দুর্নীতি দমন কমিশনের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ৬৪৯৪ মামলা, বিলম্বের কারণ জানালো কমিশন

72

২০০৪ সালে বিলুপ্ত হওয়া ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’র আগের মামলার  হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘ব্যুরো’র সময়ে করা ৪১২টি মামলা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এরমধ্যে উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আছে ১৮৭টি। তবে দুদকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিলুপ্ত ব্যুরোর ৩৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

দুদকের ভেতর-বাহির, গ্রাফিকস: গাজী শাজাহান

দুদকের মামলা পরিচালনা

আদালত ও দুদক সূত্রে জানা যায়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, আয়কর ফাঁকি ও দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে সম্পদের তথ্যে গরমিল, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, কেনাকাটায় দুর্নীতি ও অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের তফসিলভুক্ত অপরাধে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা দুদকের অন্যতম দায়িত্ব। দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তের পাশাপাশি প্রসিকিউটিং সংস্থা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে দুদক।

মামলার রায় ও নিষ্পত্তি

বিশেষ জজ আদালতে ২০২২ সালে ৩৪৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক। এরমধ্যে কমিশনের দায়ের করা মামলা ৩০৭টি। বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মামলা ৩৯টি। দুদকের দায়ের করা ৩৪৬টি মামলা বিচারিক আদালত বা অধস্তন আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। এরমধ্যে ২১১টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ ২০২২ সালে ১৩০টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে বলে জানানো হয়েছে। অপরদিকে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ প্রান্তিকে ৯৯টি মামলার রায় হয়েছে অধস্তন আদালতে। এরমধ্যে ৬২টি মামলায় সাজা হয়েছে আসামিদের। এছাড়া গত এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তিন মাসে ১৮৯টি মামলার রায় হয়েছে অধস্তন আদালতে। এরমধ্যে ১১৪টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে।

ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য সাজা ও দণ্ড 

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি অধস্তন আদালতের রায়ে মেসার্স সফিক ট্রেডিং অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. রফিকুল আলম ও তার সহযোগী আব্দুস সামাদকে এক বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। একইসঙ্গে প্রত্যেককে পাঁচ কোটি ৫০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে আরও ছয় ও চার মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই দিন গোপালগঞ্জের সহকারী সাবরেজিস্ট্রার মো. এনায়েত হোসেনকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। ৪ জানুয়ারি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলামকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি জনতা ব্যাংকের এজিএম মো. শমী উল্লাহসহ দুজনকে ২ বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত। ৯ ফেব্রুয়ারি ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি) শাহ মো. হারুনসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে আদালত। প্রত্যেক আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া ছাড়াও এক কোটি টাকা করে জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও ২ বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২৮ মার্চ সাবেক সেটেলমেন্ট অফিসার আশরাফ আলীকে ৫ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উপ-কর কমিশনার আলী আকবরকে ১৮ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন আদালত। ২৮ মে রূপালী ব্যাংকের লক্ষ্মীপুরের পোদ্দারবাজার শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার আব্দুল লতিফ ভুঁইয়াকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। বগুড়ার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রধান অফিস সহকারী খয়বর রহমানকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং রাজধানীর পুরানা পল্টনের জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড প্রিন্টিং পেপার্স লিমিটেডের পরিচালক মো. সেলিম প্রধানকে ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৪ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত।

অধস্তন ও উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনা

দুদক সূত্রে জানা যায়, মামলা দায়েরের পর বিবাদী পক্ষ আইনি প্রতিকার পেতে বিচারিক আদালতসহ উচ্চ আদালতে যান। মামলার ওপর স্থগিতাদেশের জন্যও অনেকে উচ্চ আদালতে যান। কোনও ব্যক্তির সম্পদের হিসাব চাইলে তিনি উচ্চ আদালতে দুদকের সংশ্লিষ্ট নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিটও করেন। তখন সেই রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুদক তার কার্যক্রম চালাতে পারে না। যে কারণে দুদকের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়ছে। মামলা পরিচালনায় অধস্তন আদালতে দুদকের নিজস্ব আইনজীবী প্যানেল রয়েছে। এছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে দুদকের মামলা পরিচালনা করতে ২৬ জন আইনজীবী নিয়োজিত রয়েছেন। মামলার বিষয়ে কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য একজন আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট সেলে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন।

দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণ সম্পর্কে উচ্চ আদালতে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিচারিক ও উচ্চ আদালতে দুর্নীতির মামলা নিয়মমাফিক চলছে। এখানে দুদকের কিছু করার নেই। সব মামলাই দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক মামলাই তালিকায় আছে। এগুলো ধারাবাহিকভাবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।’

বিচারিক আদালতে নিয়োজিত দুদকের আরেক সিনিয়র আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুদকের হোক আর যারই হোক, মামলা যখন ফাইল হয়ে যায়, তখন এগুলো কোর্টের মামলা হয়ে যায়। কোর্ট মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে তার একটা নিজস্ব পদ্ধতিতে। এখানে সাক্ষী আসতে হবে। সাক্ষী যদি না আসে তাহলে আদালত ব্যবস্থা নেবে।’ তিনি বলেন, ‘মামলা দীর্ঘায়িত হলে বাদী-বিবাদী সবাই ভোগান্তির শিকার হয়। তবে সব কিছুই হয় আদালতের এখতিয়ারে।’

দুদকের বক্তব্য

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘মামলা যেটা কোর্টে আছে, সেটার বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। আদালত ফুল ট্রায়াল করার পরই তো রায় দেবেন। আর আমাদের এখানে মামলা হওয়ার পরে তদন্তের বিষয়টি দুদক আইনে সময় বেঁধে দেওয়া আছে। কিন্তু অনেক সময় সে সময় অনুযায়ী তারা শেষ করতে পারেন না। তথ্য, উপাত্ত, সাক্ষ্য ও ডকুমেন্ট জোগাড় করতে অনেক সময় লাগে। এজন্য কিছুটা বিলম্ব হয়। কিন্তু আমাদের প্রতি সপ্তাহে কমিশন সভা হয়। কমিশন এ বিষয়ে সজাগ রয়েছে, যাতে মামলার তদন্ত বেশি দীর্ঘায়িত না হয়।’

এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তা এখানে সিআরপিসির ধারা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারবেন না। তিনি সেটা অনুসরণ করবেন। কিন্তু দুদক আইনে বলা আছে—অনুসন্ধান কতদিনে করা লাগবে এবং তদন্ত কতদিনে করতে হবে। কিন্তু সঙ্গত কারণেই ওই সময়টা সবসময় মেনে চলা যায় না।’

পূর্বের খবরজাতীয় নির্বাচনে মার্কিন চাপের গভীরতা নিয়ে বড় ২ দলেই অস্থিরতা বিরাজ করছে
পরবর্তি খবরজাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি