জামায়াতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনুমান করা কঠিন: দ্য ডিপ্লোম্যাট

134

নিউজ ডেস্কঃ  জামায়াত তার ওয়েবসাইটে লিখেছে, তারা আল্লাহর দ্বারা নির্ধারিত এবং নবী মুহাম্মদের দেখানো ইসলামিক জীবনবিধি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য- বাংলাদেশকে একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং ফলস্বরূপ, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পরকালের জীবনে পরিত্রাণ অর্জন করা। জামায়াত তার সংবিধানে লিখেছে, তারা একটি শৃঙ্খলামূলক এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করবে এবং … এর পক্ষে জনমত তৈরি করার প্রচেষ্টা চালাবে।

nagad

একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা ভুলে যাননি অনেক বাংলাদেশি। সমালোচকরা অভিযোগ করেন, দলটি সংখ্যালঘু বিরোধী এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চালায়। জামায়াতের বিরুদ্ধে সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গিরও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে, শুধু মুসলিমরাই দলটির সদস্য হতে পারে এবং দলটি মনে করে- একজন মহিলা রাষ্ট্রের প্রধান হতে পারবেন না।

জামায়াতের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু বিরোধী অভিযোগকে অস্বীকার করে নকিবুর রহমান বলেন, মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। দলের বর্তমান নেতারা নিজেদের আগের অবস্থান থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছেন, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ব্যাপারে তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছেন।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াতের ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের বলেছেন, ২০২৩ সালের জামায়াত অতীতের চেয়ে আলাদা। তিনি বলেন, ১৯৭১- হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, বিএনপি… সহ সমগ্র জাতির জন্য গর্বের বিষয়।

তবে তিনি ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের সাথে জামায়াতের সহযোগিতার জন্য ক্ষমা চাননি, যা জামায়াতের সমালোচকদের দীর্ঘদিনের দাবি। সম্ভবত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতের এই বক্তব্যের পরিবর্তন দলটির একটি কৌশল।

২০২০ সালে, জামায়াতের বেশ কিছু কর্মী দল থেকে বের হয়ে এসে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন। এবি পার্টির আন্তর্জাতিকবিষয়ক দায়িত্বে থাকা আসাদুজ্জামান ফুয়াদের মতে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা ছিল বিভক্তির মূল কারণ।

আসাদুজ্জামান ফুয়াদ দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, যারা এবি পার্টি গঠনের জন্য জামায়াত ত্যাগ করেছিলেন তারা মনে করেন- জামায়াতের উচিত জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া। এছাড়া নারী ও সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্রপ্রধান পদে নিতে উৎসাহিত করে দলকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এবং রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করা প্রয়োজন।

যদিও কিছু নেতা দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে এবি পার্টিতে দেওয়ার কারণে জামায়াত খুব বেশি জনসমর্থন হারায়নি, তবে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের বিষয়ে দলটির পরিবর্তনশীল বক্তব্য একে আরও বিভক্ত করতে পারে।

আঞ্চলিকভাবে জামায়াত ভারতের ঘোরবিরোধী। প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক এস এন এম আবদি উল্লেখ করেছেন, ভারতীয় সরকার জামায়াতকে পাকিস্তানের প্রক্সি এবং আইএসআইয়ের পুতুল ছাড়া অন্য কোনো ভাবে দেখে না। (আইএসআই বা ইন্টার-সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা)

লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন সিনিয়র লেকচারার অবিনাশ পালিওয়াল দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেছেন, জামায়াতের রক্ষণশীল নীতি এবং মতাদর্শিক অবস্থানকে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের থেকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে নয়া দিল্লি। আদর্শগত এবং নিরাপত্তা-সম্পর্কিত উভয় কারণেই এই ধরনের একটি শক্তিকে ট্যাকেল করা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পালিওয়াল আরও বলেন, এই ট্যাকেলের অর্থ হলো- ভারত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেবে, এমনকি বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করে হলেও।

জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাসুম, সম্প্রতি বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টার নিন্দা করেছেন এবং আওয়ামী লীগ দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ভারতকে খুশি করছে বলে অভিযোগ করেছেন।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের আগে, বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যকার সম্পর্ক কিরূপ হবে তা অনুমান করার চেষ্টা করছেন পর্যবেক্ষকরা। জামায়াত এবং বিএনপি, দল দুটি দীর্ঘদিনের মিত্র। উভয়পক্ষের সূত্র বলছে, দল দুটি আবারও কোনো জোটে যাবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে পৃথকভাবে হলেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রাখতে সম্মত উভয়েই।

সমালোচকরা বলেন, বিএনপি জামায়াতের স্ট্রিট পাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল। তবে বিএনপি এখন জামায়াতকে ছাড়াই দেশব্যাপী ব্যাপক সমাবেশের আয়োজন করছে। এভাবে সমালোচকদের জবাব দিচ্ছে দলটি। সম্প্রতি সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জন্য ১৯টি ছাত্র সংগঠনের একটি জোট গঠন করেছে বিএনপির ছাত্র শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (জেসিডি)। তবে সেখানে ছাত্রশিবিরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

এদিক থেকে জামায়াত কীভাবে এগোবে তা অনুমান করা কঠিন। তবে দলটি যে সাংগঠনিকভাবে এখনও শক্তিশালী তা স্পষ্ট। দলটি হয়তো আ.লীগের দমনপীড়নে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে, কিন্তু দেশে আ.লীগবিরোধী মেজাজ থেকেও লাভবান হয়েছে দলটি।

নিবন্ধন বাতিলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে জামায়াত। তবে অনুকূল রায় পাওয়ার ব্যাপারে অবশ্য আশাবাদী নয় তারা। জামায়াতের দলীয় একটি সূত্র দ্য ডিপ্লোম্যাটকে জানিয়েছে, আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য দলের নাম পরিবর্তনের কথা ভাবছে তারা।

মোবাশ্বের হাসান : সিডনিভিত্তিক তাত্ত্বিক এবং দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক।

পূর্বের খবরসেপ্টেম্বরে কি হতে যাচ্ছে?
পরবর্তি খবর‘জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন’, কোনো সহজ কর্ম নয় নির্বাচন : সিইসি