বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের নিরবতাও একটা বার্তা : শ্রীরাধা দত্ত

116

ঢাকাঃ বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের আগে ভারত তাদের অবস্থান ও সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু এবার নির্বাচনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও রাশিয়া তাদের অবস্থান স্পষ্ট করলেও নিরব রয়েছে ভারত।

নির্বাচন নিয়ে ভারতে যে কিছু বলছে না, এই কথা না বলা বা নিরবতাও একটি বার্তা বলে উল্লেখ করেছেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো ড. শ্রীরাধা দত্ত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে কেউ ভোট দিতে পারে নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর কারণ আগেই সেখানে বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছিল। ভারত-চীন ওই নির্বাচন মেনে নিলেও যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই ওই নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছিল। যে সরকারই আসুক বাংলাদেশ-ভারত একসাথে কাজ করতে পারবে আশাপ্রকাশ করে শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ভারত চাইবে ২০২৪ সালে এই সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। গতকাল রোববার বাংলাদেশের নির্বাচনে বিদেশি শক্তির প্রভাবগ্ধ শীর্ষক ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ এর বিশেষ ওয়েবিনারের তিনি এসব কথা বলেন।

এই ওয়েবিনারে মূল বক্তা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ। এছাড়া আলোচক হিসেবে ছিলেন- যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক মনির হায়দার।

প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাইরের প্রভাবের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ভারত। এবার নির্বাচন নিয়ে ভারত যে কিছু বলছে না এটাও একটা বার্তা। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো শুভেচ্ছাবার্তা আসে নি, এমনকি তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনও পাঠায় নি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র যতো সংকুচিত হবে, ততোই এখানে চীনের প্রভাব বিস্তারের পরিধি বাড়বে।

ড. শ্রীরাধা দত্ত প্রফেসর আলী রীয়াজের সাথে একাত্মতা পোষণ করে বলেন, নির্বাচন নিয়ে ভারতের কথা না বলাটাও একটা অবস্থান। নিজেরা ঠিক না থাকলে বাইরের লোক কথা বলার সুযোগ পায় মন্তব্য করে তিনি বলেন, দিল্লিতে যে সরকারই থাকুক না কেন, তারা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে একইভাবে কাজ করে। আওয়ামী লীগ যা কিছুই করুক না কেন, ভারত তা সামাল দেবে বলে বাংলাদেশে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয় নি। অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতার পালাবাদল হয়েছে।

তিনি বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অসাংবিধানিকভাবে পাশ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্যই ছিল ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা। সম্পূর্ণ বিতর্কিত এবং অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার টিকে আছে। প্রধানমন্ত্রী চাইলেও দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

ভোটাধিকার হরণ এর অর্থ মানবাধিকার হরণ উল্লেখ করে ড. মজুমদার বলেন, মানবাধিকার কারো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির স্পন্দনই হলো গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। তারা বাংলাদেশ বিষয়ে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে এগুলো হস্তক্ষেপ নয়। এগুলো তাদের মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিরই অংশ। কিন্তু, তাদের কথা না শুনে আমরা অনেককে শত্রু বানিয়েছি। জনগণ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি, কারণ জনগণও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়।

সম্পূর্ণভাবে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই কমিশন একের পর এক বিতর্ক সৃষ্টি করে চলেছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও এখন আর রাষ্ট্রীয় নয়। তারা সব দলীয় হয়ে গেছে, নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। ২০১৮ সালের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও প্রতিযোগিতামূলক হয় নি। সে সময় প্রধানমন্ত্রী সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কী হয়েছে তা আমরা দেখেছি।

এম হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশকে বিশ্বের মানুষ গণতান্ত্রিকই দেখতে চায়। আমাদের অভ্যন্তরীণ ঘাটতিগুলোর কারণে বাইরের কথা শুনতে পাই। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সংকুচিত হয়ে যাবে- এমনটাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বের হওয়ার পর যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য জাতীয় ঐক্যমত প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।#

পূর্বের খবরজাতীয় নির্বাচন ঘিরে যেসব কারণে উষ্ণ হয়ে উঠছে অক্টোবর মাস
পরবর্তি খবরফ্রান্সে “হিউম্যান রাইটস্ ভায়োলেশন ইন বাংলাদেশ” শীর্ষক সেমিনার অনুস্ঠিত