জাপা ৩০ আসনে জয়ের গ্যারান্টি চায়, নইলে নির্বাচন বর্জন

65
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে জাতীয় পার্টি মিয়্রমাণ, নিষ্প্রভ। ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টির ১৮ জন প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এরকম পরিস্থিতিতে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার কোন আইনি বৈধতা নেই। কারণ একজন প্রার্থী যখন মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে তার প্রার্থীতা প্রত্যাহার না করেন তখন আপনাআপনি ভাবেই তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে যান। ব্যালট বাক্সে তার নাম থাকে। তিনি নির্বাচন থেকে সরে গেলেন কি সরে গেলেন না সেটি আইনের দৃষ্টিতে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং ব্যালট পেপারে তার নাম এবং প্রতীক থাকার ফলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে আইনের দৃষ্টিতে পরিগণিত হবেন। কিন্তু তিনি নির্বাচন করুন না করুন বাস্তবতা হল যে জাতীয় পার্টির অর্ধেকের বেশি প্রার্থী মোটামুটি নিষ্ক্রিয়। তারা নির্বাচনের মাঠে তেমন সরব নন।
কিন্তু নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, জাতীয় পার্টির যে সাংগঠনিক অবস্থা তাতে শতভাগ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টির ৬ থেকে ৭ টির বেশি আসন পাবে না। এরকম পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টি নিজেদেরকে নির্বাচন থেকে গুটিয়ে নেওয়ার নাটকীয় ঘোষণা দিতে পারে। আর ৩০ থেকে ৩২ যদি জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয় তাহলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় হয়েছে কি না, সেই বিতর্ক নতুন করে চাড়া দিতে পারে। এ রকম অবস্থায় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন কী করবে সেটি একটি দেখার বিষয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, জাতীয় পার্টি তার প্রায় ২৮২ টি আসনের মধ্যে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টি আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছে এবং যেখানে প্রার্থীদেরকে অত্যন্ত সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। বাকি আসনগুলোতে তারা নিষ্ক্রিয়।
এখন প্রশ্ন হল যে জাতীয় পার্টির এই ভূমিকা কেন? জিএম কাদের অবশ্য বলেছেন, জাতীয় পার্টির অনেক প্রার্থী দুর্বল। তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এ কারণে তারা নির্বাচন থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত জাতীয় পার্টির যে সমস্ত প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী এলাকাগুলোতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে তার মধ্যে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের রংপুর সদর আসন। দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর কিশোরগঞ্জের আসন। রুহুল আমিন হাওলাদারের আসন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদের চট্টগ্রামের আসন এবং জিএম কাদেরের পত্নীর ঢাকা-১৮ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও জাতীয় পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা সালমা ইসলাম তার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। জাতীয় পার্টির আরেক নেতা বাবলাও ঢাকা-৪ লড়াই জমিয়ে তুলেছেন। এরকম বিভিন্ন এলাকায় কিছু কিছু প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এখন দেখা যাক জাতীয় পার্টি নির্বাচনের মাঠে শেষ মুহূর্তে কী চমক দেখায়।

প্রচারে পিছিয়ে জাপা ব্যালটে কেমন করবে!

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণার সময় শেষ হয়েছে আজ শুক্রবার সকাল ৮টায়। প্রচারণা শেষে এখন চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিবিহীন এবারের নির্বাচনের প্রচারণায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তুলনায় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীরা ছিলেন অনেক পিছিয়ে। এখন অপেক্ষা আগামীকাল রবিবার ভোটের মাঠে জাপার প্রার্থীরা কেমন করেন তা দেখার।

এবার দর-কষাকষির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ছাড় দেওয়া ২৬ আসনের মধ্যে ১০-১২টিতে জাপা সুবিধাজনক জায়গায় থাকলেও বাকি আসনগুলোতে রয়েছে পরাজয়ের শঙ্কা। সমঝোতার বাইরের আসনগুলোর মধ্যে ২০টির কম আসনে দলটির প্রার্থীদের ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
এবারের নির্বাচনে শাসক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ২৬ আসনে ছাড় পেয়ে ২৬৫ আসনে প্রার্থী দিয়েছে জাপা। যদিও ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়ে জাপার ৫৩ প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এর বাইরে ঘোষণা না দিয়ে ভোটের মাঠ থেকে আরও প্রায় ১০০ প্রার্থী সরে দাঁড়িয়েছেন। এসব প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে বলেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ক্যাম্পে হামলা, আগুন, কর্মীদের মারধর ও প্রশাসনের অসহযোগিতায় তারা সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কিত হয়ে মাঠ ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি দল থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেও তারা সরে দাঁড়িয়েছেন।

সবশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪৬ আসনে জামানত হারানো জাপা এবার আরও বেশি আসনে জামানত হারাতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। গত নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেওয়ায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে ২২টি আসনে জিতেছিলেন জাপার প্রার্থীরা। এবার বিএনপি না থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জাপাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ছেন। অন্যদিকে সমঝোতার ২৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকলেও দলটি থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। ফলে এবার চলতি সংসদের ২৩ আসন ধরে রাখতে পারা নিয়ে সংশয় আছে জাপার।
সরকার গঠনের প্রত্যয়ের কথা জানিয়ে ভোটে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সংসদের বিরোধী দলটি। কিন্তু সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নির্বাচনের মাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। নির্বাচনী মাঠের বর্তমান যে চিত্র তাতে সমঝোতার ২৬টির মধ্যে কেবল ৭টি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছে আওয়ামী লীগ, এসব আসনে দলটির শক্ত কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীও মাঠে নেই। এই ছয় নির্ভার জাপা প্রার্থী হলেন: রংপুর-৩ আসনে জিএম কাদের, ঠাকুরগাঁও-৩ হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, কুড়িগ্রাম-১ এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, গাইবান্ধা-১ ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, নারায়ণগঞ্জ-৫ এ কে এম সেলিম ওসমান এবং ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, পটুয়াখালী-১ আসনে জাপার কো-চেয়ারম্যান রুহুল আমিন হাওলাদার, চট্রগ্রাম ৫ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বরিশাল ৩ গোলাম কিবরিয়া ।

