আগামী ৭ তারিখে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটছে কি?

65

ঢাকাঃ দেশে নির্বাচনী প্রচার জোরেশোরেই শুরু হয়েছে। নির্বাচন বর্জনের আন্দোলনে কিছুটা গতি এলেও শেষ বিচারে কতটা কার্যকর হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। তা ছাড়া রেল-বাস পোড়ানো এবং তাতে মানুষ পুড়িয়ে মারার যে অভিযোগ তৈরি হচ্ছে তার সমালোচনার তুলনায় আন্দোলনের প্রভাব কি সুদূরপ্রসারী হবে? রাজনৈতিক বিবেচনায় তা মনে হয় না। বিএনপি যেহেতু ক্ষমতার রাজনীতিতেই অভ্যস্ত তাই নির্বাচন বর্জন ও তাকে ঘিরে একটা ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। এই সীমিত লক্ষ্যের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে বাম প্রগতিশীল কিছু দলও। এই কৌশল তাদের জন্য কতটা রাজনৈতিক সুফল আনবে তা খুবই অনিশ্চিত। কারণ ক্ষমতার এই খেলায় আওয়ামী লীগও পাল্টা কৌশল নিয়েই এগোচ্ছে। তাতে একেবারে ফল পাচ্ছে না তা বলা যাবে না।

আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের সঙ্গে চতুর কৌশলেই খেলছে। একদিকে বিএনপির অনেক নেতাকে মামলায় জড়িয়ে কারাগারে বন্দি করেছে, অন্যদিকে বেশকিছু নেতাকে বাইরে থেকে আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে দিচ্ছে। তাতে নেতাদের কারাবন্দি করার কারণে যে সমালোচনা তা এক ধরনের ভারসাম্য পাচ্ছে। পাশাপাশি নিজ দলের থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়ানোর কৌশলটি কিছু কাজ দিচ্ছে। অনেক আসনেই এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে এবং তাতে ভোটের কার্যক্রমে মানুষের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এখন দেখার বিষয় হলো, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে কত শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে আসেন। এটাই ক্ষমতাসীন দল, সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবরোধ, হরতাল বা অসহযোগের মতো কার্যক্রম জনজীবনে তেমন প্রভাব ফেলেনি। তবে এর প্রভাব দ্রব্যমূল্যে পড়েছে, মানুষের মনে চাপা ভয় কাজ করছে এবং সামগ্রিকভাবে জন-অসন্তুষ্টি বাড়ছে। তবে তার দায় একতরফা সরকারের ওপর পড়বে বলে মনে হয় না। বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কার ওপর বেশি পড়বে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন এই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণের পরিবর্তে বিএনপি তার মিত্রদের নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেই লাভবান হতো। কারণ সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য দেশীয় চাপ যেমন ছিল তেমনি অনেক বেশি ছিল আন্তর্জাতিক আগ্রহ ও চাপ। ক্ষমতাসীন দল এটা ভালোভাবে বুঝেছে। কিন্তু তারা যখন লক্ষ্য করল বিএনপির মূল নেতৃত্ব সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকেই প্রাধান্য দিয়ে আন্দোলনে থাকতে আগ্রহী তখন তারাই উল্টো বিরোধী দলের ওপর যুগপৎ চাপ প্রয়োগ ও তাদের আন্দোলনে রাখার কৌশল প্রয়োগ করেছে। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দল তাদের দিক থেকে তিনটি বিষয় দৃশ্যমান করতে পারল- ১. সুনির্দিষ্ট অভিযোগেই বিএনপির কিছু নেতা গ্রেপ্তার ও শাস্তি ভোগ করছেন, যা একটি আইনি প্রক্রিয়া; ২. বিরোধী দল জনসম্পত্তির ক্ষতি ও মানুষ পোড়ানোর মতো ধ্বংসাত্মক কাজ করছে; ৩. এতদসত্ত্বেও সব বিরোধী পক্ষ রাজপথে সরকার ও নির্বাচনের বিরুদ্ধে মতামত তুলে ধরে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারছে। এখানে প্রাসঙ্গিক একটি চাপা প্রশ্ন তুলে ধরা যায়Ñ যদি আন্দোলনের ফসল হিসেবে সুষ্ঠু নির্বাচনের চাপ ধরে রেখে বিএনপি দ্বাদশ সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নিত তা হলে হয়তো তারেক জিয়াকে ছাপিয়ে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্ব প্রধান হয়ে উঠত, যা হয়তো স্বয়ং তারেক জিয়াসহ বিএনপির অনেক নেতাই চাননি বা চান না। বর্তমান বাস্তবতায় সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয় বলে এ নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি ন্যূনপক্ষে ৬০-৮০টা আসন পেত এবং এ রকম শক্তিশালী বিরোধী দলের নেতা হিসেবে মির্জা ফখরুলের ভাবমূর্তি অনেক উঁচুতে উঠত ও শক্তিশালী হতো।

আমরা এও লক্ষ্য করছি, নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার পরে জাতিসংঘের বিবৃতিতে জ্বালাও-পোড়াওসহ ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের বিষয়ে সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের কথাই বলা হয়েছেÑ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রসঙ্গ আর আসেনি। এদিকে সম্ভবত আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসছে ধরে নিয়ে এই সরকারের প্রধান মিত্র ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনার জন্যই বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত পিটার হাস তড়িঘড়ি ভারত সফরে গেছেন। এক মাসের ব্যবধানে দুবার ছুটি কাটানো তার মতো ব্যস্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রদূতের জন্য এক চমক- বলতেই হবে, বেশ ব্যতিক্রমী চমক।

সামনের কয়েক দিনে আরও ঘটনা ঘটবে, তবে নির্বাচন নিয়ে কৌশল পাল্টানোর সুযোগ আর নেই। আগামী ৭ তারিখের নির্বাচন-পরবর্তী সামগ্রিক মূল্যায়ন থেকে বিএনপির জন্য পরবর্তী রাজনৈতিক পথনির্দেশ মিলবে।

Image not found

লেখক- আবুল মোমেন  

পূর্বের খবরদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে ১ জানুয়ারি থেকে ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি
পরবর্তি খবরবিএনপি ও সমমনাদের রোববার থেকে লাগাতার ৩ দিনের অবরোধ