অনলাইন ডেস্ক:
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে যাচ্ছেন গ্রামে। অনেকে রাজধানী ছেড়েছেন, অনেকে রওয়ানা দিচ্ছেন। ফলে ফাঁকা হতে শুরু করেছে যানজটের এ নগরী। যারা এখনো ঢাকায় গণপরিবহনে চলাফেরা করছেন, তারা পড়েছেন বিড়ম্বনায়। প্রতিটি বাসে ঈদ বকশিশের নামে জোর করেই আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। আবার অল্প পথের যাত্রীও তুলছেন না হেলপাররা।
সোমবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর বেশ কয়েকটি রুটের বাসে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। যাত্রী তোলার সময়ই বাধ্যতামূলক ঈদ বকশিশ দিতে হবে বলে বাসে তুলছেন হেলপাররা। আর যাত্রীদের থেকে ভাড়া আদায়ের সময় সুপারভাইজাররা প্রথমে অনুরোধ করছেন। বাড়তি টাকা না দিলে জোর-জবরদস্তি করে ‘ঈদ বকশিশ’ আদায় করছেন তারা। এ নিয়ে সুপারভাইজারের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন যাত্রীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রামপুরা-কুড়িল রুটে চলাচল করা বাসগুলো ৪০ টাকার নিচে যাত্রী তুলছেন না। অথচ এ রুটের সর্বোচ্চ ভাড়া ১৫ টাকা। রামপুরা ব্রিজ থেকে যমুনা-বসুন্ধরা গেট পর্যন্ত ভাড়া ১০ টাকা। ৩০ টাকার নিচে ভাড়া নেই বলে দরদাম করে যাত্রী তুলছে তুরাগ, অনাবিল, অছিম, রাজধানী, আসমানি পরিবহন।
অন্যদিকে রাইদা ও ভিক্টর ক্ল্যাসিক সবসময় গেটলক করে রাখছে। রাইদা লং রুট অর্থাৎ সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ীর যাত্রী ছাড়া তুলতে চাইছে না। ভিক্টর ক্ল্যাসিক গুলিস্তানের যাত্রী ছাড়া তুলছে না। আবার লং রুটের যাত্রী তুললেও ঈদের বকশিশসহ ভাড়া (বাড়তি) দিতে হবে বলে আগেই যাত্রীর প্রতিশ্রুতি আদায় করেন হেলপার।
বসুন্ধরা গেট থেকে শাহজাদপুর যাবেন বেসরকারি চাকরিজীবী আকরাম হোসেন। বহু সময় দাঁড়িয়ে থেকেও কুড়িল-রামপুরা রুটের কোনো বাসে ওঠার সুযোগ মেলেনি। রাইদা, ভিক্টর ক্ল্যাসিক, অনাবিল পরিবহনের বাস গেলেও গেট লক। ফলে উঠতে পারেননি তিনি। সবশেষ তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন তিনি। ১০ টাকা ভাড়া হলেও ৩০ টাকা দেওয়ার শর্তে তাকে বাসে উঠতে দেওয়া হয়।
বাসে বসে তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি মার্কেটিংয়ের কাজ করি। সকাল থেকে বেরিয়ে অনেক এলাকা ঘুরেছি। বাসেই যাতায়াত করি। অল্প দূরত্বে গিয়ে বারবার নামতে হয়। কাজ শেষ করে আবার বাসে উঠতে হয়। আজ যতগুলো বাসে উঠেছি, সব বাসে অন্তত ২০ টাকা বেশি ভাড়া নিয়েছে। সারাদিনে যেখানে ১০০-১৫০ টাকা ভাড়া লাগতো। আজ লেগেছে ৩৫০ টাকারও বেশি। অফিস থেকে এত টাকা টিএ-ডিএ দেয় না। আর এতবার ঈদ বকশিশ দেওয়াও সম্ভব না।’
তুরাগ পরিবহনের হেলপার রঞ্জু বলেন, ‘আজ থেকে ঈদের বকশিশ নিচ্ছি। আগে নেইনি আমরা। আজ আর কালকেই তো সময়। সারাবছর তো বেশি ভাড়া নিই না। ঈদের আগে যদি এটুকু বেশি না দেন, তাহলে কেমনে হয়?’
হেলপারের সঙ্গে কথাপোকথনের মধ্যে হাঁক ছাড়ছেন বাসের চালক সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলতে থাকেন, ‘যে যাই বলুক, ঈদ বকশিশ আমরা নিমুই। কত জায়গায় কত ট্যাকা খরচ করেন, বাসের শ্রমিকগো দুইডা ট্যাকা বেশি দিতে আপনাগো কলিজা ছোট হইয়া যায়। সারা বছর প্রকৃত ভাড়ায় সার্ভিস দেই, এখন আমরা বেশি নিমুই।’
গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডে দাঁড়িয়েও একইচিত্র চোখে পড়ে। আলিফ, বৈশাখী, রবরব পরিবহনেও ঈদের বকশিশসহ ‘ভাড়াটা একটু বেশি লাগবো মামা’ বলেই যাত্রী তুলছেন হেলপাররা। অধিকাংশ বাসের হেলপারের মুখে হাঁকডাক ‘২০ টাকার নিচে ভাড়া নাই’, ‘আইলে আয়েন, না আইলে বইয়া থাকেন’।
বৈশাখী পরিবহনে গুলশান-১ থেকে মহাখালী পর্যন্ত ভাড়া ১০ টাকা হলেও নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। আর গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড থেকে গুলশান-১ চত্বর পর্যন্ত ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নিচ্ছে বাসগুলো। আলিফ ও রবরব পরিবহনও একই ভাড়া আদায় করছে।
বৈশাখী পরিবহনের সুপারভাইজার বিদ্যুৎ হোসেন বলেন, ‘শুধু আমরা না, সব বাসেই নিচ্ছে। আমাগো জিগায়া তো লাভ নাই মামা। ঈদের সময় বকশিশ দিতে তো হইবোই। বকশিশ দিতেও মজা, নিতেও মজা।’
তার এ কথার প্রতিবাদ জানান যাত্রীরা। একযোগে কয়েকজন যাত্রী বলে ওঠেন, ‘বকশিস একজন-দুজনকে দেওয়া যায়, সবাইরে তো দেওয়া যায় না। এ ব্যবসা ছাড়ো, না হলে পিঠে মাইর পড়বে।’ তবে বাধ্য হয়ে ওই যাত্রীদেরও কেউ দ্বিগুণ, কেউ তিনগুণ ভাড়া দিয়ে বৈশাখী পরিবহনে চড়ে গন্তব্যে গেছেন।





