বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে ২০২৩ সাল

81

ঢাকাঃ বাংলাদেশে একটি জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ হয়েছে আগামী ৭ জানুযারি। এই নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে চলমান বছর।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। বিএনপি এবং আরো কিছু রাজনৈতিক দল আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে।

এর ফলে বছরের শেষ দিকে সহিংসতার জন্ম নেয়ে বাংলাদেশে। এছাড়া, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুাযায়ী প্রচারণা শুরু হলে, সারাদেশে ছোটখাটো সহিংসতা শুরু হয়।
রাজনৈতিক সংকটের কারণে পুলিশ, বিরোধী দলের কর্মী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়ে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে।

সহিংসতায় রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্য অংশে কয়েকজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। এই ধারা এখনো অব্যাহত আছে।

চলতি সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যুর বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো পাওয়া যায়নি। তবে, বেশ কিছু মানবাধিকার সংস্থা একাধিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংকলিত তথ্য অনুসারে,২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩ হাজার ৮৭৩ জন আহত হয়েছেন।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছে ৬৮৯টি। এ সব ঘটনায় কমপক্ষে ৬০ জন নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৪৩ জন।

গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে বাংলাদেশে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে, বিরোধী দলের ডাকা হরতাল ও অবরোধের সময় যানবাহন এবং বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে।

বিএনপির ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ কাঙ্খিত মাত্রায় সফল না হওয়ায়, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে শুরু করে। প্রথমে রাজধানীতে এবং পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা বাড়ে।

বিএনপি গত ২৯ অক্টোবর দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা পর্যন্ত হরতাল আহবান করে। এরপর থেকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দফায় দফায় দেশব্যাপী অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করছে।

এ সময়ে, সহিংসতার অভিযোগে বিরোধী দলগুলোর অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানায়, ২৮ অক্টোবর বিএনপির নয়াপল্টনে মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতার পর রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৩৬টি মামলা হয়েছে।

মামলায় বিএনপি এবং এর সমমনা রাজনৈতিক দলের ১,৫৪৪ জন নেতা-কর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া, বহু অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে এসব মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ২৮ অক্টোবর পর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত, রাজধানী থেকে বিএনপি এবং বিভিন্ন বিরোধী দলের ১ হাজার ৮১৩ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন থানায় সহিংসতা, নাশকতা, মারধর, পুলিশ সদস্য হত্যা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মোট ১৩১টি মামলা দায়ের হয়েছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে মোট ২৩ হাজার ৪৬০ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ সময়ে, একজন সাংবাদিকসহ ২৬ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে বিএনপি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান বলছে, ২৮ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত ৬৪টি বাস পোড়ানোর ঘটনায় নগরীর বিভিন্ন থানায় ৬৪টি মামলা হয়েছে।

এ ছাড়া, একই সময়ে, নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে জনগণ ও পুলিশের হাতে ১২ জনকে আটক হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স (এফএসসিডি) সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৮৯টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

এফএসসিডি সদর দপ্তরের মিডিয়া সেল জানায়, এ সময় ঢাকাসহ সারাদেশে মোট ২৮৫টি যানবাহন ও ১৫টি বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আগুন দেয়া গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে; ১৮০টি বাস, ৪৫টি ট্রাক, ২৩টি কাভার্ড ভ্যান, ৮টি মোটরসাইকেল এবং ২৯টি অন্যান্য যানবাহন। এছাড়া, কয়েকটি ট্রেনের বগিতেও আগুন দেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে, গত ১৯ ডিসেম্বর ভোরে রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকায় মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লেগে শিশুসহ কমপক্ষে চারজন নিহত হয়।

বিএনপি ও সমমনা বিরোধী দলের ডাকা দেশব্যাপী হরতালের এক ঘণ্টা আগে এ ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া, ২৩ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে সিলেট রেল স্টেশনে পার্কিং করা আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেসের একটি কোচে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

প্রতিদিন বাংলাদেশের কোনো না কনো অঞ্চল থেকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সহিংসতার খবর আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশে ২০২৩ সাল শেষ হতে যাচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে দিয়ে।

পূর্বের খবরবাংলাদেশে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ভারতের যে ধরনের ভূমিকা ছিল
পরবর্তি খবরদেশের নির্বাচনে ভোটারদের অধিকার কী আর কতটুকু?