জাপান যেভাবে সেভেন সিস্টার্স ও বাংলাদেশের মধ্যে সেতু গড়ছে

77

নিউজ ডেস্কঃ জাপান হলো এমন একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তি, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারত– উভয়েরই সম্পর্ক দারুণ। এই কথাটা কিন্তু চীন বা আমেরিকা কারও ক্ষেত্রেই খাটে না। অথচ জাপানের ক্ষেত্রে সেটা ভীষণ রকম সত্যি।

আর সেই দুটো অনবদ্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়েই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আর বাংলাদেশের মধ্যে কানেক্টিভিটি তথা সংযোগ প্রসারের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়েছে টোকিও– যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি ‘সমৃদ্ধ বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল’ গড়ে তোলা।

অন্যভাবে বললে, ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত অঞ্চলটির (ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি অঙ্গরাজ্য) সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদান যাতে মসৃণ হতে পারে, সেই কাজে এগিয়ে এসেছে উভয়েরই বন্ধু দেশ জাপান।

১জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

ভারতে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত হিরোশি সুজুকির কথায়, ‘আমরা এতদিন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেমন, তেমনি বাংলাদেশেও উন্নয়ন সহযোগী হিসেবেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছি। কিন্তু এই দুটো অপারেশন এতদিন চলতো সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। এখন থেকে জাপান তার মধ্যে একটা সমন্বয় করে চলবে, যাতে এই অঞ্চলজুড়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত হয়।’

দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুস্তাফিজুর রহমানও বলছেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আসলে ভৌগোলিকভাবে একটি নিরবচ্ছিন্ন এলাকা। ফলে আমরা হলাম ‘ন্যাচারাল অ্যালাইজ’ বা ‘স্বাভাবিক মিত্র’। আর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেও বাংলাদেশের বিরাট অবদান আছে। ফলে এই পুরো অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও অপরিসীম।’

২দিল্লির আইআইসি-তে তিন দেশের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে রিপোর্টটি প্রকাশ করা হচ্ছে

সম্প্রতি দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভারতের সুপরিচিত থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘এশিয়ান কনফ্লুয়েন্স’ ঠিক এই কানেক্টিভিটি বাড়ানোর লক্ষ্যেই বেশ কিছু নির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে। তারা ওই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে জাপান সরকারেরই সহযোগিতায়। আর রিপোর্ট প্রকাশের দিনে সেখানে জাপান, বাংলাদেশ ও ভারত– তিন দেশেরই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কী কী সুপারিশ করেছে এশিয়ান কনফ্লুয়েন্স? 

ভারতের এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, জাপানের সহযোগিতায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন গড়ে তুলতে হবে। এই মুহূর্তে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানির ওপর ভারত যে অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি বসিয়েছে তা তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছে তারা। কারণ, বাংলাদেশের পাট গুণ-মানে ভালো এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরিতেও সহায়ক। ফলে এতে আখেরে ভারতেরও লাভ হবে।

এছাড়া জাপানের অর্থায়নে বাংলাদেশের মাতারবাড়িতে যে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা হচ্ছে, সেখান থেকে ত্রিপুরার সাবরুম পর্যন্ত একটি মাল্টিমোডাল করিডর গড়ে তোলারও প্রস্তাব করা হয়েছে রিপোর্টে। মাতারবাড়ি থেকে সাবরুম মাত্র ১৮০ কিলোমিটার দূরে। ফলে ওই পথে যদি ফোরলেন হাইওয়ে ও রেল সংযোগ গড়ে তোলা যায় তা গোটা অঞ্চলের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।

৩মাতারবাড়ি বন্দরকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় সংযোগের রূপরেখা

সর্বোপরি, তারা একটি ‘ত্রিপাক্ষিক’ (ঢাকা-টোকিও-দিল্লি) সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে, ভারত ও জাপানের মধ্যে ‘সেপা’ (কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট) চালু আছে সেই ২০০৯ সাল থেকেই। অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সেপা নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা চলছে, বাংলাদেশ ও জাপানও খতিয়ে দেখছে তাদের মধ্যে সেপা সই করা যায় কিনা। এই তিনটি দেশের সবার মধ্যে পারস্পরিক সেপা স্বাক্ষরিত হলে তা ত্রিপাক্ষিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করবে, মনে করিয়ে দিয়েছে এশিয়ান কনফ্লুয়েন্স।

