বিশ্ব গুম দিবসে আবার স্বজনদের ফিরিয়ে দেয়ার আকুতি মানবাধিকার5 ঘণ্টা আগে

119

নিউজ ডেস্কঃ বিশ্ব গুম দিবসে আবারো নিখোঁজদের স্বজনরা কাঁদলেন৷ তারা ফিরে চাইলেন তাদের স্বজনদের৷ তাদের কথা, ‘‘তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে বিচার হোক, তবুও তাদের ফিরিয়ে দেয়া হোক৷ জীবিত না থাকলে কবরটি অন্তত দেখানো হোক।

বুধবার সকালে ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে সমবেত হয়েছিলেন তাদের স্বজনরা৷ যারা নিখোঁজ হয়েছেন তাদের সন্তান, স্ত্রী ও পরিবারের লোকজন বুকে ছবি নিয়ে হাজির হন৷ তারা তাদের বাবা,  ভাই, স্বামী বা সন্তানকে ফেরত চান।

তাদেরই একজন শাকিল খান৷ তিনি ২০১৩ সালের ৭ ডিসেম্বর রাতে নিখোঁজ সবুজবাগ থানা ছাত্রদলের সভাপতি মাহবুব হাসান সুমনের ভাই৷ সুমনের সঙ্গে পাঁচ নাম্বার ওয়ার্ডে ছাত্রদলের সভাপতি কাজী ফরহাদও নিখোঁজ হন সেদিন৷ তাদের নারায়াণগঞ্জের সম্মনদি ইউনিয়নের নোয়াকান্দি গ্রামের সালাম চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ৷ শাকিল খান বলেন, ” তাদের সাদা পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়ে যায়৷ এরপর আমরা মামলাও করতে পারিনি৷ শেষ পর্যন্ত পুলিশ যেভাবে বলেছে সেভাবে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি- এটা লিখে একটি জিডি করতে বাধ্য হই।”

সাদা পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়ে যায়: শাকিল খান

তার কথা, “তাদের দুই জনের কেউ আর ফিরে আসেনি৷ আমরা অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু পুলিশ, র‌্যাব বা ডিবি কেউ কিছু আমাদের জানায়নি।”

“তবে পুলিশ গত বছরের ১০ জানুয়ারি আমাদের কাছ থেকে একটি মুচলেকা নিতে এসেছিল যে, আমার ভাই বাসা থেকে বের হয়ে আরা ফিরে আসেনি৷ আমরা তাতে সই করিনি৷ তবে নিখোঁজ কাজী ফরহাদসহ আরো কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা সই করতে বাধ্য হয়,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, বুধবার সারাদেশ থেকে কমপক্ষে ৫০টি পরিবারের সদস্যরা এসেছিলেন৷ তাদের সবারই এক কথা, “আমাদের স্বজনকে ফেরত দিন৷ কোনো অপরাধ থাকলে বিচার করুন৷ তবুও ফেরত দিন৷ আমিও সরকারের কাছে একই দাবি জানিয়েছি।”
“আমার ভাইয়ের একটি সন্তান আছে, স্ত্রী আছে৷ এরকম আরো অনেক সন্তান বাবা ছাড়া বড় হচ্ছে৷ তাদেরকে কী জবাব দেবে সরকার,” প্রশ্ন তার।

তিনি তো মানবতার মা, তিনিও কিছু করছেন না: রেহানা বেগম মুন্নি

সুত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি মো. সেলিম রেজা পিন্টু গুম হন মিরপুর থেকে, ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর৷ তার পরিবারও থানায় কোনো মামলা করতে পারেনি৷ তার বোন রেহানা বেগম মুন্নি বলেন, “আমরা এখন কার কাছে যাবো বুঝতে পারছি না৷ তিনি তো মানবতার মা৷ তিনিও কিছু করছেন না৷ আল্লাহর কাছে বিচার দেয়া ছাড়া আর কোনো পথ নাই৷”

“শুধু আমি একা নই, আমার মতো আরো অনেক পরিবার তাদের নিখোঁজ স্বজনদেন ছবি বুকে নিয়ে তাদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন৷ আমরা আর কত বছর বুকে ছবি নিয়ে ঘুরবো৷ জীবিত না হোক আমাদের স্বজনদের কবরটি আমাদের দেখানো হোক।”
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)  এই নিখোঁজরা কোথায় কী অবস্থায় আছে তা তদন্ত করে জানাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে৷ প্রতিষ্ঠানটির এশিয়ার সিনিয়র গবেষক জুলিয়া ব্রেকনার বলেন, বাংলাদেশে জোরপূর্বক নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর কষ্ট শুধু বাড়ছেই৷সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না৷ সরকারের উচিত আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া৷ পাশাপাশি একটি স্বাধীন কমিশন খোলা, যেখানে জাতিসংঘের সাথে এক হয়ে এমন গুমের ঘটনার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারবে সরকার।

আর এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি)-র এক বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ৬২৩ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন৷ তাদের মধ্যে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১৫৩ ব্যক্তি ৷ গুমের শিকার যারা হয়েছেন, তাদের ৮৪ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর সাধারণ সম্পাদক ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, “র‌্যাব-পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর ক্রসফায়ার ও গুমের ঘটনা অনেক কমে আসে৷ কিন্তু সম্প্রতি গুম, বিশেষ করে রাজনৈতিক গুম আবার বাড়ছে৷ গত ১০ দিনে আমরা এটা বেশি দেখেছি৷ এবার কৌশল পাল্টানো হয়েছে৷ নিখোঁদের কয়েকদিন পর তাদের আদালতে মামলা দিয়ে হাজির করা হচ্ছে৷ আবার কিছু লোককে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে৷ এবার ডিবির বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।”

