বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহবান মার্কিন সংস্থাগুলোর

98
অনলাইন ডেস্কঃ বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িতদের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন সংস্থাগুলোর আহবান।

যুক্তরাষ্ট্রর  স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৫ আগস্ট) রাতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের দ্বিদলীয় টম ল্যান্টস হিউম্যান রাইটস কমিশনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে শুনানিতে অংশ নিয়ে বক্তারা এ আহবান জানান।

এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইউএস ইনস্টিটিউট অফ পিস এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের প্যানেলিস্টরাও এতে অংশ নেন।

শুনানির আয়োজক টম ল্যান্টস হিউম্যান রাইটস কমিশনের কো-চেয়ার কংগ্রেস সদস্য জেমস পি. ম্যাকগভার্ন এবং কংগ্রেস সদস্য ক্রিস্টোফার এইচ স্মিথ। আর মডারেটর ছিলেন কংগ্রেসের ল লাইব্রেরির ফরেন ল স্পেশালিষ্ট তারেক আহমেদ।

 

 

শুনানির ঘোষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অংশীদার এবং দেশটি প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। দেশটিতে সংসদীয় গণতন্ত্র থাকলেও মানবাধিকার ও শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এবং তার বর্তমান ও সাবেক ছয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাগনিটস্কি স্যাংশন আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। আরেকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৭০৩১ (সি) ভিসা স্যাংশন আরোপ করা হয়। সংস্থাটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে ব্যাপকভাবে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। সাংবাদিক ও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে হয়রানি, নজরদারি, শারীরিক আক্রমণ এবং গ্রেপ্তারের কারণে ২০২৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কেউ আগামী গণতান্ত্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় প্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টি করলে তাকে ভিসা দেবে না বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে ঘোষণা দিয়েছে।

রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটসের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি এন্ড লিটিগেশন বিষয়ক ফেলো ক্রিস্টি ইউয়েদা বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আমরা যেমনটা দেখেছিলাম, ঠিক তেমনি ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচনকে সামনে রেখে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী সাংবাদিক এবং সরকারের সমালোচকদের টার্গেট করে নাগরিক অধিকার সংকুচিত করার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

ক্রিস্টি ইউয়েদা বলেন, মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাবে ২০২৩ সালে সাংবাদিকদের ওপর ১৫১টি হামলা হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ছাড়াও সরকার মিডিয়ার ওপর আক্রমণ করেছে। এ বছরের জানুয়ারি মাসে রাষ্ট্র বিরোধী খবর প্রকাশের অপরাধে ১৯১ টি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। সভা-সমাবেশের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তারা উল্লিখিত মানুষ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতিশোধমূলকভাবে গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং ভীতি প্রদর্শন করছে। কারণ এই কর্মকর্তাদের অন্যায় কাজের জন্য কোনো জবাবদিহি করতে হয়না।

রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটসের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি এন্ড লিটিগেশন বিষয়ক ফেলো ক্রিস্টি ইউয়েদা বলেন, আমরা মনে করি যতক্ষণ পর্যন্ত না বাংলাদেশে সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে তদন্ত এবং খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ এবং কার্যকর জবাবদিহিতার পদক্ষেপ গ্রহণ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবেনা চলমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যারা একই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও নতুন  নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়টাতে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে যে গণতন্ত্রকে কার্যকর করার জন্য নাগরিক স্বাধীনতার সুযোগ দেয়া প্রয়োজন।

ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসের সাউথ এশিয়া প্রোগ্রামস বিষয়ক ভিজিটিং এক্সপার্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এশিয়া-প্যাসিফিক ডিভিশনের সিনিয়র অ্যাডভাইজর জেফ্রি ম্যাকডোনাল্ড বলেছেন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন শুধু নির্বাচনের দিনের স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে না। গোটা নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিএনপি বড় বড় সমাবেশ করছে। একটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে। উপযুক্ত নির্বাচনি পরিস্থিতির জন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে। তবে নির্বাচন সামনে রেখে সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ম্যাকডোনাল্ড বলেন, নির্বাচন কমিশন কয়েকটি অপরিচিত পার্টিকে নিবন্ধন দিয়েছে। দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। তিনি আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তিনটি কাজ করার পরামর্শ দেন। প্রথমত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকাশ্যে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপকে উপযুক্ত পদক্ষেপ বলে অভিহিত করে তিনি বলেন, এটার প্রয়োগ উভয় দলের ক্ষেত্রে সমানভাবে হতে হবে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠানো দরকার। এতে কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। নির্বাচনিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক অ্যাক্টরগুলোকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দিয়ে যেতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সিনিয়র এশিয়া গবেষক জুলিয়া ব্লেকনার বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাইবার সিকিউরিটি আইন যা করা হয়েছে, সেটা মূলত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনকেই অন্য নামে রূপান্তর করা হয়েছে।

এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন এবং এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টারের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেন, র‌্যাবের বিরুদ্ধে স্যাংশনের পর বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমে গেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে ২ হাজার ৬৮৩টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এরমধ্যে ২০২১ সালে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ছিল ১০৭টি। কিন্তু ২০২২ সালে এ সংখ্যা ৩১ জনে নেমে আসে। স্যাংশনের পর কমে গেছে গুমের ঘটনাও। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অতিমাত্রায় ক্ষমতাধর।

সূত্র: হিউম্যান রাইটক মিশন ডটহাউজডট গভর্মেন্ট

পূর্বের খবরদেশের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাঃ মাসিক কত টাকার কিস্তিতে কত টাকা পাওয়া যাবে?
পরবর্তি খবরউত্তরায় দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে শিক্ষার্থীর মৃত্যু