নরেন্দ্র মোদী গত নয়ই জুন ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় বারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ছাড়া ভারতীয় জনতা পার্টি এবং এনডিএ জোটের অন্যান্য সহযোগী দলের সদস্য মিলিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ৭১ জন শপথ গ্রহণ করেছেন। গত দুই মেয়াদের তুলনায় এখনও পর্যন্ত এটাই ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকারের সবচেয়ে বড় মন্ত্রী পরিষদ। তবে এই বিরাট আয়তনের নবনির্বাচিত মন্ত্রিসভায় কোনও মুসলিম মন্ত্রী নেই। পাঁচ বছর আগে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ২৭ জন মুসলিম এমপি নির্বাচিত হলেও, ২০২৪ সালে হয়েছেন ২৪ জন। অর্থাৎ তিনজন এমপি কম। সব দল মিলিয়ে ২০১৯ সালে যত মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করানো হয়েছিল, ২০২৪-এ তার থেকে ৪১ জন কম মুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
নিউজ২১ডেস্কঃ ভারতের নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থী আর সংসদে মুসলিম এমপি’র সংখ্যা ক্রমশ কমছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও মুসলিম সাংসদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শপথ নেননি।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও বিরোধী দলের নেতারা মনে করেন, দেশের রাজনীতিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার এই প্রবণতা কিন্তু উদ্বেগজনক।
যদিও এই অভিযোগ মানতে নারাজ বিজেপি। তাদের দাবি, বিজেপি ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে ভোটের টিকিট দেয় না এবং তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পটভূমি নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণের স্বার্থে কাজ করে থাকেন।

মন্ত্রিপরিষদ কাঠামো
অষ্টাদশ লোকসভায় বিজেপির ঝুলিতে এসেছে ২৪০টি আসন। আর তাদের এনডিএ জোটের শরিকদের কাছে রয়েছে ২৯৩টি আসন।
গত রোববার প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৭২জন মন্ত্রিসভার সদস্য শপথ নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬১ জন সদস্য বিজেপির এবং ১১জন সদস্য এনডিএ-র শরিক দলের।
২০১৪ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। সেই বছর মন্ত্রিসভায় ২৪ জন ক্যাবিনেট পদমর্যাদাসহ মোট ৪৬ জন সদস্য ছিলেন।
মি. মোদীর দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন ২০১৯ সালে। সেই দফায় মন্ত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭।
এইবার ওই সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট ৭২ জন। তবে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পায়নি কোনও মুসলিম সদস্য। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদীর তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর কিরেন রিজিজুকে কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।
কিরেন রিজিজুর পাশাপাশি জর্জ কুরিয়েনকেও তার দফতরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেরালার বিজেপি নেতা জর্জ কুরিয়ান খ্রিস্টান।
২০১৪ সালে ডঃ নাজমা হেপতুল্লা কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। রাজ্যসভার এই সাবেক সাংসদ বর্তমানে মণিপুরের রাজ্যপাল।
২০১৯ সালে, প্রধানমন্ত্রী মোদী দলের রাজ্যসভার সাংসদ মুখতার আব্বাস নকভিকে সংখ্যালঘু বিষয়ক বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যদিও তিনি ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন। এরপর বিজেপির স্মৃতি ইরানিকে সংখ্যালঘু বিষয়ক দফতরের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কাজেই সেদিক থেকে দেখতে গেলে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই (২০২২ সাল থেকে) বিজেপি সরকারের মন্ত্রীপরিষদে কোনও মুসলিম মন্ত্রী ছিলেন না, সংসদের কোনও কক্ষেই কোন মুসলিম সাংসদও নেই।