জাপানের বক্তব্য

অনুষ্ঠানে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোশি সুজুকি জানান, যে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে জাপান ওই পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চালচিত্র বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তা আর মাত্র চার বছরের মধ্যেই দিনের আলো দেখবে। ২০২৭ সালে পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে এটা হবে বাংলাদেশের প্রথম ডিপ সি পোর্ট, যেখানে পাঁচশ’ বা তারও বেশি কন্টেইনারবাহী জাহাজ অনায়াসে ভিড়তে পারবে।

৪বক্তব্য রাখছেন দিল্লিতে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোশি সুজুকি

বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে জাপান যে এখন থেকে একই অর্থনৈতিক প্রিজমের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে, সেটাও স্পষ্ট জানিয়ে দেন রাষ্ট্রদূত। অর্থাৎ জাইকাসহ যেসব সংস্থার মাধ্যমে জাপান সরকার এই অঞ্চলে উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক সহযোগিতার কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাদের কাছে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অভিন্ন গুরুত্ব পাবে।

বাংলাদেশের বক্তব্য

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আজ যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভূত উন্নতি হয়েছে এবং শান্তি-সুস্থিতি ফিরে এসেছে, তার পেছনে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অবদান যে কতটা, সে কথা মনে করিয়ে দেন হাইকমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান। ‘প্রতিবেশ শান্তিপূর্ণ হলে তবেই কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিকশিত হতে পারে, আর বাংলাদেশ এখানে ঠিক সেটাই করেছে’, জানান তিনি।

৫বক্তব্য পেশ করছেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান

অর্থনৈতিক উন্নতিতে এর পরের ধাপগুলো নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রস্তাবও দিয়েছে বাংলাদেশ। যেমন:

ক) ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সব ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা (ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) নির্মূল করা।

খ) মাতারবাড়ি বন্দর ২০২৭ সালে  চালু হলে ভারতের ল্যান্ড-লকড (স্থলবেষ্টিত) উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য তা বঙ্গোপসাগরের দরজা উন্মুক্ত করে দেবে। ফলে সেই বন্দরের সঙ্গে উপযুক্ত সংযোগ গড়ে তোলার দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।

গ) বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নর্থ-ইস্টের সরাসরি বিমান সংযোগ চালু করতে হবে, কারণ বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য এয়ার কানেক্টিভিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা-গুয়াহাটি, ঢাকা-আগরতলা, চট্টগ্রাম-গুয়াহাটি এসব রুটে ফ্লাইট চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন রাষ্ট্রদূত।

ঘ) আন্তর্জাতিক সীমান্তে স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও জোর দিয়েছে বাংলাদেশ।

ভারতের বক্তব্য

অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ডেস্কের যুগ্ম সচিব স্মিতা পন্থ। সাউথ ব্লকের এই সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় কীভাবে এই গোটা অঞ্চলজুড়ে একটার পর একটা কানেক্টিভিটি প্রকল্পের দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে এবং এই দুটো অঞ্চল কার্যত ‘প্রি-পার্টিশন’ বা দেশভাগের আগে যেরকম অবাধ সংযোগ ছিল সেই পর্যায়ে ক্রমশ ফিরে যাচ্ছে।

৬স্মিতা পন্থ

ত্রিপুরার আগরতলা ও বাংলাদেশের আখাউড়ার মধ্যে রেল সংযোগ স্থাপনের কাজ যে খুব শিগগিরই শেষ হতে চলেছে, সেই সুখবরও ঘোষণা করেন তিনি। এই রেলপথ চালু হলে কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে সরাসরি ট্রেনে আগরতলা যাওয়া যাবে মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে।

স্মিতা পন্থ আরও জানান, ভারত সম্প্রতি বাংলাদেশকে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে তৃতীয় দেশে এয়ার কার্গো পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে। বাংলাদেশের বহু গার্মেন্ট শিল্প সংস্থার সুবিধা নিয়েছে এবং তারা চাইছে ভারতের আরও অনেক বিমানবন্দরেই এই সুযোগ চালু করা হোক।

বস্তুত সেদিনের অনুষ্ঠান থেকে একটা বার্তা পরিষ্কার হয়ে গেছে– ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সেভেন সিস্টার্স) ও বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর জন্য একটার পর একটা প্রকল্প নিয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। আর সেখানে উভয় দেশের মিত্র হিসেবে সক্রিয় সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে জাপান।

পূর্বের খবরবঙ্গবন্ধুর পথে নেই আওয়ামী লীগ, পথ হারিয়েছে বাংলাদেশ: অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
পরবর্তি খবরআমেরিকার গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললেন শেখ হাসিনা