খলিলুর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে থেকেই জাতিসংঘে সভাপতির দায়িত্ব সামলাবেন

53
ঢাকা: পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে বহাল থেকেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন ড. খলিলুর রহমান। এ দায়িত্ব পালনের সময় সাধারণ পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন চলাকালে তিনি ছুটিতে থাকবেন বলে জানা গেছে।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের সময় কয়েক সপ্তাহের জন্য ছুটিতে যেতে পারেন তিনি। তবে মন্ত্রিত্ব ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

 

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন ও বিজয়ী হওয়ার পর বৃহস্পতিবার (৪ জুন) যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সেসময় খলিলুর রহমান দুই পদেই দায়িত্ব সামলানোর ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘এর প্রিসিডেন্টস (নজির) আছে’।

 

সাংবাদিকরা খলিলুর রহমানের কাছে জানতে চান, জাতিসংঘের অধিবেশনের সভাপতি হওয়া তিনি এখন ছুটিতে যাবেন কি না।

 

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “চাকরি ছাড়ব কি না, এটাই তো? না না, ছুটি নেব কি না? ভাই, এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই! এর নজির আছে। আজ থেকে ৪০ বছর আগে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাহেব, আমাদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমি তার একান্ত সচিব ছিলাম এবং তার সঙ্গে কাজ করেছি। তিনি দুই পদেই পূর্ণকালীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। তখন ছিল ইন্টারনেট-পূর্ব যুগ। কিন্তু এখন নিরবচ্ছিন্নভাবে দুটি দায়িত্বই একসঙ্গে পালন করা সম্ভব। এটা এখন খুবই স্বাভাবিক।’

এর আগে জাতিসংঘ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছিলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে এক বছরের জন্য ছুটি নেবেন। সে সময় বিষয়টি নিয়ে সরকারি মহলে নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে এখন জানা যাচ্ছে, তিনি একইসঙ্গে দুই দায়িত্বই পালন করবেন।

দেশে ফিরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও অংশ নেন খলিলুর রহমান। বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানানো হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ধরে রেখেই জাতিসংঘে দায়িত্ব সামলাবেন খলিলুর রহমান
খলিলুর রহমান
 

 

 

বিধিগত বাধা নেই

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের মন্ত্রিসভায় থেকে জাতিসংঘের এ ধরনের দায়িত্ব পালনে বিধিগত কোনো বাধা নেই। অতীতেও বিভিন্ন দেশে এমন নজির রয়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘এমনকি চার দশক আগে বাংলাদেশ থেকে যিনি প্রথমবার সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী নিজেও এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে বহাল থেকেই জাতিসংঘের দায়িত্ব পালন করেছেন।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘যদি ডেডিকেটেডলি ওনার এই (জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির) কাজটি করতে হয়, তাহলে ওনাকে সময়টা দিতেই হবে ওখানে। বাট দ্যাট ডাস নট মিন যে, উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।’

তিনি জানান, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

 

কীভাবে সামলাবেন দুই দায়িত্ব?

গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ভোটে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন খলিলুর রহমান। তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে আট ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

নির্বাচনের পর থেকেই তার মন্ত্রিত্ব বজায় রাখা না রাখা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, একইসঙ্গে দুই দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনাই চূড়ান্ত হয়েছে।

ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘এটা অসম্ভব কিছু নয়, কারণ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বটি সার্বক্ষণিক কোনো দায়িত্ব নয়। মূলত সভাপতির দায়িত্বটা বর্তায় যখন সাধারণ পরিষদ অধিবেশন হয়।’

তার ভাষ্য, সাধারণ পরিষদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে সভাপতির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ফলে সেপ্টেম্বরে কয়েক সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্কে অবস্থান করতে হবে খলিলুর রহমানকে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম অধিবেশন চলাকালে সভাপতিকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হয়। ফলে খলিলুর রহমানকেও সেসময় কয়েক সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্কে অবস্থান করতে হবে।’

সাধারণ পরিষদের প্রতিটি অধিবেশনের জন্য একাধিক সহ-সভাপতি নির্বাচিত থাকেন। সভাপতির অনুপস্থিতিতে তাদের মধ্য থেকেই কেউ অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে ড. জাহান বলেন, ‘এটা অনেকটা আমাদের সংসদের মতো ব্যাপার। স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে ডেপুটি স্পিকার যেভাবে কাজ চালিয়ে নেন, ওইখানেও সেটা করা হয়।’

এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের কাজে ব্যস্ত থাকলে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখবেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সহযোগিতা করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বেতন দেবে বাংলাদেশ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একটি নির্দিষ্ট কার্যালয়, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা পাবেন খলিলুর রহমান।

ড. সেলিম জাহান বলেন, এটা জিএ বা সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের অফিস নামে পরিচিত। সেখানে কাজকর্ম পরিচালনার জন্য বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারি থাকবেন। উনার একজন একান্ত সচিবও থাকবেন।

দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন সফরে কূটনৈতিক প্রোটোকল ও নিরাপত্তা সুবিধাও পাবেন তিনি। তবে জাতিসংঘ মহাসচিবের মতো আলাদা বাসভবন পাবেন না। এক্ষেত্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কূটনৈতিক বাসভবন ব্যবহার করতে হবে।

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোনো বেতন দেওয়া হয় না। সভাপতির নিজ দেশই তার বেতন বহন করে।

ফলে খলিলুর রহমানও বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকেই বেতন পাবেন।

বর্তমানে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালেনা বেয়ারবক। জার্মান পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি প্রতি মাসে প্রায় ১৩ হাজার ইউরো বেতন পান।

 

 

তিন দিনের সফরে রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আগামী ৭ জুন তিন দিনের সফরে রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

 

বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন ৮১তম অধিবেশনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে এ সফর অনুষ্ঠিত হবে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ড. খলিলুর রহমানকে একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীতে দক্ষ ও বাস্তববাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ও সমঝোতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

এছাড়া বৈশ্বিক দক্ষিণ ও পূর্বের দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে গতি আনা, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ইস্যুতে জাতিসংঘের সমন্বয়মূলক ভূমিকা জোরদারের উদ্যোগকে রাশিয়া স্বাগত জানায়।

 

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে রাশিয়া প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এরই অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের ৭ থেকে ৯ জুন তার রাশিয়া সফর অনুষ্ঠিত হবে।

পূর্বের খবরদেশের বন্ধ ও অলাভজনক কারখানায় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রোড শো করবে সরকার