তা ছাড়া তথ্য বলছে, গোটা দেশে বিভিন্ন বিধানসভায় বিজেপির এক হাজারের বেশি বিধায়ক থাকলেও মুসলিম বিধায়ক রয়েছেন মাত্র একজনই।
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ১৭.২২ কোটি মানুষ মুসলমান সম্প্রদায়ের এবং এই অঙ্কটা মোট জনসংখ্যার ১৪.২ শতাংশ।
অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনে ২৪ জন মুসলিম সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১ জন বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার শরিক দলের।

রাজনৈতিক দলের বক্তব্য
ভারতীয় জনতা পার্টিতে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব হ্রাসের বিষয় নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছে বিরোধী দল এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
গত তেসরা মে কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিমদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। দেশে এই প্রথম লোকসভা ও রাজ্যসভায় একজনও মুসলিম সাংসদ নেই।”
“মন্ত্রিসভাতেও কোনও মুসলিম মন্ত্রী নেই। বিজেপি যা করেছে সেটা ভুল।”
তিনি আরও বলেন, পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারের আমলে দেশের জনসংখ্যার ভিন্ন ভিন্ন স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে বিষয়টিকে নজরে রাখা হয়েছে তা হল প্রার্থীর ‘জেতার ক্ষমতা’ আছে কি না।
একইসঙ্গে বিজেপি এই অভিযোগও অস্বীকার করেছে যে তারা মুসলিমদের ভোটের টিকিট দিতে চায় না।
অমিত শাহ ২০২২ সালে এক ভাষণে এই অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে বলেছিলেন, তার দলে নির্বাচনি টিকিট দেওয়ার ভিত্তি হলো প্রার্থীর ভোটে জেতার ক্ষমতা। সেই সময় দেশের বিভিন্ন বিধানসভায়, বিশেষত উত্তরপ্রদেশে একজনও মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট না দেওয়ার যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার প্রেক্ষিতে তিনি তার দলের হয়ে কথা বলতে গিয়ে এই ব্যাখ্যা করেছিলেন।
উত্তরপ্রদেশে চার কোটি মুসলিম রয়েছে এবং তারা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ।
বিষয়টা এমন নয় যে বিজেপি এর অতীতে কখনও মুসলিম প্রার্থীদের ভোটের টিকিট দেয়নি। কিন্তু গেরুয়া শিবিরে নির্বাচনি টিকিট পাওয়া মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা ক্রমশ কমতে কমতে শূন্যতে গিয়ে ঠেকেছে।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সাতজন মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিল। ২০১৯ সালে ছয়জন মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছিল বিজেপি।
তবে ২০১৪ ও ২০১৯ সালে বিজেপির একজন মুসলিম প্রার্থীও নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। এবারের লোকসভা ভোটে বিজেপি একজন মুসলিম প্রার্থীকেই টিকিট দিয়েছিল।
বিজেপির টিকিটে ভোটেব লড়ে লোকসভায় পৌঁছানো শেষ মুসলিম সাংসদ ছিলেন শাহনওয়াজ হুসেন। ২০০৯ সালে ভোটে জিতেছিলেন তিনি।
শাহনওয়াজ হুসেন মনে করেন হাতে গোনা কয়েকজন মুসলিম প্রার্থীকে ভোটে টিকিট দেওয়া হলেও যারা নির্বাচনে জিতেছেন তাদের নিশ্চিত করা উচিৎ যে সমস্ত সম্প্রদায়ের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেন কোনওভাবেই বৈষম্য মূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিজেপি মুখপাত্র ও রাজ্যসভার সাবেক সাংসদ জাফর ইসলাম বলেন, “কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো বিজেপিকে হারাতে এবং তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য মুসলিমদের ব্যবহার করছে।”
এই প্রসঙ্গে তার পালটা যুক্তি, “কোনও দল যদি কোনও মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট দেয় এবং মুসলিমরা যদি তাকে ভোট না দেন, তাহলে কোন দল তাদের টিকিট দেবে?”
ভারতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে মুসলিম জনসংখ্যার নিরিখে কিন্তু সংসদে কিন্তু মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেলেও সংসদে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব পাঁচ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে।
পরিসংখ্যান বলছে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থী ছিলেন ১১৫ জন, ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৮।
ভারতের নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থী ও মুসলিম এমপি’র সংখ্যা ক্রমশ কমছে

পাঁচ বছর আগে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ২৭ জন মুসলিম এমপি নির্বাচিত হলেও, ২০২৪ সালে হয়েছেন ২৪ জন। অর্থাৎ তিনজন এমপি কম।
সব দল মিলিয়ে ২০১৯ সালে যত মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করানো হয়েছিল, ২০২৪-এ তার থেকে ৪১ জন কম মুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে সংখ্যার দিকটা দেখে নেওয়া যাক।
ভারতে এবারের লোকসভায় সংসদে বসবেন ২৪ জন মুসলিম এমপি। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এমপি বসবেন প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জন্য নির্ধারিত বেঞ্চে – ৭ জন। এরপরেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলিম এমপি লোকসভায় পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস। পাঁচ জন।
উত্তরপ্রদেশের প্রধান বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি থেকে নির্বাচনে জয়লাভ করেছে চার জন মুসলিম প্রার্থী। কেরালার দল ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ থেকে তিন ও কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স থেকে দু‘জন, হায়দ্রাবাদের অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ- ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের এমপির সংখ্যা এক এবং নির্দলীয় ২।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলিম এমপি লোকসভায় যাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে, যার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের পাঁচ জন এবং কংগ্রেসের একজন।
জনসংখ্যার ১৪.২ শতাংশ, লোকসভার ৪.৪২
ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স-এর (এনডিএ) একজন মুসলমান প্রার্থীও জেতেননি। বস্তুত, এনডিএ’র ২৯৩ জন এমপির মধ্যে মুসলিম, খ্রিস্টান বা শিখ সমাজের ধর্মীয় সংখ্যালঘু এমপি একজনও নেই। উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশ থেকে বিজেপির এক বৌদ্ধ এমপি এবারেও জিতেছেন।
বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরে লোকসভায় কখনোই মুসলিম জনপ্রতিনিধির সংখ্যা পাঁচ শতাংশের উপরে যায়নি। ভারতে মুসলিম জনপ্রতিনিধি, ১৯৫৭ এবং ১৯৯৯ সাল ছাড়া , প্রতিবারই ছিল ৫ শতাংশের উপরে। সর্বোচ্চ মুসলমান জনপ্রতিনিধি ছিল ১৯৮০তে, ৯.০৪ শতাংশ এবং ১৯৮৪ সালেও ছিল ৮ শতাংশের উপরে। এবারে তা নেমে এসেছে ৪.৪২ শতাংশে, যা ২০১৯এর থেকেও বেশ খানিকটা কম।
ভারতে ২০১১ সালের শেষ জনশুমারি অনুসারে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা ১৪.২ শতাংশ অর্থাৎ ১৭২ কোটি। ভারতে অতীতেও এই হারের ধারে কাছেও যায়নি লোকসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব, আর ২০১৪ সালের পর থেকে তো আরো দ্রুত কমছে।
মুসলিম প্রার্থী মনোনয়ন পাচ্ছে না
তবে মুসলিম এমপির সংখ্যা ২৭ থেকে মাত্র তিন কমে ২৪ হলেও, সব দলই বিরাট কম সংখ্যক মুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে ২০২৪-এর নির্বাচনে। সম্ভবত অতীতে কখনোই এত কম সংখ্যক মুসলিম প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।
দশ বছর আগে ২০১৪ সালে সব দল মিলিয়ে ৩২০ জন মুসলিম প্রার্থী ছিলেন, যা ২০১৯-এ নেমে আসে ১১৫ জনে। এবারে তা কমে হয়েছে ৭৮। অর্থাৎ প্রতি নির্বাচনে ভারতে মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা দ্রুত হারে কমছে।