রাষ্ট্র এই দায় এড়াতে পারে না: ড. মিজানুর রহমান

“আগে গুম হওয়াদের মধ্যে যারা ফিরে এসেছেন, তাদের কেউ কেউ মুখ খুলতে শুরু করছেন৷ তবে তারা এখনো ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন৷ তারা যা বলছেন, যে বর্ননা নিচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে সু প্রশিক্ষিত লোকজনই তাদের তুলে নিয়ে গিয়েছিলো৷ তাদের বর্ণনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মিল পাওয়া যায়,” বলেন এই মানবাধিকর কর্মী।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ” বার বার দাবি জানানোর পরও এই গুম নিয়ে সরকার স্বাধীন কোনো তদন্ত কমিশন করছে না৷ কারণ, নারায়নগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, র‌্যাবের পুরো একটি ইউনিট এর সঙ্গে জড়িত৷ তাই হয়তো ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে স্বাধীন তদন্ত হচ্ছে না।”

আর মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, “এখনো যারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদের খোঁজ জানানো রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব৷ রাষ্ট্র এই দায় এড়াতে পারে না৷ আর এইসব ঘটনার সঙ্গে যারা যড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে৷ তা না হলে প্রশ্ন থেকেই যাবে৷ সরকার বার বার প্রশ্নের মুখে পড়বে।”

তিনি জানান, তারাও এই গুমের ঘটনা নিয়ে একটি তদন্ত করেছেন যা অচিরেই প্রকাশ করা হবে৷

তার কথা, ‘‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের দিয়ে তদন্ত করালে তদন্ত সঠিক হবে না৷আর স্বাধীন কমিশন করলেই হবে না৷ তদন্তের স্বচ্ছ ও সঠিক প্রকিয়াও নির্ধারণ করতে হবে।”

যাদেরকে গুম করা হয়েছে, তারা নিজ এলাকাতে খুবই ভালো সংগঠক ছিলেন-                 মায়ের ডাকের সানজিদা ইসলাম মায়ের ডাক আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি“ঢাকাসহ বাংলাদেশের সবখানে দেখেন, যাদেরকে তুলে নেয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, যাদেরকে খুন করা হয়েছে, তারা নিজ নিজ এলাকাতে খুবই ভালো সংগঠক ছিলেন। আর তাদেরকে টার্গেট করেছে এবং এ মানুষগুলোকে আমরা পাচ্ছি না। শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার জন্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ প্রতিষ্ঠা করার জন্যে এ সরকার তা করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি কখনোই এমন ছিলো না,” আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ভয়েস অফ আমেরিকা বাংলার সাথে সাক্ষাৎকারে গুমের শিকার পারিবারদের সংগঠন মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি একথা বলেন।

সানজিদা ইসলাম তুলি গুমের শিকার পরিবারের গড়ে তোলা সংগঠন মায়ের ডাকের একজন সমন্বয়ক। তিনি একই সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কার্যনির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য। কাজ করেছেন জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অফ এনফর্সড ডিসএপিয়ারেন্স । প্রায় ১৯ বছর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেশি ও বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করার পাশাপাশি গত ১০ বছর ধরে মানবাধিকার কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছেন এবং একই সঙ্গে কাজ করে চলেছেন গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বন্ধের দাবিতে।

তার ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমন ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুজে পেতে তাদের পরিবারের যে সংগ্রাম সেই সংগ্রামে তিনি কাজ করেছেন ক্রীড়ানক হিসাবে।

ব়্যাব যেভাবে মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখছে, তদন্ত বা জবাবদিহিতার উধ্বে’

ব়্যাবের বিষয়ে সরকার তদন্তের কোন উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি কোন তদন্ত কমিটিও তারা করেননি। এত বছর যাবত তাদের নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তুলে আসছেন, তাদেরকে সংখ্যাগুলো দিচ্ছেন, বাংলাদেশের যে সমস্ত মানবাধিকার সংগঠনগুলো আছে তার বাইরেও আন্তর্জাতিক যে সমস্ত মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে তারা সরকারের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার পরেও কিন্তু গুম-খুনের যে ঘটনাগুলো রয়েছে তাতে সরকারের কোনো সদুত্তর নেই। কোন তদন্ত নেই। এতো বছরে আমরা যে জবাব পেয়েছি তা হতাশাজনক। আপনি যদি দেখেন, হিউম্যান রাইট ওয়াচ যে ৮৬জনের তালিকা করেছে সরকার তার কোন উত্তর দেয়নি। তদন্ত তো করিনি। ২০২২ জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার যে হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট বাংলাদেশ সফরে করেছেন সেখানেও ৭৬ জনের তালিকা দিয়ে গেছেন সেই তালিকায় কোন সদুত্তর সরকার দেননি। এমনকি তদন্ত করেননি। এই জায়গাটাতেই বোঝা যায় আসলে সরকার কেন নিশ্চুপ। এই পরিবারগুলোর কাছে তাদের কোন উত্তর কেন নাই। এ দায়িত্ব তো সরকারেরই। এটাতো চরম গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। এর থেকেও বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কোথা আছে কিনা আমরা জানি না। গুম এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যে অপরাধ এগুলো সরকার ও তার এজেন্সি দ্বারা সংগঠিত হচ্ছে। একারণেই আসলে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না। একারনেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসছে। জানতে চাইছে, আসলেই মানুষ গুলো কোথায়। এবং এদেরকে যে সরকারের সংস্হা কর্তৃক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হয়েছে, সেই ঘটনাগুলোর জবাবদিহির জায়গা কোথায়। সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যে বাহিনী চলে তাদের তো জবাবদিহি জায়গা আছে।
পূর্বের খবরহেফাজতের বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের নিয়ে নতুন কমিটি
পরবর্তি খবরযুক্তরাজ্যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে পদাযাত্রা