এর বাইরে যে ১৯টি আসন রয়েছে, সেখানে জাপার ৩ বিদ্রোহী প্রার্থী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) জিয়াউল হক মৃধা, পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) রুস্তম আলী ফরাজী এবং রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে মশিউর রহমান রাঙ্গার পক্ষে কাজ করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এই ৩ আসনে জাপা প্রার্থীরা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ রেজাউল ইসলাম, রংপুর-১ আসিফ শাহরিয়ার ও পিরোজপুর-৩ মাশরেকুল আজম রবি। বাকি ১৬টি আসনে আওয়ামী লীগের শক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জ নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুরের সভাপতি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত জিএম কাদের হয়তোবা জিতে যাবেন, কিন্তু এই আসনে তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী ভালো ভোট পাবেন। যে উত্তরবঙ্গের ৩৩টি আসন ছিল জাপার রাজনীতির ভিত্তি, এবার এই ৩৩টি আসনের মধ্যে ১০-১২টির বেশি আসন জাপা পাবে না। উত্তরবঙ্গের মানুষ জাপা প্রার্থীদের ওপর নানা কারণে অসন্তুষ্ট। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এসব আসনে জাপার সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকা ভোটের মাঠে তাদের পিছিয়ে রাখবে।’
আওয়ামী লীগ ছাড় দিলেও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন কাঁচি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী নাসিমুল হক। তাকে সমর্থন জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েও শেষ মুহ‚র্তে প্রত্যাহার করে নেওয়া নাসিরুল ইসলাম খান। এই আসনে নাসিমুল হকের জয়ের পাল্লা ভারী। নীলফামারী-৩ আসনে রানা মোহাম্মদ সোহেলকে আওয়ামী লীগ ছাড় দেওয়ায় সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও লড়ছেন তার স্ত্রী মার্জিয়া সুলতানা। ঈগল প্রতীকের মার্জিয়াকে সমর্থন দিয়ে মাঠ ছেড়েছেন আওয়ামী লীগের আরও দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু সাঈদ শামিম এবং হুকুম আলী খান।

জিএম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদেরের আসন নিয়ে এবার নানা নাটকীয়তা হয়েছে। নাটকীয়তা শেষে ঢাকা-১৮ আসন আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিলেও তার বিরুদ্ধে রয়েছেন শক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক খসরু চৌধুরী। তার পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকায় বিপাকে শেরিফা। একইভাবে বিপাকে আসন ছাড় পাওয়া বাকি প্রার্থীরাও।
তবে সমঝোতার মাধ্যমে আসন না পেলেও ভোটের মাঠে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনে জাপা প্রার্থী পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। তার আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক আমলা মোহাম্মদ সাদিক। আওয়ামী লীগের একটা অংশ গোপনে সমর্থন দেওয়ায় দুইবারের এমপি পীর মিসবাহর জয়ের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন থেকে দুইবারের এমপি জাপার প্রেসিডিয়াম মেম্বার লিয়াকত হোসেন খোকাও শক্ত প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে জয় পেতে পারেন। জাপার দুর্গ খ্যাত রংপুর জেলার রংপুর-২ আসনে আনিসুল ইসলাম মণ্ডল জয় পেতে পারেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরীকে হারিয়ে। আহসানুল হকের বিপক্ষে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় সুবিধা নিতে পারেন জাপার আনিসুল।

এর বাইরে জয়ের সম্ভাবনা কম থাকলেও শক্ত প্রচারণা চালাচ্ছেন ঢাকা-৪ আসনে সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। তিনি বিগত দুটি সংসদে ঢাকা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ ছাড়া রয়েছেন ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসনে সালমা ইসলাম, সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আতিকুর রহমান আতিক, রংপুর-৪ সেলিম বেঙ্গল ও রংপুর-৫ আসনে আনিসুর রহমান।

জাতীয় পার্টির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও প্রেসিডিয়াম মেম্বার জহিরুল ইসলাম জহির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচন একটু অন্যরকম হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কেন্দ্রে আসবে কি না, ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ফলে জাপা কয়টি আসন পাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সুষ্ঠু ভোট হলে আমরা অনেক আসন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।’

ভোট সুষ্ঠু হলে বেশ কিছু আসনে জয়ের আশা করছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের টাকা দিয়ে প্রভাবিত করছেন। আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেপরোয়া আচরণের কারণে শেষ পর্যন্ত ভোট সুষ্ঠু হবে কি না, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। তবে ভোট সুষ্ঠু হলে আমরা অনেকগুলো আসনে জিতব, আবার বেশ কিছু আসনে ভালো ভোট পাব।’

 

পূর্বের খবরবাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষায় অ্যামনেস্টি ইন্টাঃ এর ১০ দফা মানবাধিকার সনদ
পরবর্তি খবরএবার পরাজয়ের শঙ্কায় আওয়ামী লীগের ৫০ হেভিওয়েট প্রার্থী