সম্ভবত তার চেয়েও লক্ষণীয় বিষয় হল, স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে এই প্রথম কেন্দ্র সরকারে কোন মুসলমান মন্ত্রী নেই। এটা ২০১৪ এবং ২০১৯ সালেও হয়নি। দশ বছর আগে লোকসভায় মুসলমান এমপির সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম, মাত্র ২৩। অর্থাৎ এবারের চেয়েও এক কম। কিন্তু সেবারেও সংখ্যালঘু মন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন নাজমা হেপতুল্লা।
বিজেপি ২০১৯ সালে তিনশোরও বেশি আসন পায়, কিন্তু সেবারও একজন মুসলমান মন্ত্রী ছিলেন সংখ্যালঘু মন্ত্রকের দায়িত্বে – মুখতার আব্বাস নাখভি।
এর অর্থ, ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও, ভারতের রাজনীতির ‘প্লুরালিস্ট’ বা বহুত্ববাদী চরিত্র হারিয়ে হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের কাঠামো প্রতি নির্বাচনেই যে শক্তপোক্ত হচ্ছে। উপরের পরিসংখ্যানই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী দলের শক্তি কমুক বা বাড়ুক, বিজেপি-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো এখন আরো কম সংখ্যক মুসলিম প্রার্থী দিচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে প্রধান বিরোধী দলগুলি – যারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করে – তাদের মধ্যে কংগ্রেস ২০১৯ সালে ৩৪ জন মুসলিম প্রার্থী দিলেও, এবারে দিয়েছে ১৯ জন। যদিও, সেবারে তারা জিতেছিল চারটি আসনে এবং এবারে কম সংখ্যক মুসলিম প্রার্থী দিয়ে জিতেছে সাতটিতে।
তৃণমূল কংগ্রেস গতবারে দিয়েছিল ১৩, এবারে ৬, সমাজবাদী পার্টি দিয়েছিল ৮ এবং এবারে ৪। বিহারের রাষ্ট্রীয় জনতা দল গতবারে দিয়েছিল ৫ জনকে এবং এবারে মনোনয়ন দিয়েছে দুই মুসলিম প্রার্থীকে।
অর্থাৎ বিজেপি-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলিও প্রবল ভাবে মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে আরম্ভ করেছে।
প্রার্থী কম হলেও এমপি বাড়লো কেন?
কিন্তু কম প্রার্থী দিলেও, শতাংশের হারে মুসলিম প্রার্থী জিতেছে বেশি। এর কারণ ব্যাখ্যা করে কলকাতার প্রতীচি ইনস্টিটিউটের জাতীয় গবেষণা সমন্বয়ক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক সাবির আহমেদ বলছিলেন, গত ১০ বছরের ‘ট্রেন্ড‘ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে বিজেপির আসন যত বাড়ছে, তত মুসলিম প্রতিনিধিত্ব লোকসভায় কমছে।
“এবারে,এনডিএ এবং প্রধানত বিজেপির আসন কমার ফলে, মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বাড়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবারে বিরোধীরা আগের বারের থেকে প্রার্থী অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। ফলে একটা চিন্তার জায়গা তৈরি হয় যে শেষ পর্যন্ত কতজন মুসলিম প্রার্থী পার্লামেন্টে যেতে পারবে। এবার যদি বিরোধীরা গতবারের বা অতীতের মতো মুসলিম প্রার্থী দিতেন, তবে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বাড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল বলে মনে হয়,” তিনি বলেন।
কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মহম্মদ রিয়াজও মনে করেন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার কারণেই লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব আরো কমে গিয়েছে।
বিষয়টি আগামী দিনের ভারতের রাজনীতি সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয় এই প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক রিয়াজ বলেন, “ভারতের রাজ্য বিধানসভা বা জাতীয় পার্লামেন্টে মুসলিমদের আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) কখনোই ছিল না। এর উপরে জোরালো হিন্দুত্ববাদী হওয়ার জেরে তারা আরও প্রান্তিক হয়েছে বা বলা যায় লোকসভা থেকে কার্যত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।”
এর প্রধান কারণ হিসেবে বিজেপি-বিরোধী ‘সেকুলার‘ দলগুলিকেই দায়ী করলেন অধ্যাপক রিয়াজ।
“আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দল গুলি ধরেই নিয়েছে যে মুসলিম ভোট তারাই পাবে, এই ধরে নেওয়ার রাজনীতি মুসলিম জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ক্রমাগত কমাচ্ছে। যে সমস্ত আসনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই সেখানে তাদের জেতার সম্ভাবনাও ক্রমশই কমছে।”
এটাকেই হিন্দুত্ববাদের সবচেয়ে বড় জয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা, যখন বিজেপি আসন কম পেলেও পরাজয়ের আশঙ্কায় ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে।
আনুপাতিক হারে জনপ্রতিনিধি
ভারতের লোকসভায় মুসলমান প্রতিনিধিত্ব ভবিষ্যতে আরো কমবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সেই কারণেই, মুসলমান সম্প্রদায়ের বিষয় নিয়ে ভারতে যে ওয়েবসাইটটি নিয়মিত লেখালেখি করে সেই ‘মক্তব মিডিয়া’য় গত বছরে এক উপ-সম্পাদকীয়তে সমাজকর্মী ও সাংবাদিক শার্জিল ইমাম আনুপাতিক ভিত্তিতে মুসলমান জনপ্রতিনিধি ভারতের পার্লামেন্টে পাঠানোর পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আগামী দিনে যখন কেন্দ্রীয় স্তরে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নতুন করে নির্বাচনী কেন্দ্র ভাগ হবে (ডিলিমিটেশন) তখন মুসলমান প্রতিনিধিত্ব আরো কমবে।
দিল্লির এক গবেষক আসিফ মুজতবাকে উদ্ধৃত করে ‘মক্তব মিডিয়া’ই সম্প্রতি জানিয়েছে, এই মুহূর্তে যে আসনে মুসলমান জনসংখ্যা ও ভোটার বেশি রয়েছে, সেই আসন পরবর্তী সময়ে তফসিলি জাতি এবং উপজাতির জন্য সংরক্ষিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটেছে আসামে। ফলে, ভবিষ্যতে ভারতে বিজেপি হারতে বা জিততেও পারে, কিন্তু পার্লামেন্টে মুসলমান প্রতিনিধিত্ব যে কমবে তা নিয়ে বিশেষ সন্দেহ পর্যবেক্ষকদের নেই।

অন্যান্য সংখ্যালঘু
শুধু মুসলমানরাই নয়, এনডিএ জোটের ২৯৩ জন সাংসদের মধ্যে একজনও শিখ বা খ্রিস্টান সাংসদ নেই, যারা এবার লোকসভা ভোটে জিতেছেন।
তবে মোদী সরকার তাদের মন্ত্রিসভায় একজন খ্রিস্টান মন্ত্রী এবং দুজন শিখ মন্ত্রীকে জায়গা দিয়েছে।
সাংসদ জর্জ কুরিয়েন নবনির্বাচিত মন্ত্রিপরিষদের খ্রিস্টান মন্ত্রী। হরদীপ সিং পুরী এবং রভনীত সিং বিট্টু শিখ সম্প্রদায়ের।
প্রসঙ্গত, রভনীত সিং বিট্টু কিন্তু বর্তমানে লোকসভা বা রাজ্যসভার সদস্য নন। এবার লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বিট্টুকে টিকিট দিলেও তিনি ভোটে হেরে যান।
এবারের মন্ত্রিসভায় সমাজের অন্যান্য বঞ্চিত গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সামিল করা হয়েছে। ইংরেজি সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোদী সরকারের তৃতীয় দফায় মন্ত্রিসভায় ১০ জন দলিত, ২৭ জন অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি এবং পাঁচজন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সাংসদ রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জোয়া হাসান বলেন, “মন্ত্রিসভায় মুসলিম না থাকাটা আশ্চর্যের কিছু নয়।”
তিনি বলেন, “মন্ত্রিসভা যখন জাতি ও সম্প্রদায়ের ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব দাবি করে, তখন বিজেপির পক্ষ থেকে একজন মুসলিম মন্ত্রীকেও অন্তর্ভুক্ত করা্র বিষয়ে অনীহা তাদের (বিজেপির)কোনও একটি সম্প্রদায়কে ক্ষমতার বাইরে রাখার রাজনীতিকে প্রতিফলিত করে।”
তার মতে, “মুসলমানদের নামমাত্র প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা মুসলমানদের প্রান্তিককরণের বৃহত্তর প্যাটার্নকে ইঙ্গিত করে।”
জোয়া হাসান “এটা কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের নীতিকে দুর্বল করে তোলে যে নীতির আওতায় যার অধীনে সমস্ত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়ে থাকে তা তারা যাকেই ভোট দিয়ে থাকুন না কেন।”
“সংসদ ও আইনসভায় প্রত্যেকটা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে কোনও সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়াটা অগণতান্ত্রিক।”
জোয়া হাসান বলছেন, “এটা আগামী দিনে গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে।”
