আওয়ামী লীগ বনাম ‘ওরা’ ১১ জনের সংসদের যাত্রা শুরু

69
ঢাকা: দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, “দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় হয়েছে দেশের জনগণের, জয় হয়েছে গণতন্ত্রের।” তিনি বলেন, “জনগণের রায় মেনে নিয়ে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।”

মঙ্গলবার বিকাল তিনটায় সংসদের শুরুতে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে স্পিকার নির্বাচন করা হয়। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি প্রথম স্পিকার নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি টানা দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম নারী স্পিকার।

বিএনপি এই সংসদ অধিবেশনের প্রতিবাদে কালো পতাকা মিছিল করেছে। মিছিলে পুলিশের বাধার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুপুরের পর  উত্তরায় কালো পতাকা মিছিল থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানকে আটকের অভিযোগ পাওয়া গেলেও পুলিশ তা অস্বীকার করেছে। জানা গেছে, তাকে থানায় নিয়ে পরে ছেড়ে দেয়া হয়। ঢাকার মোট সাতটি স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা পুলিশের বাধার মুখে কালো পতাকা মিছিল করেন।

‘সংসদে ভারসাম্য রক্ষা হয়নি’

সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর প্রথম দিনের অধিবেশন শুরু হয়। তার ভাষণের আগে নতুন স্পিকারকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে বিরোধী দলের নেতা জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট জিএম কাদের এমপি বলেন, ” সংসদ সদস্যদের সংখ্যার বিচারে বর্তমান সংসদে ভারসাম্য রক্ষা হয়নি। আসন সংখ্যার বিচারে এবার সংসদে শতকরা ৭৫ ভাগই সরকার দলের। স্বতন্ত্র ২১ ভাগ। তারাও প্রায় সরকার দলীয়। তিন-চার ভাগ শুধু বিরোধীদলীয় সদস্য। এ সংসদে সম্পূর্ণ জাতিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। এ সংসদ নিখুঁতভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে না।”

সরকারের জবাবহিতা ও সংসদ

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দ্বাদশ জাতীয় সংদদে খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম এম কামাল হোসেন সংসদদের প্রথম অধিবেশনে যোগ দেয়ার কিছুক্ষণ আগে ডয়চে ভেলেকে বলেন, “আমি মনে করি এই সংসদ সবচেয়ে প্রাণবন্ত হবে। কারণ, এরই মধ্যে সংসদ নেতা (প্রধানমন্ত্রী) স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সংসদে কথা বলার সুযোগ দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি দেখলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে কথা বলবেন।”

সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকার প্রশ্নে তিনি বলেন, “বিরোধী দলে ১১ জন আছেন। মেজর জেনারেল (অব.) ইব্রাহীম সাহেবসহ আরো কয়েকজন আছে। আমি মনে করি, বিরোধী দলের কথা বলার জন্য সংসদে দুইজনই যথেষ্ট। বিএনপি যখন সংসদে ছিল, বিরোধী দল ছিল তখনও দুই-এক জনের বেশি কথা বলতো না। বঙ্গবন্ধুর সময় সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত একাই সংসদে কথা বলতেন। সংসদকে সরব করে রাখতেন। কথা বলার জন্য একজনই যথেষ্ট যদি জনগণের জন্য কথা বলে। এবার তো জনগণের জন্য সংসদ হবে।”

পিরোজপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন মহারাজ বলেন, “দেখেন আমরা আওয়ামী লীগের লোক। আওয়ামী লীগের পদ-পজিশনে আছি। বাইরে আমরা সংগঠনকে শক্তিশালী করবো আর সংসদে আমরা সরকারের গঠনমুলক সমালোচনা করবো। কোনো অন্যায়-অনিয়ম দেখলে আমরা অবশ্যই তার সমালোচনা করবো।”

এদিকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “এই সংসদের কাছে দেশের মানুষের কোনো প্রত্যাশা নাই। এটা ডামি সংসদ, ডামি সরকার। এখানে সবাই আওয়ামী লীগের। যারা বিরোধী দল আছে তারাও সরকারের অনুগত।”

তার কথা, “এখানে জনগণের কোনো প্রতিনিধি নাই।  ভোট ডাকাতি করে এমপি হয়েছে। তাই জনগণের কাছে তাদের কোনো জবাবদিহিতা নাই। এখানে প্রধানমন্ত্রীর গুণকীর্তন হবে। এমপিদের ৬৫ ভাগ ব্যবসায়ী। এটা ব্যবসায়ীদের একটা ক্লাবে পরিণত হয়েছে। এদের কোনো জবাবদিহিতা নাই। তারা এখানে বসে লবিং করবে, সিন্ডিকেট করবে। জনগণের কোনো লাভ হবে না।”

‘এটা ডামি সংসদ, ডামি সরকার’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মমতাজ হোসেনের কথা, ” আওয়ামী লীগের যারা স্বতন্ত্র হিসেবে এই সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের কাছ থেকে বিরোধী দলের ভূমিকা আশা করেছেন। আমরাও সেটা আশা করি। এখানে ওই অর্থে বিরোধী দল নেই। এটা আমাদের একটা নতুন অভিজ্ঞতা। আগে আমরা এরকম দেখিনি। জাতীয় পার্টি দল হিসেবে সংসদে বিরোধী দল। তবে যারা স্বতন্ত্র, তারা আওয়ামী লীগের হলেও ভোটাররা কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধেই তাদের ভোট দিয়েছেন। সেটা তাদের মনে রাখা উচিত। সেটা হলে হয়তো সংসদে, রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হতে পারে। ভালো কিছু আশা করতে তো দোষ নাই।”

আর সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেন, “এই সংসদের কাছ থেকে আমার খুব বেশি প্রত্যাশা নাই। এর কারণ, এখানে বিরোধী দল থাকলেও প্রকৃত অর্থে যে দায়বদ্ধতা, সেটা আশা করা যায় না। সংসদের প্রধান কাজ হলো জাতীয় পর্যায়ে দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসন ও সুশাসনের জন্য দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। এখন এটা এই সংসদ কতটা করবে তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এবারের সংসদের যা গঠন, তাতে কতটা আর আশা করা যায়। তারপরও অপেক্ষায় থাকলাম।”

প্রসঙ্গত, দ্বাদশ সংসদে আওয়ামী লীগের ২২৩ জন, জাতীয় পার্টির ১১ জন, জাসদের একজন, ওয়ার্কার্স পার্টির একজন, কল্যাণ পার্টির একজন ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন ৬২ জন। জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দল। এই নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের সমমনার অংশ নেয়নি।

পূর্বের খবরদ্বাদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হচ্ছে আজ
পরবর্তি খবরনগদ সহায়তা হারানোর শঙ্কায় উদ্বিগ্ন পোশাক খাত