখন কথা হইলো মা দূর্গার ছবি দেওয়াতে কি তিনি অপরাধি হয়ে গেলেন ! অবশ্যই না। তিনি ঠিকই তার ধর্মকে ধারন করেন, যতোই প্রগতিশীলতার কথা কহেন। তাহলে আমি যদি আমার ধর্মীয় আদর্শকে নিয়া, দর্শন নিয়া পোষ্ট দেই, অথবা আমার ধর্মীয় সংস্কৃতির বিপরীত কিছুকে অস্বীকার করি, তবে আমি কেন মৌলবাদী হইবো!
সৃষ্টিকর্তা বাঙালি সংস্কৃতির সঠিক মর্ম বুঝিবার তওফিক দান করুন।
লেখকঃ ইফতেখার শিশির
সাংস্কৃতিক কর্মী, বাঙালি।

 

পূর্বের খবরটঙ্গী বাজারের আড়ৎপট্টিতে আগুনে ১০টি গুদাম-দোকান পুড়ে ছাই, নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিটের কর্মীরা
পরবর্তি খবরঅপপ্রচার রোধে ভারতের সহযোগিতা চাইলো বাংলাদেশ