বিজেপির ইস্তাহারে বেশ কিছু বিষয়ে নীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যেমন অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফ়র্ম সিভিল কোড যা মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আমহার্স্ট কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিজিটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এবং দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সিনিয়র ফেলো গিলেস ভার্নিয়ার্স বলছেন, “মুসলিমদের বাদ দেওয়ার ব্যাপারে বিজেপির মনোভাব বদলায়নি। এনডিএ শরিকদের মধ্যে মুসলিমদের অনুপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মুসলিমদের বাদ দেওয়াটা এখন দলের সর্বত্র একটা গ্রহণযোগ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অন্য একটি বিষয়েরও উল্লেখ করেছেন তিনি।
গিলেস ভার্নিয়ার্স বলেন, “এমনকি কংগ্রেসও খুব বেশি মুসলিম প্রার্থী টিকিট দেয়নি। ২০১৪ সালে দলে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বও হ্রাস পেয়েছে।”
“এর ফলে জনজীবনে মুসলমানদের ভূমিকা হ্রাস করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুততা পেয়েছে।”
“ইন্ডিয়া জোটের তুলনামূলক সাফল্যও অন্তর্ভুক্তিমূলক রণকৌশলের একটা ঝুঁকির সৃষ্টি করে যেখানে হিন্দুদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং মুসলমানদের প্রান্তিক করা হয়।”
ইংরেজি সংবাদপত্র হিন্দুস্তান টাইমসের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, এনডিএ-র প্রায় ৩৩ শতাংশ সাংসদ অগ্রসর জাতির, ১৬ শতাংশ সাংসদ জাঠ ও মারাঠার মতো মধ্যম বর্ণের এবং প্রায় ২৬ শতাংশ সাংসদ অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এনডিএ সাংসদদের প্রায় ১৩ শতাংশ তফসিলি জাতি থেকে এবং প্রায় ১১ শতাংশ তফসিলি উপজাতির অন্তর্গত।
তুলনামূলকভাবে, বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার প্রায় ১২-১২ শতাংশ সাংসদ অগ্রসর ও মধ্যম বর্ণের, প্রায় ৩০ শতাংশ অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি, প্রায় ১৭ শতাংশ তফসিলি জাতি থেকে এবং প্রায় ১০ শতাংশ তফসিলি উপজাতির অন্তর্ভুক্ত।
মুসলমানদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা
বিজেপি লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিমদের টিকিট না দিলেও পসমন্দা মুসলিমদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছে।
পসমন্দা বলতে মুসলিম সম্প্রদায়ের সেই গোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা ওই সমাজে ‘অনগ্রসর জাতির’ বলে বিবেচিত হয়ে থাকেন।
পসমন্দা মুসলমানরা ভারতে মোট মোট জনসংখ্যার নিরিখে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে মনে করা হয়।
২০২৩ সালের উত্তরপ্রদেশের পৌরনি র্বাচনে ১৫ হাজার আসনে ভোট হয়েছিল, সেখানে বিজেপি ৩৯৫ জন মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছিল।
বিজেপির টিকিট পাওয়া ৯০ শতাংশ মুসলিমই পসমন্দা। বিজেপির দিক থেকে এই সংখ্যাকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলেই বিবেচনা করা যায়।
দু’বছর আগে দিল্লির পৌর নির্বাচনে বিজেপি চারজন পসমন্দা মুসলিমকে টিকিট দিয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অসীম আলি বলছেন, “বিজেপি পসমন্দা মুসলিমদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। স্থানীয় নির্বাচনে তাদের টিকিটও দিয়েছে তারা। বিজেপি মনে করে জনগণ তাদের নির্বাচিত পসমন্দা মুসলিম প্রার্থীদের ভোট দিতে পারে কারণ এই নির্বাচনগুলি স্থানীয় ইস্যুতে লড়া হয় এবং এই ভোটে বিজেপি নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় প্রশাসনের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
একইসঙ্গে তিনি স্থানীয় এবং লক্স“তবে বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে দলের আদর্শের গুরুত্ব বেশি। সেই কারণেই এই নির্বাচনে বিজেপি মুসলিম প্রার্থীদের টিকিট দেয় না এবং মুসলিম ভোটাররাও বিজেপিকে ভোট দেয় না।








