‘ফেসবুক বন্ধু’ ও বন্ধুত্বের বিড়ম্বনা

57

ঢাকাঃ এইতো অল্প কিছুদিন আগের কথা। কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি তখন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছি। সেখানে ‘শিক্ষক’ পদে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। অনেকেই নানা সোর্স ধরে যোগাযোগ শুরু করলেন। তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি আমার সঙ্গে দুবার ফোনে যোগাযোগের পর ফেসবুকে ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ পাঠালেন। সেটা অ্যাকসেপ্ট করলাম।

ইন্টারভিউ বোর্ডে ওই ব্যক্তি যথেষ্ট খারাপ পারফর্ম করলেন। তিনি একটি টিভি চ্যানেলে কয়েকবছর ধরে কাজ করছেন। অথচ একটি টিভি স্টেশনের প্রোডাকশন বা নিউজ বিভাগ নিয়ে তার স্পষ্ট ধারণা নেই। পিসিআর, এমসিআর, এনসিএ বা পিটিও-এর অর্থ কী, এই প্রাথমিক জ্ঞানটুকু তার নেই। প্রতিদিন ব্যবহার্য, অনিবার্য এবং সাধারণ এই শব্দগুলোর ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারলেন না উল্টো মনগড়া অর্থ বলে যাচ্ছেন।

আমি খুব বিরক্ত হলাম। তাকে বললাম, ‘আপনি টেলিভিশনে প্রোডাকশন টিমে কাজ করছেন, অথচ পিসিআর, এমসিআর, এনসিএ কী- তা বলতে পারছেন না।’

তার চাকরিটা হয়নি। কদিন পর খেয়াল করলাম, তিনি আমার ‘ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট’-এ আর নেই। তার ‘বন্ধু তালিকা’ থেকে তিনি আমাকে বাদ দিয়েছেন।

নিয়োগ বোর্ডের আমি একজন সদস্যমাত্র। আমার বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমার মতামতের মূল্য রয়েছে বৈকি, তবে ব্যাপারটি এমন নয় যে একা আমার সিদ্ধান্তে কারও নিয়োগ নিশ্চিত বা বাতিল হবে। আমি তাকে যোগ্য মনে করিনি এবং বোর্ডের বাকি সদস্যদেরও তাকে পছন্দ হয়নি।

আমি বিশ্বাস করি, কয়েক মিনিটের একটি ইন্টারভিউ দিয়ে একজন ব্যক্তির মেধা বা যোগ্যতাকে সবসময় সঠিকভাবে যাচাই করা যায় না। বিশেষ একটি দিনে বিশেষ একটি সময়ে চলমান ইন্টারভিউ নানা কারণেই ভালো বা খারাপ হতে পারে। কিন্তু যার কথা বলছি, চাকরিটা কি তার প্রাপ্য ছিল। তিনি কি যোগ্য ছিলেন।

আরও কয়েকজনকে দেখেছি, নানা দরকারে ফেসবুকে তারা বন্ধু তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন। কাজ না হলে তাদের কেউ কেউ তালিকা থেকে বিদায় নিচ্ছেন।

বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো প্রয়োজনে বা একেবারেই কোনো প্রয়োজন ছাড়া আদান-প্রদান হতেই পারে। সেই আদান-প্রদান নিরীহ ও নির্মোহ। এক বন্ধুর দরকারে অন্য বন্ধু পাশে দাড়াবে। সুযোগ থাকলে চাকরি দিয়েও সহযোগিতা করতেই পারে। কিন্তু আপনার চাকরিটা হলো না বা আপনার বিবেচনায় যে আপনাকে চাকরিটা ‘দিলো না’ বলে তাকে ত্যাগ করছেন, সেখানে কখনোই বন্ধুত্ব ছিল না। সেখানে ছিল লোভ। আর ছিল কপটতা। ছল ছিল। এত নিম্নমানের ‘লেনদেনের’ আশায় আর যা-কিছুই হোক, বন্ধুত্ব হয় না।

‘ফেসবুক ফ্রেন্ড’ কথাটিই আমার বিশেষ অপছন্দের। ফেসবুকের ‘ফ্রেন্ডলিস্ট’-এ কেউ যোগ হলেই সে আমার ‘ফ্রেন্ড’ বা ‘বন্ধু’ হওয়া এত সোজা ব্যাপার।

