দেশে এখনো শীত উপদ্রুতদের মুখে ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ

58
ঢাকা ঃ শৈত্যপ্রবাহে বাংলাদেশের সব জেলার নিম্নবিত্ত মানুষ কষ্টে আছেন৷ উত্তরাঞ্চলের দুই জেলায় আগুন পোহাতে গিয়ে ১০০ জনের মতো অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে৷ তীব্র শীতের কারণে দেশের পাঁচ জেলায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১১ দিন আগে ডয়চে ভেলে কথা বলেছিল পঞ্চগড় সদরের তুলাডাঙ্গা স্লুইজ গেট এলাকার ঝুপড়ি ঘরে বসবাসরত সালেহা বেগমের সঙ্গে ।
শীতে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। কোনো কম্বল, গরম কাপড় বা অন্য কোনো সহায়তা তিনি এখনো পাননি৷  সকালে  কাছেই একটি বাজারে গিয়েছিলেন কম্বলের আশায়, কিন্তু সেখানেও পাননি। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ” না বাবা আমাকে কেউ কিছু দেয়নি। কম্বল, খাবার কিছুই না। অনেক কষ্টে আছি। একটি কম্বলের জন্য বাজারে গিয়েছিলাম, পাইনি। এখন আবার বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। আমার স্বামী নেই। আমাকে কে দেবে? ঘরে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে। ঘরেও থাকা কষ্টের। কেউ কিছু দিচ্ছে না।”
No description available.

 

ওই এলাকারই আরেকজন শ্রমিক রিয়াজুল ইসলাম জানান তিনি তার পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন। তার কথা, “এই শীতে গরম কাপড়ের অভাবে বাইরে বের হওয়া যায় না। বের হলেও কাজ পাওয়া যায় না। ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। সরকার বা কেউ কোনো সহায়তা করছে না।”

তিনি জানান, ‘‘আমাদের এলাকায় পাথর ও বালু শ্রমিক বেশি।পেটের দায়ে এই তীব্র শীতেও অনেক শ্রমিককে করতোয়া নদীতে নেমে পাথর ও বালু তোলার কাজ করতে হচ্ছে।”

পঞ্চগড় জেলার সহকারি কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘এ পর্যন্ত আমরা সরকারিভাবে ৩৩ হাজার ৫০০ কম্বল দিয়েছি। এনজিও এবং বেসরকারি সংগঠন দিয়েছে আরো ১৫ হাজার।” তিনি বলেন, “আরো কম্বল দরকার। আমরা বরাদ্দ চেয়েছি। আসলে আমরা বিতরণ করবো।”

পঞ্চগড় জেলার মোট জনসংখ্যা  সাড়ে পাঁচ লাখ। উপজেলা পাঁচটি। দারিদ্র্যপীড়িত এই অঞ্চলের শতকরা আট ভাগ মানুষ এখন পর্যন্ত কম্বল পেয়েছেন।

১১ দিন আগে ডয়চে ভেলে আরো কথা বলেছিল কুড়িগ্রাম দাড় মোল্লাপাড়ার মো. কামাল হোসেনের সঙ্গে। তিনিও তখন জানিয়েছিলেন কোনো শীতবস্ত্র বা কোনো ধরনের সহায়তা না পাওয়ার কথা। ১০ দিন পর তিনি বলেন, “আমরা কয়েকজনসহ আরো অনেকে কম্বল পেয়েছি। তবে অনেকে পাননি। নদীর তীরে, চরাঞ্চলে যারা থাকেন, তাদের অনেকেই পাননি। ” তিনি অভিযোগ করেন, “কেউ দুইবার পেয়েছে, আবার কেউ একবারও পায়নি। স্লিপ না থাকলে পাওয়া যায় না।”

ঘরেও থাকা কষ্টের। কেউ কিছু দিচ্ছে না: সালেহা বেগম

এবারের শীতের দুই জেলার অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের সব জেলায়ই এখন শৈত্য প্রবাহ চলছে। তবে সোমবার দিনাজপুর সদর ও নওগাঁর বদলগাছি উপজেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

দিনাজপুরের কালীতলা এলাকার মোটর সাইকেল মিস্ত্রি শ্যামল জানান, “প্রচণ্ড শীত, সূর্যেরও দেখা নেই। তার ওপর বাতাস। বাইরে বের হওয়া অনেক কষ্টের। কাজও করা যায় না।।”

তার পরিবারে পাঁচ সদস্য।সবাই শীতে যেমন কষ্ট পাচ্ছেন, কাজ না থাকায় খাদ্য এবং অর্থ সংকটেও পড়েছেন। তিনি বলেন, “আমার পরিচিত কেউ কেউ কম্বল পেলেও আমরা কেউ পাইনি।”

