জাতীয় নির্বাচনের তফসিল পরিবর্তনের আলোচনা কেন?

73
ঢাকাঃ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর হঠাৎৎ করেই তফসিল পরিবর্তনের আলোচনা কেন উঠলো? এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বিরোধীদল জাতীয় পার্টি মনোনয়নপত্র বিক্রি করেছে। অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না এটাও পরিষ্কার করেছে। তাহলে তফসিল পরিবর্তনের আলোচনা কেন? তফসিল ঘোষণা করা হলেও, বিএনপি নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিলে সেটি পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছে না বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন।

ভোট গ্রহণের ৫২ দিন আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ১৫ নভেম্বর ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ভোট হবে আগামী ৭ জানুয়ারি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভেতরে ভেতরে হয়ত কোন আলোচনার উদ্যোগ ছিল, যে কারণে তফসিল পরিবর্তন নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত ভোটে না আসে তাহলে তো তফসিল পরিবর্তনের কোন প্রয়োজন নেই।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. সাখাওয়াত হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, “এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে বিএনপি ভোটে আসছে না এটা পরিষ্কার। তারা যদি না আসে তাহলে তো এই আলোচনার কোন প্রয়োজন নেই। সরকারি দল আওয়ামী লীগ ছোট ছোট কিছু রাজনৈতিক দলকে নিয়ে নির্বাচনে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি ছাড়া বাংলাদেশে কোন নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক অন্তত আমি বলতে পারব না। জাতীয় পার্টির আগে একটা অবস্থান ছিল। এই নির্বাচনের পর তাদের সেই অবস্থান কতটুকু থাকবে সেটাও দেখার বিষয়। আমার মনে হয়, নির্বাচন কমিশন এটা বলার জন্য বলেছে।”

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি শেষ করেছে। এখন তারা প্রার্থী চূড়ান্ত  করছে। অন্যদিকে ৩০০ আসনে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যে মনোনয়ন ফরম দিচ্ছে এবারের নির্বাচনে আলোচনায় আসা তৃণমূল বিএনপিও। জাতীয় পার্টিও মনোনয়ন ফরম বিক্রি করছে। তবে বিএনপি ও তাদের জোট মিত্রদের অনেকের অবস্থান এখনো বিপরীত মেরুতে। তারা তফসিল প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ ডয়চে ভেলেকে বলেন, “তফসিল পরিবর্তনের যে আলোচনা হচ্ছে, সেটা তো যারা এখনও নির্বাচনী ট্রেনে উঠতে পারেনি তাদের সুযোগ দেওয়ার জন্য। যদি কেউ আসে তাহলে নির্বাচন কমিশন সেটা দেখবে। এতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। আমরা তফসিল অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি নিচ্ছি।”

গত রোববার দুপুরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রথম তফসিল পরিবর্তনের কথা বলেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। তিনি মনে করেন, সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। সাক্ষাৎকালে তফসিলের বিরোধিতা করা দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কোনো আলোচনা হতে পারে কি না, সে বিষয়টিও তুলে ধরেছেন রওশন। এছাড়া মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ৩০ নভেম্বর থেকে কিছুটা পেছানো এবং প্রয়োজনে তফসিল পেছানোর বিষয়েও রাষ্ট্রপতিকে তিনি অনুরোধ করেছেন।

কিন্তু তফসিল এবং নির্বাচন পেছানোর মতো কোনো পরিবেশ বা চাপ বিরোধী দলগুলো সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর তৈরি করতে পেরেছে কি না, এটিও এখন বড় প্রশ্নের জায়গা। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আভাস না দিলে তফসিল বা ভোটের তারিখ কোনোটাই হয়তো পেছাবে না। সরকারের অন্দরমহলেও এ ধরনের অপেক্ষা বা প্রস্তুতি থাকতে পারে, বলছেন কেউ কেউ।

জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে নির্বাচন কমিশন দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসলেও তাতে সাড়া দেয়নি বিএনপির। দলটির নেতারা শুরু থেকেই বলে আসছেন, দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। তাদের দাবি, নির্বাচনের আগে সংসদ বিলুপ্ত এবং ইসি পুনর্গঠন করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। বিএনপি ও তাদের জোট শরিকেরা এবং বিরোধী অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও এ দাবির পক্ষে সরব। কিন্তু বিএনপি যদি ভোটে অংশগ্রহণ করে তবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে পুনঃতফসিল তথা নির্বাচনও পেছানো হতে পারে, এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন কয়েকজন নির্বাচন কমিশনার।

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির নেতৃত্বে তিন দলের একটা জোট গঠন হয়েছে। তারা নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষনা দিয়েছে। এমন আরও অনেকেই নির্বাচনে আসতে পারে বলে আলোচনা হচ্ছে। নাগরিক ঐক্যের প্রধান মাহমুদুর রহমান মান্নাকে সম্প্রতি রাজনীতির মাঠে দেখা যাচ্ছে না। কিছুদিন আগেও তিনি রাজপথে থেকে সরকারবিরোধী নানা বক্তব্য দিয়েছেন। এখন হঠাৎ করে কেন তিনি নীরব? এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দিচ্ছেন না। বৃহস্পতিবার নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। গণঅধিকার পরিষদ নিয়েও রাজনৈতিক মহলে নানা ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে।

তবে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ডয়চে ভেলেকে বলেন, “হালুয়া রুটির ভাগাভাগিতে আমরা যাব না। যারা সুবিধা নিতে চায় তারা যাবে। আমরা যখন নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের আবেদন করেছিলাম তখন আমাদের বলা হয়েছিল, দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিলে নিবন্ধন মিলতে পারে। কিন্তু আমরা রাজি হইনি। এখনও বলা হচ্ছে, নির্বাচনে গেলে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা মিলতে পারে। আমি দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে বসেছিলাম। তারা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, যদি জেল জুলুম আরও খাটতে হয় তাতেও কোন আপত্তি নেই। জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন করে যাব।”

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১২ দলীয় জোটের সঙ্গ ছেড়ে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক তিনটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নিয়ে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করেছেন। সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমরা সব সময় নির্বাচনের পক্ষে। সরকারপ্রধান যেহেতু ঘোষণা দিয়েছেন তিনি নিরপেক্ষ একটা নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন, আমরা তার সেই আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে চাই। তবে এবার যদি তিনি কথা না রাখেন তাহলে দেশের মানুষ তাকে আর কোনোদিন বিশ্বাস করবে না।”

অবশ্য বিএনপি তাদের অবস্থান থেকে একটুও সরে আসেনি বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন দলটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, “আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন করে যাব। তফসিল পেছানোর এই আলোচনায় আমাদের কিছু বলার নেই। একতরফা নির্বাচনে কবে তফসিল হল আর কী হল তাদের আমাদের কোন আগ্রহ নেই। আমরা চাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে নির্বাচন হতে হবে। সেই দাবি পূরণে আমাদের চলমান আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

পূর্বের খবরচ্যাটজিপিটির ভয়েস চ্যাট সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত করল ওপেনএআই
পরবর্তি খবরহাসিনার একদলীয় সরকার পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হবে: মঈন খান