আমার পুরনো শিক্ষার্থীদের অনেকে চাকরিসহ নানা প্রয়োজনে এখনও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী নিজের শিক্ষকদের বদলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে ইন্টার্নশিপ, চাকরি, গবেষণা কিংবা বইপত্রের খোঁজখবরের জন্য। আমি সবার জন্যই চেষ্টা করি; কখনও কাজ হয়, কখনও হয় না। আমার পুরনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন রয়েছেন, যারা কেউ অ্যাকাডেমিক জ্ঞানের বিচারে দারুণ মেধাবি, আবার কেউ সাংবাদিকতার প্রায়োগিক বিষয়গুলোতে খুবই দক্ষ।

তাদের কয়েকজনের জন্য অনেকদিন ধরে চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত ভালো বা তাদের চাকরির কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি। কিন্তু দরকার ফুরিয়েছে বলে বা প্রয়োজন মেটেনি বলে তারা আমার সঙ্গ ত্যাগ করেননি; আমার পেশাগত বা ব্যক্তিগত যে কোনো দরকারে এখনো তারা পাশে এসে দাড়ান। ডাকলে তো আসেনই, না ডাকলেও তারা নিজে থেকে এসে খোঁজখবর নেন এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারলেও গবেষণা বা লেখালেখির কাজে তাদের যথাসাধ্য সহযোগিতার চেষ্টা করি। সময়-অসময়ে আমি তাদের বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে হলেও পাশে থাকার চেষ্টা করছি। এরচেয়ে বেশি তারাও কখনো দাবি করেননি। বন্ধুত্বের জন্য এটিই কি যথেষ্ট নয়।

তাদের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের ‘লেনদেনের’ সম্পর্ক বা চুক্তি নেই। আমার সাধ্যমতো তাদের সহযোগিতা করা বা আমার দরকারে তাদের এগিয়ে আসার মধ্যে কোনো স্বার্থ জড়িয়ে নেই। তাহলে, তারাই কি আমার প্রকৃত বন্ধু নন।

বন্ধু হিসেবেই আমরা একজন আরেকজনের দরকারে সহযোগিতার চেষ্টা করি। শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব মনে করে আমি তাদের জন্য চাকরি, ইন্টার্নশিপ বা গবেষণা ইত্যাদি দরকারে যতটা পারি, তাদের এগিয়ে দিতে চেষ্টা করি। এখানে আমরা কেউ কোনো ‘বিনিময় মূল্য’ আশা করি না।

এখানে আমরা কেউ কোনো ‘বিনিময় মূল্য’ আশা করি না। বন্ধুত্ব তো এমনটিই হওয়ার কথা। আমাকে পারতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতার শর্তে বন্ধুত্ব হয় না। বন্ধু হিসেবে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম কি না, সেটিই এখানে মুখ্য। তারাও যে আমার সব প্রয়োজনে সবসময় সহযোগিতা করতে পারে, তা নয়।  তাই বলে কি আমি তাদের সঙ্গ ত্যাগ করব। আমি তো দেখতেই পাচ্ছি, তারা চেষ্টাটা অন্তত করেছে। সে-ই তো ঢের।

‘বন্ধু’ বা ‘বন্ধুত্ব’ শব্দগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবে নির্বিচারে ব্যবহারের কারণে এসব শব্দের অর্থ পাল্টে যাচ্ছে। এ শব্দগুলোর গুরুত্ব ও সৌন্দর্য কমে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, শব্দ কেবল শব্দ নয়। এমন একেকটি শব্দ তৈরি হয় মানুষের একেক রকমের সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য, গভীরতা ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগকে ফুটিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে।

বন্ধুত্ব সম্পর্কে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘বন্ধু হলো ভিন্ন দুটি দেহে একটিমাত্র আত্মার বসবাস।’ অভিন্নহৃদয় না হলে কি বন্ধু হওয়া যায়।

আমরা ভুলে গেছি, সবাই সবার ‘বন্ধু’ হতে পারে না। আর, নিছক প্রয়োজনের খাতিরে যোগাযোগ কোনো বিচারেই ‘বন্ধুত্ব’ নয়।

 

সজীব সরকার: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

পূর্বের খবরজুলাই মাসে রোমানিয়ায় ৫৫ বাংলাদেশি আটক
পরবর্তি খবরদেশি গরু ভেড়া ও হাঁসের জিনরহস্য উন্মোচন