দিনাজপুরের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, তারা জেলার ১৩টি উপজেলায় এ পর্যন্ত ৬৮ হাজার ২৮০টি কম্বল বিতরণ করেছেন আর শুকনো খাবার এক হাজার প্যাকেট। তবে এখন  তাদের কাছে কোনো কম্বল নেই। তিনি বলেন, “আমরা কম্বলের জন্য আবেদন করেছি। আশা করছি দুই- একদিনের মধ্যে পাবো, পেলে আবার বিতরণ করবো।” জিনাজপুর জেলার জনসংখ্যা ৩৩ লাখ ১৫ হাজার।

নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার ভোলাবাজারে থাকেন নেপাল চন্দ্র । তিনি জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন। তিনি জানান, “আমাদের পরিবারের কেউ কোনোরকম সহায়তা পায়নি। দুই-একজন কম্বল পেলেও আমরা পাইনি। অনেক কষ্ট হচ্ছে এই শীতে।”

“রাস্তার পাশে বসে একটি জুতা সেলাই করলেই হাত অবশ হয়ে যায়। আর লোকজনও তেমন আসে না। কাজ না থাকায় অর্থকষ্টে আছি,” বলেন তিনি।

নওগাঁয় মোট উপজেলা ১১টি। জসংখ্যা ২৮ লাখ। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আশেকুর রহমান জানান ,এ পর্যন্ত সরকারিভাবে ৭০ হাজার ৫৫০টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেসরকারিভাবে সংগ্রহ করে আরো এক লাখ ১৭ হজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের কাছে এখন আর কোনো কম্বল নেই। ৫০ হাজার কম্বল বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছি, না আসা পর্যন্ত কম্বল বিতরণ করতে পারবো না।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমরা কম্বল ছাড়া সোয়েটার, জ্যাকেট বা আর কোনো ধরনের গরম কাপড় দিচ্ছি না। খাবার বা অর্থ সহায়তার কোনো বরাদ্দ শীতের জন্য নেই।”

এই শীতে জেলায় কত মানুষের সহায়তা দরকার তার কোনো হিসাব জেলা প্রশাসনের কাছে নেই।

সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, দেশে দারিদ্র্যসীমার নীচে এখন মোট জনগোষ্ঠীর ১৮.৭ শতাংশ। সেই হিসেব করলেও দিনাজপুর ও নওগাঁ জেলায় কমপক্ষে ১২ লাখ মানুষের এই শীতে গরম কাপড়সহ অন্যান্য সহায়তা দরকার। কিন্তু তিন লাখ মানুষও সহায়তা পায়নি। যারা পেয়েছেন, তারা কম্বল ছাড়া আর কিছুই পাননি। অন্য জেলাগুলোরও একই অবস্থা।

দেশের অন্তত ১০ জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক জেলায়ই কম্বল না থাকায় বিতরণ বন্ধ আছে। তারা ঢাকায় বরাদ্দ চেয়েছেন।

সারাদেশে ৩৭ লাখ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে: মো. রাসেল সাবরিন

শীতের আগুনে দগ্ধ

পঞ্চগড়ে তীব্র শীতে গরম কাপড়ের অভাবে খড়কুটো জ্বেলে আগুন পোহাতে গিয়ে ২৬ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন এখনো হাসপাতালে আছেন বলে জানান পঞ্চগড়ের সাংবাদিক লুৎফর রহমান।

রংপুরে আগুনে পুড়ে হাসপাতালে ভর্তি  হয়েছেন অনেকে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন এখন ৪৬ জন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইউনূস আলী ডয়চে ভেলেকে বলেন, “তাদের মধ্যে তিন জন মারা গেছেন। আগুন পোহাতে গিয়ে বা অসাবধনতাবশত তারা অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন।”

হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মাত্র ১২টি বেড আছে। অন্যদের সার্জারি ইউনিটে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

 ‘এ পর্যন্ত ৩৭ লাখ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে’

এদিকে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব এবং পরিচালক(ত্রাণ) মো. রাসেল সাবরিন ডয়চে ভেলেকে বলেন. ‘‘সারা দেশে এ পর্যন্ত ৩৭ লাখ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আর প্রত্যেক সংসদীয় এলকায় প্রত্যেক এমপির অনুকুলে আরো এক হাজার করে কম্বল পাঠানো হয়েছে। কম্বলের কোনো সংকট হওয়ার কথা নয়। আমরা প্রতিনিয়ত পাঠাচ্ছি।”

বেশ কয়েকটি জেলায় কম্বল শেষ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের কম্বলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। আমরা চাহিদা অনুযায়ী পাঠাচ্ছি। কোনো অসুবিধা হবেনা। কম্বল শেষ হওয়ার কথা নয়।’’

পূর্বের খবর‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে ভারত অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে’
পরবর্তি খবরবাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয়পত্র ছাড়ার সুপারিশ বন্ড মার্কেটে