জাতীয় সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না : প্রধানমন্ত্রী

16

প্রাণবন্ত সংসদে গণতন্ত্রের নবযাত্রা। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি বিল আকারে পাস, প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা :: স্পিকারের ভূমিকা প্রশংসিত

facebook sharing button
whatsapp sharing button
copy sharing button
sharethis sharing button

 

ঢাকাঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সংসদ মানেই পুরো বাংলাদেশ এবং এই সংসদের সফলতা মানেই দেশের সফলতা। তাই এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, আমরা যদি একটি স্থিতিশীল সরকার ও সংসদ নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে কোনোভাবেই এই দেশকে সামনে নিয়ে যেতে পারব না। সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। তাই সংসদকে অকার্যকর হওয়া থেকে রক্ষা করতে সকল সংসদ সদস্যের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা ও প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন ।

জাতির বহুল কাক্সিক্ষত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম জাতীয় সংসদের অধিবেশন যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, চব্বিশের (২০২৪ সালের) গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনটিও দেশের জন্য তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের আবসানের পর গোটা জাতির প্রত্যাশা ছিল একটি প্রাণবন্ত সংসদের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের নবযাত্রা শুরু হবে।

গত ১২ মার্চ শুরু হওয়া বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশন জাতির সে প্রত্যাশা পূরণে শুভসূচনা করেছে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সংসদ প্রাণবন্ত হবে এটিই সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংসদে সেরূপ ছিল না। জনগণের টাকায় সেখানে শুধু নেতার স্তূতি ও গুণগান চলতো। আর বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীকে অশ্লীল ও অশালীন ভাষায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হতো। তবে এ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদীয় গণতন্ত্রের রূপ ফিরে এসেছে। সরকারি ও বিরোধী দলীয় সদস্যদের শালীন ও মার্জিত ভাষায় যুক্তিতর্কের মাধ্যমে প্রাণবন্ত সংসদ জাতি উপভোগ করেছে। গত ১২ মার্চ সংসদে দেয়া উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেছেন, সংসদকে যুক্তিতর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং সংসদে তার কার্যক্রমও বেশ প্রশংসিত হয়েছে। সেই সঙ্গে তাকে বেশ পরিণত রাজনীতিবিদ বলেও অনেকে অভিহিত করেছেন। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেছেন, বিরোধী দল হিসেবে আমরা সরকারের যেমন সমলোচনা করবো তেমনি তাদের ভালো কাজের প্রশংসাও করবো। এ সংসদে আমরা দেশের মানুষের কথা বলতে চাই।

স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বলেন, তিনি জাতীয় সংসদে নিরপেক্ষ আম্পায়ারের মতো দায়িত্ব পালন করবেন। ক্রিকেট খেলায় আম্পায়ার যেমন নিরপেক্ষ থাকেন, তিনিও সংসদে তেমনই নিরপেক্ষ থাকবেন। সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেশবাসী তারই প্রতিফলন দেখেছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি সংকটকে জাতীয় সমস্যা মনে করে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। বিরোধী দলও তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করে এবং দশ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের এমন ঐক্য এর আগে মাত্র একবারই হয়েছিল। সেটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রণয়নের সময়। আর এবার জ্বালানি সংকট সমাধানের উপায় বের করার লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠিত হয়েছে। এ ছাড়া সংসদের প্রথম অধিবেশন পরিচালনায় স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকাও সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্পিকার সরকারি দলের সদস্যের চেয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলার সুযোগ বেশি দিয়েছেন এমন অভিযোগও সরকারি দলের সদস্যরা করেছেন। বিশেষ করে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, আখতার হোসেন, শফিকুল ইসলাম এবং স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানাকে বারবার সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে সংসদে এ নিয়ে উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর মোট ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা এর ওপর আলোচনা করেন। এই আলোচনার সময় সংসদে অনেক উত্তেজনাকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তবে স্পিকার সব বিষয় বেশ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে অত্যন্ত প্রাণবন্ত একটি অধিবেশ জাতিকে উপহার দিয়েছেন।

সংসদে ১১৩টি বিল পাস

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে মোট ১১৩টি বিল পাস হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি আরো শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে আনার সুপারিশ করা হয়। যেসব বিল পাস হয়েছে এর মধ্যে আলোচিত হচ্ছে, ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার-১৯৭৩’ সংশোধন বিল। এ আইন পাসের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের (এমপি) শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির বিশেষ সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্বচ্ছতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংসদে আইনমন্ত্রী জানান। এ ছাড়া ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল-২০২৬’, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল-২০২৬’ এবং ‘ব্যাংক রেজল্যুশন বিল-২০২৬’, ‘নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬’, বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬’, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬’, ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬’; ‘রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬’, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল-২০২৬’, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বিল-২০২৬’, ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিল-২০২৬’; ‘আমানত সুরক্ষা বিল-২০২৬’, ‘এক্সইজেস অ্যান্ড সল্ট বিল-২০২৬’, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল-২০২৬’; ‘গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল-২০২৬’; বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল-২০২৬’, অর্থ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর বিল-২০২৬’, ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল-২০২৬’ ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) বিল-২০২৬’; জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল-২০২৬’ ও ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল-২০২৬’, ‘মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬’-সহ মোট ৯৩টি বিল পাস করা হয়। এ সব বিল পাস করার জন্য সরকারি ছুটির দিনও সংসদ অধিবেশন চলে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ বনাম সংবিধান সংশোধন কমিটি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যখন শপথ গ্রহণ করেন তখন থেকে গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আলাদাভাবে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সরকার সমর্থক বা সরকারি দলের পক্ষ থেকে গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে আলাদাভাবে শপথ গ্রহণ না করায় এ বিষয়ে সংসদ অধিবেশনে চলে বিতর্ক। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কও চলছে। বিএনপির সংসদ সদস্যরা গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে শপথ নেননি কারণ তারা বলছেন, এটি সাংবিধানিক বা সংসদীয় কাঠামোর বাইরে। অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা বলছেন, গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা গণভোটকে অস্বীকার করছেন। এ রকম বিতর্কের মধ্যে গত ২৯ এপ্রিল সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এ কমিটিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজনের নাম দেয়ারও তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, এ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত ভিন্নতা আছে। তারা এ প্রস্তাবটি নিজেরা আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত আছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমত অনুসারে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা সংবিধান সংস্কার চায়। জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট হয়েছিল। সেখানে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় বিএনপির ভিন্নমত গুরুত্ব পায়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংবিধান সংস্কারের জন্য এই সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করার কথা। কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে গত ৩১ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতার আনা একটি মুলতবি প্রস্তাবে সংসদে আলোচনা হয়েছিল। সেদিনও সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সেদিন এ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বিরোধী দল। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবিধান সংস্কারের আলোচনাকে একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য কমিটি করা যেতে পারে।

পূর্বের খবরতথ্য অধিদপ্তরে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ
পরবর্তি খবরআজ ঐতিহাসিক মে দিবস